‘আমায় ডেকো না/ফেরানো যাবে না’- লাকী আখন্দ

চার দশক ধরে শহুরে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীর রোমান্টিসিজমের হাতে খড়ি হয় দু’টি গানের মাধ্যমে। পাশের বাড়ির জানালার শিক ধরে স্বলাজভীরু চোখে তাকানো কিশোরীটিকে প্রেম নিবেদনের সেরা পছন্দ, ‘এই নীল মণিহার, এই স্বর্ণালী দিনে, তোমায় দিয়ে গেলাম’। নিবেদন সফল হওয়ার পর প্রেমিকাকে নিয়ে অজানাতে হারিয়ে যাওয়ার বিলাসি স্বপ্নটাও গলায় সুর হয়ে বাজে, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা শুধু দু’জনে, চলোনা ঘুরে আসি অজানাতে’।

শুধু কি প্রেমিক, প্রেমিকা! এদেশের হাজারো তরুণ ভিন্নধারার আধুনিক গানের শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রথমবার গিটারের তারে আঙ্গুল ছোঁয়ায় এই দু’টি গীতি কবিতাকে সঙ্গী করে। বাংলাদেশের আধুনিক গানের তালিকায় গান দু’টির অবস্থান জনপ্রিয়তার এভারেস্টে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ধরেই নতুন স্বপ্নে, ভিন্ন মেজাজে যাত্রা শুরু করে সংস্কৃতি, সঙ্গীত, শিল্পকলা এবং ক্রীড়াঙ্গন। ব্যান্ড সঙ্গীতে আজম খানের পাশাপাশি ভিন্ন ধারা’র আধুনিক বাংলা গানে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার অগ্রপথিক গায়ক-সুরকার লাকি আখন্দ। অসাধারণ প্রতিভাবান এই সুর-স্রষ্টার দুঃসাহসী প্রচেষ্টা যে বিফলে যায়নি তা প্রমাণিত। শ্রোতারা লুফে নিয়েছে ভিন্ন মেজাজের কথা আর সুরের অপূর্ব যুগলবন্দীকে। সুরকে বৈচিত্রপূর্ণ করতে এদেশে হামিং’র সফলতম ব্যবহারে পুরোধা একজন লাকি আখন্দ।

‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘এই নীল মনিহার’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, ‘তুমি কি দেখেছো পাহাড়ি ঝর্ণা’, ‘তুমি ডাকলে কাছে আসতাম সেতো জানতেই’ এমন সব গান শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য ঠাঁই নিয়েছে বাণী ও আবহের সঙ্গে। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটি সুরকার লাকি আখন্দ যেভাবে গেয়েছেন সেই একই গান কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ-এর কণ্ঠে ধরা দিয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। দু’ভাবেই পরিবেশিত গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গেঁথে আছে। একই ঘটনা ‘মামুনিয়া’ ও ‘বিড়ালের ছানা’ গান দুটিতে। সুরকার নিজের কণ্ঠে গেয়েছেন যেই ভাবে, সুর অবিকৃত রেখে গায়ক ফেরদৌস ওয়াহিদকে দিয়ে গানটি গাইয়েছেন ভিন্নভাবে। সামিনা চৌধুরী’র কণ্ঠে ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’, জেমসের গলায় লিখতে পারিনা কোন গান আজ তুমি ছাড়া, আইয়ুব বাচ্চু’র, কি করে বললে তুমি, লাকি আখন্দের নিজের কণ্ঠে আমায় ডেকোনা ফেরানো যাবেনা কিংবা ছোটভাই হ্যাপি আখন্দ’কে নিয়ে দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান লিখেছি’ বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে ভিন্ন এক ধারার মাইলফলক হয়ে আছে।

সাহিত্যে যেমন বেদনা আর আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তেমনি তাঁর জন্য ছিল সঙ্গীত। একসময় সংসারে অভাব ছিল, অপ্রাপ্তির দুঃখ ছিল। আর তাঁর মতে এই দুঃখই গানের মাধ্যমে তাঁর কন্ঠে, তাঁর সুরে প্রতিফলিত হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি অভাব না থাকত, আমাদের ভেতরে যদি কষ্ট না থাকত, তাহলে আমাদের ভেতরে মিউজিক ঢুকত না’। গানের মধ্য দিয়ে শান্তি খুঁজতেন তিনি। গানের মধ্যেই পেয়ে যেতেন তাঁর স্বস্তি ও সুখটুকু। যে গান নিয়ে  তাঁর ঘর-সংসার, সে গানকে কখনোই ছাড়তে পারেননি তিনি। তাই তো অসুস্থশয্যায় শুয়েও লাকী গিটার ধরেছেন, আঙ্গুলের ছোঁয়ায় সেই চেনা সুর এনেছেন আর গেয়ে উঠেছেন, ‘ঝড়ের দিনে ভুলেছে যে পথ, আমি জানি জানি তার বেদনা/ তোমার মনের নীরব আশা, সেও তো আমার আছে জানা’। পথভোলা পথিকের যে বেদনা ঝড়ে প্রবল হয়ে ওঠে, সেই বেদনাতে সুর দিয়েছেন তিনি। নীরবতার কন্ঠ শুনে সেই অনুভূতিতেও সুর দিয়েছেন তিনি।

১৯৫৬ সালের ৭ জুন পুরোনো ঢাকার খান লেনের এক সংগীতানুরাগী পরিবারে জন্ম লাকী আখন্দের। পাঁচ বছর বয়সে বাবা আব্দুল আলি আখন্দের হাত ধরে সংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি তাঁর। ১৩ বছর বয়সে আধুনিক সংগীতে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের পুরস্কার জয়। ১৪ বছর বয়সে এইচএমভি পাকিস্তান কোম্পানির সুরকার হিসাবে লাকি আখন্দের নাম তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৭১ এ ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ইন্ডিয়ায় সুরকার হিসাবে যুক্ত হন তিনি। সে বছরই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’র সংগীত শিল্পী’র ভূমিকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন এই কণ্ঠযোদ্ধা। ডিসেম্বরে বিজয়ের পর দেশে ফিরে বাংলাদেশ বেতার এ যোগ দেন। মিউজিক ডিরেক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন চাকরি জীবনের শেষ পর্বে। ১৯৮৭ সালে ছোট ভাই হ্যাপি আখন্দের অকাল মৃত্যু লাকি’র সংগীত জীবনকেও থমকে দেয়। ভাইয়ের চিরবিদায়ের পরই স্বেচ্ছা নির্বাসন যান। ১৯৯৯ সালে আবারো ফিরেছেন। তার সংগীত পরিচালনায় একমাত্র বাংলা চলচ্চিত্র সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ মুক্তি পায় ১৯৮৮ সালে। ছোটভাই হ্যাপি আখন্দের কণ্ঠ ও সংগীতায়োজনে রইসুল ইসলাম আসাদ ও সূবর্ণা মুস্তাফার অভিনয় ও লিপে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটির মনকাড়া সুর ও দূর্দান্ত চিত্রায়ন ছিলো ‘ঘুড্ডি’ চলচিত্রের অন্যতম আকর্ষণ। কিংবদন্তি এ মানুষটি যে গানে হাত দিয়েছেন সেটিই যেন সোনা হয়ে উঠেছে। তাঁর করা প্রতিটি গানে সুরের যে প্রভাব তা যে কাউকেই সহজে মুগ্ধ করবে। তাই তো লাকী আখন্দকে বলা হয় সুরের বরপুত্র। সুর ও সঙ্গীতায়োজনের নান্দনিক ও বৈচিত্রময় উপস্থাপনের কারণেই তিনি কিংবদন্তি। সফ্ট মেলোডি, মেলো-রক, হার্ড-রক যেটিতেই তিনি হাত দিয়েছেন সেটিই হয়ে উঠেছে এক একটি মাস্টার পিস। এমন অনেক মাস্টারপিস গানে, সুরে ও কথায় অমর হয়ে থাকবেন আখন্দ।

“অমলটা ধুঁকছে দুরন্ত ক্যান্সারে, জীবন করেনি তাকে ক্ষমা হায়!”

মান্না দে’র কফি হাউজের সেই অমলের মতো লাকী আখন্দকেও ক্ষমা করেনি দুরন্ত ক্যান্সার। দীর্ঘদিন ধরে যদিওবা জীবনের সাথে লুকোচুরি খেলছিলেন, তারপরও শেষমেশ আর পারলেন না বাংলাদেশের আধুনিক গানের জগতে বিরাজমান এক শিল্পী লাকী আখন্দ। গত ২১ এপ্রিল ২০১৭ সারা বাংলাদেশকে অঝোর ধারায় কাঁদিয়ে খসে পড়লো এই মহামূল্যবান নক্ষত্রটি।

লাকি আখন্দ শুধুমাত্র একজন কিংবদন্তী শিল্পী নন, একজন চমৎকার মানুষও। তাঁকে উপমায় ধারণ করা যাবে এমন কোনো উপমাও হয়তো আমাদের জানা নেই। শুধু জানা আছে, লাকী আখন্দ একজনই।

লেখক:  মোহাম্মদ সাজরুল ইয়াকীন ফরাজী | ছবি: ইন্টারনেট