আত্মকথন : মোমেন খান

post170804মোমেন খান, তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক। বন্ধুরা নিজেরা মিলেই শুরু করেছেন প্রোডাকশন হাউজ ‘ক্যান্ডিফ্লস ফিল্মস’। নিয়মিত বিজ্ঞাপন ও অনলাইন প্রমোশনাল বানানোর মাধ্যমে নিজেকে তৈরী করছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর জন্য। চট্টগ্রামের প্রতিভাবান এ তরুণ ‘আই’ এর মুখোমুখি হয়ে বলেছেন তাঁর কাজের কথা, স্বপ্নের কথা। সাথে ছিলেন তাহমিদা নূর মোস্তফা

চলচ্চিত্র, আমার কাছে একটা ভাষা, গল্প বলার ভিজ্যুয়াল মাধ্যম। এটা পড়তে পারতে হবে। এ বিষয়ে প্রত্যেক নির্মাতার ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকতেই পারে। যেমন বাংলা ভাষার সার্বজনীন ব্যবহার আছে, আবার ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক ব্যবহারও আছে। তেমনি চলচ্চিত্রেরও ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্নতা রয়েছে। সবসময় যে বাস্তবতার সাথে মিল রেখে গল্প বলতে হবে তা কিন্তু নয়। একটা গল্প বানানোতে এবং সেই গল্পে অন্যের বিশ্বাস স্থাপন করানোতেই নির্মাণের আনন্দ পাওয়া যায়। আবার একটা ক্লোজআপ, মিডশট আর লংশট দিয়ে কিছু একটা বানালেই কিন্তু ফিল্ম হয়ে যায় না। ফিল্মের মধ্যে ফিল্মমেকারের নিজের এক ধরনের বক্তব্য থাকে, প্রকাশ ভঙ্গিমা থাকে যেটা তিনি এর মাধ্যমেই প্রকাশ করতে চান। তিনি এক ধরনের কবির মতো বা গল্পকারের মতো নিজের ভিজ্যুয়ালটা দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে।

আমার ফিল্মমেকিং জীবনটা কিন্তু শুরু হয়েছে হঠাৎ করেই। থাকে না একটা ব্যাপার যে, এখানে আসার পিছনে ছোটবেলা থেকেই অনেকের এই বিষয়ে আগ্রহ, ঘাঁটাঘাঁটি করার প্রবণতা, সেভাবে আমার কখনোই ফিল্মমেকিং এ আসার ইচ্ছা ছিল না, খুব একটা ফিল্ম দেখতামও না। তবে কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় অনেক সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলাম, সে সুবাদে আমি কলেজজীবন (২০০৯) থেকেই অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু করি। তখন থেকেই ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কার্যকলাপ দেখে আমার গল্প বলার আগ্রহ তৈরী হয়। তখন ২০১৩ সালের শেষ নাগাদ প্রতিবেশী বন্ধু সাজিদের সাথে পরিকল্পনা করে কোনপ্রকার চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা ছাড়াই অর্থহীন ব্যান্ডের সুমন ভাইয়ের ‘আলো আর আধাঁর’ গানের একটা পরীক্ষামূলক মিউজিক ভিডিও বানিয়ে ফেলি। আর ওই প্রোডাকশনের নাম দেই ‘ক্যান্ডিফ্লস ফিল্মস প্রোডাকশন’। এভাবেই আমার ফিল্মমেকিং ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল।

যদিও প্রথম কাজটা পরীক্ষামূলক ছিল, তবে তখনকার প্রেক্ষাপটে অপ্রত্যাশিতভাবে আমি কাজটার জন্য ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছিলাম আশে-পাশের মানুষ থেকে। এমনি কি আমার কাজটি কয়েকটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে অনএয়ারও হয়েছিল। এরপর তৎকালীন সময়ের ফিলিস্তিনের ইস্যু নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠনের জন্য প্রামাণ্যচিত্র বানাই যা ‘সেইভ গাজা’ প্রজেক্টের অর্থ সংগ্রহে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ‘এড মেকার বাংলাদেশ ২০১৫’ এর জন্য BSRM স্টিল এর টিভিসি বানাই যেখানে আমাদের টিম ক্যান্ডিফ্লস ‘ইন্ট্রা-চিটাগাং এড মেকার’ এ টপ টিম নির্বাচিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তখন সেমিস্টার ফাইনাল চলায় ঢাকা রাউন্ডে অংশ নিতে পারিনি। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সামাজিক সংগঠন ‘চিটাগং শর্ট’ এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আছি, যেখানে জাহিদ আলম-এর ১ম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পিঞ্জর’ এ শিল্প নির্দেশনা, আশরাফ আবির-এর ১ম স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘অবস্থান’ চলচ্চিত্রটি রচনা এবং ‘অসামাজিক’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাই। তখন বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ইউরোপীয়ান ফিল্মমেকার সোহেল রহমান ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে যীশু ভাই, আবির, জিকু-সহ ‘দায়’ নামের একটি ওয়ার্কশপ ফিল্ম বানাই। এরপর আমার ‘অসামাজিক’ স্বল্পদৈর্ঘ্যটি ‘চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-২০১৫’তে থিয়েটার ইন্সটিটিউট এ স্ক্রিনিং হয়। তখন আমি লুকিয়ে দেখেছিলাম বড় পর্দায় হাউসফুল দর্শক কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল, যা আমাকে আবেগী করে দিয়েছিল। এটাই মনে হয় নির্মাণের আনন্দ, তখন থেকেই আমার পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা বানানোর ইচ্ছাটা জেঁকে বসে।

এরপর থেকে এক চুলও ছাড় না দিয়ে, নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে, যতটুকু পারি একটা ভালো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। বর্তমানে আমি পুরোপুরি আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান ‘ক্যান্ডিফ্লস ফিল্মস’ (Candyfloss Films) নিয়েই আছি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের প্রচারণা সম্পর্কিত প্রমোশনাল ভিডিও বানাচ্ছি, অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘকালীন মেয়াদ চুক্তিতেও প্রমোশনাল কাজ চলছে। আমি মনে করি সিনেমা বানানোর জন্য অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। সেই চর্চাটাই আমরা এখন বাণিজ্যিক ভিডিও বানানোর মাধ্যমে করছি। হয়তো ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি, প্রমোশানাল বানাচ্ছি। এসব বানাচ্ছি কিন্তু টিকে থাকার জন্যই। তবে লক্ষ্য একটাই পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

কি কি বাঁধা পার হতে হয়েছে বলতে গেলে আসলে বলতে হবে তেমন বিশাল কোন বাঁধা আমাকে পার হতে হয়নি, সবকিছু নিজের নিয়মেই ভালোভাবে আমার সাথে ঘটেছে। পরিবার থেকে ওভাবে সাপোর্ট না করলেও মানাও  করেনি কখনো। বলা যায় অনেকটা নিউট্রাল পজিশনে আছি। তবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাঁধা তো কিছু আসেই। আর চট্টগ্রামে কাজ করাটা অনেক বেশী চ্যালেঞ্জিং কারণ ঢাকার মত প্রফেশনাল ক্যামেরা হাউস, লাইট হাউসের অভাব এখানে। ঢাকা থেকে এসব এনে আমাদের দ্বিগুণ খরচ বহন করতে হয় যা ক্লায়েন্ট বা আমাদের কারো জন্যই সুখকর নয়। আর একটা বিষয় হল, অনেক বাণিজ্যিক ভিডিও তৈরীর ক্ষেত্রে আমরা শিল্পীর কাজের স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় তা কিন্তু সর্বক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে পাই না, কারণ দিন শেষে ক্লায়েন্টের চাহিদা আর পণ্যের বিজ্ঞাপনটাই কিন্তু মুখ্য।

আগেই বলেছি, আমি চলচ্চিত্রে এসেছিলাম প্ল্যান না করেই, কিন্তু কাজটা আনন্দ নিয়ে করতাম যাই করতাম। ছোট হোক কিংবা বড় হোক সব কাজের প্রতি আমার ডেডিকেশন ছিল এবং আছে। তাই বলতে পারি আমার কাজগুলোই আমার প্রেরণা। আমি যখন একটা কাজ করে ফেলি তখন পরের কাজে চেষ্টা করি নিজেকে ভেঙ্গে আরো ভাল কিছু করতে। তবে এই পথে চলতে গিয়ে চিটাগং শর্ট-এর সকল মেম্বার বিশেষ করে কোর মেম্বাররা, ফেইসকার্ডের নাঈম ভাই, ছবিয়ালের ভাই বেরাদর, ফারুকী ভাই থেকে অনেক উৎসাহ পেয়েছি। আর আমার প্রাণের টিমমেটরা উৎসাহ যুগিয়েছে প্রতিটা মুহুর্তে। এখানে আসার পর যেটা বুঝতে পেরেছি, চলচ্চিত্রে আসতে চাইলে অনেক স্টাডি করতে হবে, যেমন মিউজিক নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে, শিল্প নিয়ে, বিভিন্ন আর্টিকেল পড়া, এছাড়া আশে-পাশের মানুষ নিয়েও পড়তে হবে। সর্বশেষে আপনাকে সৎ থাকতে হবে। এসব চর্চার মধ্য দিয়েই আপনি একটা সুন্দর গল্প বলতে পারবেন। এটা ছাড়াও বানানো যায় যেটা হয়ত একটা স্রেফ ভিডিওই হবে।

এখন আমার একটা দুর্দান্ত টিম আছে। যেখানে সাজিদ, আরিফ, দানিয়েল এক সাথে টিমওয়ার্ক করছি। আমাদের সঙ্গে আরো অনেকজন কাজ করছে। কয়েকজন ছেলেমেয়ে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করছে। আমাদের নিজের অফিস আছে, টুকটাক সেটআপ আছে, এখানে আমরা পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ করি, প্রি-প্রোডাকশন করতে পারি। আমাদের নিজস্ব এডিট প্যানেল আছে, সাউন্ড ষ্টুডিও সাপোর্ট আছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এসব কিছুই আমাদের ছিল না। আমরা ছাদে অথবা মাঠে বসে প্রি-প্রোডাকশন করতাম। ওখান থেকেই লোকেশন রেকি করতে পাঠানো, ওখান থেকেই আর্টিস্ট কল দেওয়া। কিন্তু এটা আসলে শুরুটার জন্য সুন্দর। ওই সময়গুলোর কথা ভাবলে এখনো রোমাঞ্চিত হই।