জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ও বাংলাদেশ

পৃথিবীর সব দেশে, সব জাতিতে, তাদের দেশের বড় মাপের জ্ঞানীÑগুণী মানুষদের জীবনী নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ, লেখক, বিজ্ঞানী, খেলোয়াড়, অভিনয় শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্রকারের জীবনী অবলম্বনে বহু দেশেই সিনেমা নির্মিত হয়েছে। জ্ঞানী-গুণী ছাড়াও অনেক সাধারণ মানুষের জীবনী অবলম্বন করেও সিনেমা তৈরি হয়েছে।

আমাদের দেশের সিনেমায় জীবনীভিত্তিক সিনেমার চরম আকাল। মনে হয় যেন আমাদের দেশে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করার মতো জীবনযাপন কেউই করেন না কিংবা আমাদের দেশে জ্ঞানী-গুণী সফল কোন মানুষই নাই। আসলে কী তাই? না, আমাদের দেশেও এমন বড় মানুষের জন্ম হয়েছে, যাঁদের জীবনী নিয়ে চমৎকার সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব।

কিন্তু নানা কারণে আমাদের দেশে এই ধরনের জীবনীভিত্তিক সিনেমা নির্মিত হয় না। কারণগুলো ব্যাখ্যা করা যাক :

১.    জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে প্রথমে দরকার হয় গবেষণার। আমাদের দেশে এই গবেষণা কাজের দারুণ অভাব। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে গবেষণা করার প্রচেষ্টা আছে। কিন্তু কাহিনীচিত্রে এই গবেষণা করার অভ্যাস নেই নির্মাতাদের।

২.    যার জীবনী নিয়ে সিনেমা নির্মিত হবে তার অথবা তার পরিবারের আপত্তি থাকতে পারে। এই আপত্তিও অনেক সময় জীবনী অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণের বাধা।

৩.    জীবনী নির্ভর চলচ্চিত্রকে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লোকজন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে করেন না। এ কারণে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে লগ্নি করার মতো প্রযোজক পাওয়া যায় না।

৪.    জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে একটা বিশেষ সময় তুলে ধরতে হয়। এই সময়টা যত আগের হয়, তত বেশি বাজেট বাড়তে থাকে। ধরুন, আজকে থেকে ৩০০ বছর আগে জন্ম নেয়া কোন ব্যক্তির জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে হবে। ফলে পুরো পর্দায় যা কিছু দেখাতে হবে সবই হবে ৩০০ বছর আগের। পর্দায় ৩০০ বছর ফুটিয়ে তুলতে হলে শিল্প নির্দেশককে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ঘরের ভেতরে ব্যবহার্য সামগ্রী সবই হয়তো নতুন করে তৈরি করতে হবে। ফলে বেড়ে যাবে খরচ। এই বাড়তি খরচের জন্য অনেক সময় জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হননা নির্মাতারা।

৫.    জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি করে। নির্মাণ করার পর প্রায়ই অভিযোগ ওঠে সিনেমায় যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। বিশেষত ঐ ব্যক্তির জীবনের ব্যক্তিগত ঘটনাগুলোর মধ্যে কোন নেতিবাচক ঘটনা থাকলে তা নিয়ে আপত্তি করে তার উত্তরাধিকারীগণ। এই আপত্তি অনেক সময় মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়। এই ধরনের বিতর্ক এড়িয়ে থাকার জন্য নির্মাতারা জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র এড়িয়ে চলেন।

৬.    একটা মানুষের জীবন মানে অনেক বড় সময়। চলচ্চিত্রের পরিধি সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিনঘণ্টার। এ কারণে ব্যক্তি জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ দিতে হয়। কেউ না কেউ এই বাদ দেয়া ঘটনাগুলো কেন বাদ দেয়া হল এই প্রশ্ন তুলতে পারেন। এই ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক নির্মাতার জন্য বিব্রতকর। এ কারণেও অনেক নির্মাতা এই ধরনের জীবনী এড়িয়ে চলেন।

তাই বলে কি জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হবে না ?

অবশ্যই হবে। এত সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কারো না কারো দায়িত্ব নিতে হবে। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেয়া যতটা সহজ, প্রযোজক হিসেবে ততটাই কঠিন। প্রযোজকরা আর্থিক দায়িত্ব নেন বলে তার অর্থ ফেরতের চিন্তা থাকে। একটা জীবনীভিত্তিক সিনেমা লাভজনক নাও হতে পারে বলে অনেকের অভিমত।

কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে এ পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাক:

আমাদের দেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী নিয়ে কোন সিনেমা নির্মিত হয়েছে? না। যদি হয়, তাহলে কি এই সিনেমা দর্শক দেখতে যাবে না? আমার তো মনে হয় কাজী নজরুল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবন দেখার জন্য দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়বে। দরকার হবে কেবল উপযুক্ত বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থা।

কবি জীবনানন্দ দাশের উপর হতে পারে সিনেমা। কবি হিসেবে তিনি এত জনপ্রিয় তাঁর জীবন নিয়ে সিনেমা মানুষ কি দেখবে না?

আর আমাদের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদের জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলে সেটা কি দর্শকরা দেখবে না? অবশ্যই দেখবে। সম্প্রতি মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী নির্মাণ করেছেন ‘ডুব’ নামের একটি সিনেমা। অভিযোগ করা হচ্ছে, এই সিনেমার কাহিনী হুমায়ূন আহমেদের জীবনীর উপর ভিত্তি করে লেখা। আমার ভবিষ্যদ্বাণী হল, এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য দর্শক এই সিনেমা দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

এবার একটু অন্য দিকে যাই।

আমাদের ক্রিকেটের বরপুত্র মাশরাফি বিন মর্তুজা। বর্ণাঢ্য জীবন তাঁর। অপরিসীম পরিশ্রম ও সততার প্রতীক। দেশের কোটি কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা তিনি। তার জীবনী নিয়ে সিনেমা বানালে তার ভক্তরা কি দেখবে না?

সিনেমার জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পীদের জীবনী নিয়েও চলচ্চিত্র বানানো যায়। আমাদের জহির রায়হান, আলমগীর কবীর, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেলের মতো পরিচালকদের জীবনী নিয়েও হতে পারে চলচ্চিত্র।

Post170801.1-Big

আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যে কোন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনী অবলম্বন করে হতে পারে চমৎকার সিনেমা। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে শহীদ রুমীর জীবন নিয়ে হতে পারে সিনেমা। হতে পারে সেই আজাদকে নিয়ে – যাঁর মা ছেলের শোকে বাকি জীবন আর ভাত খাননি। ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে অপূর্ব সুন্দর সব সিনেমা হতে পারে।

আমাদের রাজনীতিতে আছেন অনেক মহান পুরুষ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের মতো রাজনীতিবিদদের জীবনী নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করাই যায়। তাঁদের সিনেমা জনপ্রিয় হবে। পাশাপাশি তাঁদের জীবন থেকে দর্শক অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে। রাজনীতির এই আকালের দিনে রাজনীতিবিদদের নিয়ে সিনেমা তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ।

তরুণরা যখন তাদের ফেসবুক প্রোফাইলে লেখে আই হেট পলিটিক্স, তখন বুঝতে হবে এই দেশে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। তরুণরা রাজনীতিকে ঘৃণা করার মাধ্যমে আসলে নিজেদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তাদের মেধা ও যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করছে দেশ ও রাজনীতির ময়দান। এ শ্রেণীর তরুণদের রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আফসোস, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও আমরা আমাদের জাতির জনকের জীবনের উপর ভিত্তি করে কোন সিনেমা নির্মাণ করতে পারি নি। অনেকবার অনেক উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগই আলোর মুখ দেখেনি। একবার শোনা গিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান চরিত্রে অভিনয় করবেন ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন। পরে বিষয়টি আর বেশি দূর গড়ায় নি।

Post170801.2-Bigসম্প্রতি একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালমন স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আমন্ত্রণপত্রে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি প্রকাশ করেন। এই ছবিটি ছিল এক শিশুর আঁকা। এর জের ধরে তাঁর বিরুদ্ধে ছবি বিকৃতি ও অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট ওবায়েদুল্লাহ সাজু।

গাজী তারেক সালমন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানের একটি আমন্ত্রণপত্র প্রকাশ করেন। এই আমন্ত্রণপত্রের শেষ পৃষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি ছাপানো হয়। এই ছবিটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় এক শিশু এঁকেছিল।

৭ জুন ২০১৭ তারিখে এড. সাজু বাদী হয়ে আগৈলঝাড়া ইউএনও গাজী তারেক সালমনের বিরুদ্ধে বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেন। মামলা আমলে নিয়ে বিচারক ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে ইউএনওকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সমন জারি করেন।

গত ১৯ জুলাই বুধবার তিনি বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। বিচারক তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে দুই ঘণ্টা হাজতবাসের পর আদালতের আদেশে অন্তর্বতীকালীন জামিনে মুক্তি পান ইউএনও।

এই ঘটনায় পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পাল্টে যায় দৃশ্যপট। এডভোকেট ওবায়েদুল্লাহ সাজুকে তার দল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তবে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার ব্যাপার আছে। কারো জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে এই ধরনের মামলার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারো কাছে যদি মনে হয় জীবনী ‘বিকৃত’ হয়েছে কিংবা অবমাননা করা হয়েছে, তাহলে মামলা খাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।

এই পরিস্থিতিতে কে আর মামলা খাওয়ার ঝুঁকি নেবে? তবে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকদের সতর্ক হওয়া খুব দরকার। কোনো ধরণের অবমাননা বা বিকৃতির অভিযোগ করা যায়, এমন কোন দৃশ্য চলচ্চিত্রে সচেতনভাবে বাদ দিতে হবে।

post170801.3-bigযাই হোক, আমাদের দেশে সৃজনশীল মানুষেরা ব্যবসা করতে চান না। অন্য দিকে ব্যবসায়ীরা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির মতো সৃজনশীল পেশায় বিনিয়োগ করতে চান না। এ কারণে কারো জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ এখনও অনেক কঠিন বিষয় আমাদের জন্য।

তবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় বীরদের জীবনী নিয়ে সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিতে পারে। এই প্রকল্পে সরকার নিজেই প্রযোজক হিসেবে সিনেমা নির্মাণ করতে পারে। শুনেছি, এই ধরণের একটি প্রকল্প করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। আশাকরি, অদূরে এই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখবে এবং আমরা অনেকগুলো চমৎকার সিনেমা পাব। আর দর্শকরা জীবনীভিত্তিক সিনেমা দেখবে না এই ধারণা ঠিক না। কেননা আমরা যত রকম কল্পনা করে গল্প লিখি না কেন, শেষ পর্যন্ত সেই গল্প জীবনের কথা বলে। সে হিসেবে পৃথিবীর সব সিনেমাই জীবনীভিত্তিক সিনেমা। কারো না কারো জীবন। দর্শক জীবনের গল্প পছন্দ করে বলেই জীবনের গল্প বলে যান নির্মাতারা।

লেখক: শাহজাহান শামীম, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক | ছবি: ইন্টারনেট

One comment

Comments are closed.