মুখোমুখি : আবিদ মল্লিক

post170803.jpg

মো: আবিদ মল্লিক, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রগ্রাহক ও অভিনেতা। দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপন নির্মাণে ব্যস্ত থাকার পর নিজের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে চলচ্চিত্র বানানো শুরু করেন। তাঁর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পথ দেশী-বিদেশী বেশ ক’টি পুরস্কার পেয়েছে এবং অনেক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি সংগঠনের প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও ঘুরে এসেছেন। কানের অভিজ্ঞতা, চলচ্চিত্র জীবন ও ভাবনা নিয়ে আই’র মুখোমুখি আবিদ মল্লিক। সাক্ষাৎকার গ্রহণে ছিলেন শারাফাত আলী শওকত

: চলচ্চিত্রজীবনের একদম শুরু থেকে শুরু করি, শুরুটা কেন? কিভাবে?

চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহটা আসলে ছোটবেলা থেকেই ছিলো। যখন স্কুলে পড়তাম, তখন থেকেই আমাদের পরিবারে একটা ব্যাপার ছিলো যে, নতুন কোন ফিল্ম সিনেমা হলে আসলেই বাসার মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই মিলে দেখতে যেতাম। চলচ্চিত্র ব্যাপারটা তখন খুবই ইন্টারেস্টিং ছিলো আমার কাছ। রেডিওতে চলচ্চিত্রের ট্রেলার শুনতাম, পত্রিকায় চলচ্চিত্রের রিপোর্ট দেখতাম, তখন থেকেই আসলে এই অঙ্গণকে ভালোলাগা। ১৯৯৫ বা ৯৬ এর দিকে আমি যশোর থেকে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় আসার পর দেখলাম যে বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম নামে একটা সংগঠন, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ ওয়ার্কশপ করাবে। ওই ওয়ার্কশপের মাধ্যমেই বিশ্ব চলচ্চিত্র, ভালো চলচ্চিত্র দেখা মানে টোটাল চলচ্চিত্র মুভমেন্ট এর সাথে জড়িত হয়ে পড়ি। তো আমি খুঁজতে থাকি কিভাবে নির্মাণ শেখা যায় এ বিষয়ে। প্রথমে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার হয়ে কাজ শুরু করি। বিজ্ঞাপন ব্যাপারটা আমার খুব মনে ধরে। দীর্ঘদিন ঐ প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার পর আমি নিজে নিজেই কাজ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হই। বিজ্ঞাপন নির্মাণের পাশাপাশি প্রামাণ্যচিত্র বা কর্পোরেট বিভিন্ন ভিডিও বানাতে থাকি। তবে একটা পর্যায়ে আমার মনে হতে থাকে, এসব কাজে আসলে আমার নিজের সৃজনশীলতা বা চিন্তাটা ওভাবে প্রকাশ করতে পারছি না যেটা চলচ্চিত্র নির্মাণে করা যাবে। সেই তাড়না থেকেই আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ব্রাউন প্যাক’ নির্মাণ করি। আশেপাশের বন্ধু, ছোট ভাই যারা আছে, তাদের নিয়েই সব করা। এখন চলচ্চিত্র নির্মান তো হলো, দেখাবো কোথায়? মাস কয়েক পরেই তখন দু’টি চলচ্চিত্র উৎসব হচ্ছিল, বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম চলচ্চিত্র উৎসব এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। দু’টি চলচ্চিত্র উৎসবেই আমার চলচ্চিত্রটি জমা দেই এবং দু’টিতেই প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়। আমার চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনীর পূর্বে, আমাকে কয়েকশো মানুষের সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, এত এত মানুষের সাথে বসে আমি আমার চলচ্চিত্রটা দেখছি, অনুভূতিটা ছিলো অন্যরকম। পরবর্তীতে এটা বিভিন্ন পুরস্কার পায় এবং একটা টিভি চ্যানেলও এটা কিনে নেয়। চলচ্চিত্রটা বানিয়ে আমার মনে হতে লাগলো যে অনেক দর্শকের সাথে যেন একটা যোগাযোগ সৃষ্টি হয়ে গেলো। আমি যা ভাবি, মানে আমার ভাবনা, মতাদর্শটা যেন আমি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলতে পেরেছি, যা বলতে চাই। এটাই তো আমার কাজ, এটাই তো আমাকে করতে হবে।

: কি ধরণের কাজ করতে বেশী ভালো লাগে? মানে, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের কি ধরণের বার্তা দিতে চান।

কোন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আসলে কাজ করাতে আমি বিশ্বাস করি না। সবসময় নতুন ধরণের কাজ, সিনেমার বিভিন্ন ভাষা নিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করতে পছন্দ করি। আর আরেকটা বিষয় কি, আমার আশেপাশে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা-ই আমার চলচ্চিত্রে ফুটে উঠছে। আমার গল্পের বিষয়বস্তু আমার সমাজ, আমার পরিবেশ, আমার সামাজিক অবস্থা। এ যাবৎকালে যতগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি, সবই কোন না কোন সত্য ঘটনার আদলে। এই ধরণের জীবনধর্মী কাজ করতেই ভালো লাগে। আর আমি তো বলেছিই, আমার কাছে চলচ্চিত্র মানে আমার মতাদর্শ প্রকাশ করার ভাষা। আমার আশেপাশের সমাজ সম্বন্ধে আমি যা ভাবি, তা-ই সিনেমায় প্রকাশ করতে চাই।

: আপনার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পথ’ তো দেশী-বিদেশী অনেক পুরস্কার পেয়েছে ও পাচ্ছে। ‘পথ’এর পথযাত্রা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

‘পথ’ আসলে আমার জীবনের অন্যতম একটা মাইলফলক বলতে পারি। চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার, বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরাম আয়োজিত বাংলাদেশ শর্ট এন্ড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে, তারেক শাহরিয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট শর্ট ক্যাটাগরিতে জুরি এওয়ার্ড ছাড়াও দেশী বিদেশী প্রায় ১৬ টি উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয়েছে এবং ২০১৮ পর্যন্ত বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে এটা প্রদর্শনের জন্যে নির্বাচিত হয়েছে। চ্যালেঞ্জিং বলতে বললে বলবো গল্পটা খুবই ছোট, এর পরিসরও ছোট, সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের ভাষাটা ফুটে উঠছে কিনা সেটা নিশ্চিত করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মানে এটা আদৌ চলচ্চিত্র হয়ে উঠছে কিনা, এটা। এখন তো অনেকেই ক্যামেরা দিয়ে দু’তিনটা এংগেলে শট নিয়ে একটা ভিডিও বানিয়ে নাম দিচ্ছে শর্টফিল্ম। কিন্তু এগুলো আদৌ ফিল্ম হচ্ছে কিনা সেই সন্দেহ থেকেই যায়। ‘পথ’ এ আমার এটা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যাতে দর্শক এখানে চলচ্চিত্রের আবহটা পায়। আর বিষয়বস্তুটা তো খুবই সাম্প্রতিক। এটা নিয়ে কাজ করাও চ্যালেঞ্জিং ছিল। আর আমরা যারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার তাদের প্রযোজক ব্যবস্থা করা খুব কষ্টসাধ্য কাজ। নিজে নিজেই করেছি সব। আরেকটা ব্যাপার কি, এটা বানানোর সময়, এত কিছু মাথায় ছিলো না যে এটা এত পুরস্কার পাবে, এত প্রসংশিত হবে। এটা আসলের ভাবনার বাইরে বেশী কিছুই।

: কান, বিশ্বের সকল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের খুব প্রিয় একটি নাম। সম্প্রতি তো ঘুরে এলেন, কিভাবে সবকিছু হলো। জানতে চাই।

এককথায় অসাধারণ কান। বাংলাদেশের একটা সংগঠন আছে, International Film Initiative of Bangladesh এর মাধ্যমেই এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকাররা যাতে দেশের বাইরে চলচ্চিত্রের উপর কর্মশালাগুলোতে অংশ নিতে পারে সে লক্ষ্যেই চলচ্চিত্র নির্মাতা সামিয়া জামান ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক জাকির হোসেন রাজু মূলত এই সংগঠনটি গড়ে তোলেন। প্রক্রিয়াটা এমন যে, তরুণ চলচ্চিত্রকাররা তাদের বানানো শেষ চলচ্চিত্রটি এবং পরবর্তী যে প্রজেক্টটা করতে চায়, সে প্রজেক্টটি জমা দিবেন। জমা পড়া সব প্রতিযোগীর একটা শর্টলিস্ট করে IFIB আবার মোনাকো ভিত্তিক আরেকটি চলচ্চিত্র সংগঠন IEFTA কে জমা দিবে। তারা বাছাই করে সেরা তিনজনকে সম্পূর্ণ তাদের খরচায় কানে চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিবে। সে হিসেবে এবার আমিসহ আরো দু’জনের প্রজেক্ট নির্বাচিত হয়। একজনের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় আমি আর চলচ্চিত্রকার লুবনা শারমিন যাই। যা দেখেছি, যা শিখেছি অসাধারণ।

: কান মানেই লাল গালিচা, শত শত বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব – সব মিলিয়ে ওখানের অভিজ্ঞতা কেমন?

অভিজ্ঞতা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এত এত সিনেমার মানুষ! কেউ সিনেমা দেখতে আসছে, কেউ দেখাতে আসছে, কেউ উৎসবের খবর নিয়ে আসছে, কেউবা সিনেমা বিক্রি করতে আসছে, কেউবা কিনতে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজার কেমন, বাজারে টিকে থাকতে কিভাবে কথা বলা, মানুষ কি চায় তা বোঝা মানে শেখার শেষ নেই। আমি আসলেই IFIB আর IEFTA এর কাছে কৃতজ্ঞ। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজেক্টে অনেক সহায়তা করবে নিঃসন্দেহে।

: বর্তমানে কি করছেন? চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাটাই বা কি?

যেহেতু চলচ্চিত্র নির্মাণই পেশা, ওটাই করছি, বিজ্ঞাপন বানাচ্ছি। পাশাপাশি ইদানিং যারা নতুন চলচ্চিত্রকার, তাদের চিত্রগ্রহণের কাজটা করে থাকি। এই কাজটা বেশ করা হয়। পাশাপাশি কিছু প্রামাণ্যচিত্রও করছি, শর্টফিল্মের প্রস্তুতিও চলছে। আর সম্প্রতি বাংলাদেশে ডকুমেন্টারির উপর একটা প্রজেক্ট চালু হয়েছে, ডকল্যাব। ওখানে দেশের বাইরে থেকে ডকুমেন্টারি বিশেষজ্ঞরা আসবেন, ওয়ার্কশপ, ট্রেনিং এগুলোর আয়োজন আছে। পাশাপাশি বাছাই করা বিভিন্ন প্রজেক্টে অর্থায়নও করবে তারা। ওই প্রজেক্টে নির্মাণের জন্যেও কাজ করছি। কাজ করছি, করে যেতে চাই। যতদিন আনন্দ পাই, শান্তি পাই, কাজ করেই যেতে চাই।

: চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০১৭ তো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ২০১৮ সালের জন্যে আপনার উপদেশ কি হবে?

জ্বি। চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালÑ২০১৭ তে আমার পথ চলচ্চিত্রটি দুইটি পুরস্কার পায়। আমি শ্রেষ্ঠ পরিচালক এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা প্রিয়াঙ্কা বোস কান্তা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। হ্যাঁ, সোজা কথায় বলতে গেলে বলবো অনেক গোছানো, শৃংখলাপূর্ণ এবং সময়ানুবর্তীতা মেনে চলা একটা আয়োজন। অনেক ভালো লেগেছিলো নিঃসন্দেহে। আর ২০১৮ এর জন্যে উপদেশ দিতে বললে আমি সবসময় যা বলি, তাই বলবো। শুধু এই উৎসব না, যে কোন চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্দেশ্য যেন শুধু উৎসবই হয়, আর কিছু না হয়। সব চলচ্চিত্রপ্রেমীদেরই আশা এটাই।

: অনেক ধন্যবাদ

আপনাকেও ধন্যবাদ