মোয়ানা

সাধারণত আমার এনিমেটেড সিনেমা দেখা হয় না। হাতে গোনা কয়েকটাই দেখেছি। কিন্তু যতবারই কোন এনিমেটেড মুভি দেখেছি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। ‘’ও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সিনেমার গল্প, প্লট, মিউজিক, ডায়ালগ সবকিছুই অসাধারণ। পুরো সিনেমার গল্প এগিয়েছে একটি ছোট সবুজ পাথর নিয়ে, যা ছিল দ্বীপের দেবী ‘তা ফিতি’র হার্ট। বাতাস ও সমুদ্রের অর্ধদেবতা ‘মাউই’ ‘তা ফিতি’র হার্ট চুরি করে। কিন্তু পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। লাভা দৈত্য ‘তে কা’ মাউইকে আক্রমণ করে এবং তার শক্তির উৎস ‘ফিশহুক’ এবং সবুজ পাথরটা সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে যায়। ফলে ‘তে কা’র কালো থাবার ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীর দ্বীপ সমূহে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বীপগুলো কয়লায় পরিণত হতে শুরু করল এবং সমুদ্রের বিভিন্ন দানব জাগ্রত হল।

সহস্র বছর পর মতুনি দ্বীপের প্রধানের মা ‘তালা’ ছোট ছোট বাচ্চাদের উপরে উল্লেখিত ঘটনা বলছিল, যাদের মধ্যে নিজের নাতনী মোয়ানাও ছিল। ‘তালা’ আরো বলেছিল, কারো না কারো তাদের দ্বীপের চ্যানেল অতিক্রম করে মহাসাগরে পাড়ি দিতে হবে এবং মাউইকে খুঁজে বের করতে হবে, মাউই, ‘তে কা’ কে পরাজিত করে, যদি ‘তা ফিতি’র হার্ট তাঁকে ফিরিয়ে দেয়, তাহলে সবাই ‘তে কা’ র কালো থাবা থেকে বাঁচতে পারবে, নয়তো তাদের সবুজ গাছপালায় পরিপূর্ণ দ্বীপটাও কয়লায় পরিণত হবে।

Moana

ছোটবেলা থেকে মোয়ানার সমুদ্রের প্রতি অতি টান ছিল, তার ইচ্ছা ছিল সে নৌকা নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিবে কিন্তু তার বাবা চীফ ‘টুই’ ব্যাপারটা পছন্দ করত না। একেবারে ছোট থাকতেই সমুদ্র তাকে পছন্দ করে মাউইকে খুঁজে বের করে ‘তা ফিতি’র হার্ট ফিরিয়ে দেয়ার জন্য এবং তাকে সেই সবুজ পাথরটাও  দেয় কিন্তু বাবা চলে আসায় সে পাথরটা ফেলে দেয়। একদিন হঠাৎ দেখে, দ্বীপের সব নারিকেল নষ্ট এবং মাছও পাওয়া যাচ্ছিল না। মোয়ানার দাদী তাকে বুঝায়, তাকে মাউইর খোঁজে যেতে হবে। কারণ সমুদ্র তাকেই পছন্দ করেছে। সেই হার্ট যা সমুদ্র তাকে দিয়েছিল ছোটবেলায়, তা দাদী ‘তালা’ তার কাছে ফিরিয়ে দেয়। এরপর মোয়ানা বাবাকে না জানিয়ে মাউইকে খুঁজতে এবং তা ফিতিকে তার হার্ট ফিরিয়ে দিতে বেরিয়ে পড়ে।

এই সিনেমার সবচেয়ে মজার চরিত্র ‘মাউই’। মাউই চরিত্রের কন্ঠ দিয়েছে ‘দ্য রক’ খ্যাত ডোয়াইন জনসন। শেষের দিকে তার সাথে ‘তে কা’ একশনে অসাধারণ ভিএফএক্সের কাজ মুগ্ধ করতে বাধ্য। তাছাড়া ‘মোয়ানা’র সমুদ্রের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার স্লো মোশন দৃশ্যটা এখন পর্যন্ত আমার দেখা এনিমেটেড মুভির সুন্দরতম দৃশ্য। আর সংলাপ!! ‘মোয়ানা’ সিনেমা সংলাপের জন্য পুরো নাম্বারই পাবে। মোয়ানা এবং মাউইর কথোপকথন; মেয়ের জন্য চীফ টুইয়ের উৎকন্ঠা এবং অবশ্যই দৈত্যাকার কোকুনাট ক্র্যাব ‘টমাটোয়া’র সাথে মাউই আর মোয়ানার ডায়ালগগুলোকে তৃপ্তিকর বললেও কম বলা হবে। তবে এই সিনেমার সবচেয়ে যে জিনিসটা আমার ভাল লেগেছে তা হল সাউন্ড ট্র্যাক। গান গেয়ে একে অপরের সাথে কথা বলা, সাথে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দারুণ আঞ্চলিক নাচ তো আছেই। ইতিমধ্যে অস্কার এবং গোল্ডেন গ্লোবে সিনেমার অরিজিনাল গান ‘হাউ ফার আই উইল গো’ এর জন্য লিন লিওয়ান মিরান্ডা মনোনীতও হয়েছেন। তাছাড়া অস্কার এবং গোল্ডেন গ্লোব দু’টোতেই বেস্ট এনিমেটেড ফিল্ম বিভাগে মনোনীত হয়েছে ছবিটি।

সব মিলিয়ে বলতে গেলে ‘মোয়ানা’ অসাধারণ একটা মুভি। যা আমার মতো কম এনিমেটেড সিনেমা দেখা মানুষকেও বেশি বেশি এনিমেটেড সিনেমা দেখতে বাধ্য করছে। বলতে গেলে হলিউডের আরেকটা মাস্টারপিস।

লেখক: মোফাজ্জল হোসেন, চিত্রনাট্যকার ও গল্পকার