যন্ত্র : যন্ত্রশৈলী- কোনটা দামী?

ছোটবেলায় আমরা চোখে অনেক কিছুই দেখেছি যার অর্থ কখনো বুঝতে পারিনি, বুদ্ধি অর্জনের পর অধিকাংশ জিনিসই দেখে বুঝতে পারি এর প্রকৃতি ও ধরণ, আবার বৃদ্ধ বয়সে অনেকে চোখে দেখেন না কিন্তু কোন জিনিস সম্পর্কে শুনেই বুঝতে পারেন সেটি দিয়ে আসলে কি হয়, কি হয় না। বস্তুত এখানে চোখের কাজ কেবলমাত্র উপস্থাপন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে মস্তিষ্ক। ক্যামেরাকে যদি চোখের এক্সটেনশন বিবেচনা করি, তাহলে ক্যামেরার কাজও কেবলমাত্র দৃশ্যধারণ এবং মস্তিষ্কের কাছে উপস্থাপন। ধারণকৃত দৃশ্যের উপযোগিতা, গ্রহণযোগ্যতা সবই নির্ধারিত হবে মস্তিষ্কে। তাহলে কোন ক্যামেরায় দৃশ্যধারণ করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কি ধারণ করা হয়েছে, কিভাবে ধারণ করা হয়েছে।

প্রযুক্তির এ যুগে ক্যামেরার বর্ণনা হাতে লিখে বলার চেয়ে ওয়েবসাইটে দেখে নেয়াটাই শ্রেয়। প্রসঙ্গত, সনি ক্যামেরার ওয়েবসাইট তাদের লেটেস্ট ক্যামেরার বর্ণনা দিবে কিন্তু সে ক্যামেরা দিয়ে আপনি কত লেটেস্ট ধারণার ছবি বানাবেন সে ব্যাপারে কোন আইডিয়া দিবে না, হতে পারে সে ক্যামেরা দিয়ে আপনি ৫০ বছর আগের সভ্যতার কোন গল্প নিয়ে ছবি বানাচ্ছেন। এও হতে পারে ২০ বছর আগের ক্যামেরা দিয়ে আধুনিক বর্তমানের কোন গল্প নিয়ে ছবি বানাচ্ছেন।

Post170806-Big

স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের কাছে গল্পের ওজনের কাছে ক্যামেরার ওজন খুবই নগণ্য। মাস্টারপিস ছবি, যেগুলো তৎকালীন সময়ে ফিল্মে শ্যুট করা হয়েছিল এমনও অনেক কঠিন দৃশ্য আছে যা এক শটেই পারফেক্ট হয়েছে। এদিক দিয়ে ডিজিটাল ক্যামেরার নেগেটিভ ব্যবহার হলো নির্মাতার ফিল্ম খরচের চিন্তা না থাকায় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের পারফরমেন্সের উপর জোর দেন না। সহজ দৃশ্য ধারণেও অনেক টেক নিতে হয়। এতে রিলের খরচ হয়তো হয় না, কিন্তু সময় নষ্ট হয়।

আকারে ছোট, দামে সস্তা ক্যামেরা দিয়ে এসময়ে যাদের ফিল্মে হাতেখড়ি তাদের জন্য আশার ব্যাপার হলো এই, প্রোডাকশন বাজেটের বড় অংশ তারা প্রশিক্ষণ, কস্টিউম, মেক-আপ ইত্যাদিতে ব্যয় করতে পারেন। শুধুমাত্র ছবির রেজুল্যুশন ভালো করার জন্য দামী ক্যামেরা ভাড়া করে প্রোডাকশন বাজেটের অর্ধেক যদি ক্যামেরাতেই যায় ছবির মূল শক্তি ‘গল্প’ তখন অসহায় বোধ করে।

স্বাধীন নির্মাতাদের অনেকেই একই সাথে পরিচালক, চিত্রগ্রাহক এবং প্রযোজক হয়ে থাকেন। পরিচালক একই সাথে চিত্রগ্রাহক হওয়ার সুবিধে হলো নতুন করে আরেকজনকে গল্প বোঝাতে হয় না। কর্মঠ সহকারী পরিচালক থাকলেই কাজ উদ্ধার হয়ে যায়। যদি দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি চিত্রগ্রাহক হন তবে তার কাজ শুধু ফোকাস করে ক্যামেরার রেকর্ড বাটন চাপা নয়। এ জায়গাটা অনেকটা কম্পিউটার অপারেটর ও কম্পিউটার প্রোগ্রামার এর মত। একজন প্রতিনিয়ত একই কাজ করে যান, আরেকজনের কাজই হলো নতুন কিছু সৃষ্টি করা। নবীন যারা সিনেমাটোগ্রাফিতে আগ্রহ আছে এমন কারোরই উচিত নয় শ্যুটিং এর দিন ভোরে গিয়ে সেটে হাজির হওয়া। সম্ভব হলে শিল্পীদের রিহার্সেল এর দিন থেকেই তার কাজ শুরু করা উচিত। ক্যামেরার দামের চেয়ে ফ্রেমিং সেন্স এর উপর, ক্যামেরার মানের চেয়ে কম্পোজিশনের উপর, আলোক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার উপর জোর দেয়া উচিত। কম বাজেটের ডিএসএলআর দিয়ে যারা দৃশ্যধারণ করেন অধিকাংশই আলো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে উদাসীন। অনিয়ন্ত্রিত আলো যে দর্শকের চোখে কতটা বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে সেটি বলে বুঝানোর অবকাশ নেই। সবকিছুই আবার সম্পাদনার টেবিলে কমানো বা বাড়ানো যায় না। ক্যামেরা মুভমেন্ট, ফ্রেমিং, কম্পোজিশন, আলো নিয়ন্ত্রণ, কালার টোন ইত্যাদি বিষয়ে পারঙ্গম হতে পারলে খুব কম দামী ক্যামেরা দিয়েও গল্প ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। প্রতিদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গে একটি পাখির ডাকে, জানালা খুলে দেখি আমার জানালার গ্রিল পেরিয়ে বৈদ্যুতিক তারে বসা একটি পাখি, তার পেছনে আকাশ। আমি আড়মোড়া ভেঙ্গে মুখ ধুতে চলে যাই, এ দৃশ্য আমার জন্য নিত্যকার।osmo-ad

কিন্তু একজন চলচ্চিত্রকার আমার বিছানার জায়গাটায় ক্যামেরা বসিয়ে ধারণ করলেন অন্ধকার ঘর, খোলা জানালা, গ্রিল, বাইরে তারে বসা একটি পাখি ও আকাশ। এ কম্পোজিশনের ভাষা এমন হতে পারে, বিশাল আকাশ কিংবা ছোট্ট পাখিটির তুলনায় আমি কতটা পরাধীন, জানালার গ্রিল যেন আমার কারাগারের শিক।

এমন একটি দৃশ্য ধারণ করতে সর্বোচ্চ কত ক্ষমতার কিংবা কত দামের ক্যামেরার প্রয়োজন সেটি পাঠক বিবেচনা করবেন। আমার এ লেখার মূল উদ্দেশ্য কাউকে উচ্চ মানের ক্যামেরার প্রতি নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং ক্যামেরার উচ্চমান বা উচ্চ দাম দেখে কেউ যেন নিরুৎসাহিত না হয় সেদিক টা পরিষ্কার করা। ক্যামেরা একটি যন্ত্রবৈ কিছুই নয়। এ যন্ত্র দিয়ে কতটা অযান্ত্রিকতা আনা যায় সেটাই বুদ্ধিমত্তার বিষয়। দিনশেষে আমরা ছবি দেখি জীবনে একটু জীবন আনার জন্য।

লেখক : শরাফত আলী শওকত , চলচ্চিত্র নির্মাতা | ছবি : ইন্টারনেট