গাড়ি (The Car)

“Man is born free, but everywhere he is in chains” রুশোর এ বিখ্যাত উক্তি আমাদের  জীবন সংশ্লিষ্ট অনেক সামাজিক অসঙ্গতি, বাধা-বিপত্তি ও অপারগতার চিত্র মানসপটে উন্মোচন করে। তেমনি এক প্রেক্ষাপটে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গাড়ি’ মানুষের সামাজিক শৃঙ্খল আবদ্ধ জীবনকে তুলে ধরেছে।

বটবৃক্ষের নিচে উদোম গায়ে খেলনা গাড়ীটি নিয়ে মেতে ছিল ছেলেটি। আদলে পথশিশুতূল্য ছেলেটির এহেন খেলায় বিরক্ত হয়ে বট ছায়ায় শুয়ে থাকা মানুষটি তাকে তিরস্কার করে গাড়ীটি ছুড়ে দেয়। এভাবেই শুরু হওয়া গল্পটির মূল বিষয়বস্তু ফারহান ও মিলির জীবন তথা প্রেম, প্রণয়, টানাপোড়েন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। অনাকাঙ্খিত সম্পর্কের ফলশ্রুতিতে জন্ম হয় এক শিশুর। সমাজের চোখে নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে শিশুর দায় মেটানোর চেয়ে নিজেদের সম্মান বাঁচানোই প্রাধান্য পায়। অতঃপর আবর্জনার স্তুপে রেখে আসা শিশুটির ঠাঁই হয় এতিমখানায়। মূলত, এতটুকুতেই চলচ্চিত্রটির মূল বিষয়বস্তু আলো পায়। কিন্তু দৃশ্যপটে বাকী থাকে আরও কিছু। পড়া ও মারের চাপ এড়াতে নুরুল্লাহ নামক ছেলেটি পালিয়ে যায়। ততদিনে সামাজিক স্বীকৃতি ও আরেকটি সন্তানের জন্ম ভাগ্য পুঁজি করে মিলি ও ফারহানের সংসার সুখের মুখ দেখে। অধিকন্তু পথশিশু নুর ও ফারহানের সাক্ষাতে অচেনা পিতাপুত্রের সম্পর্কের চিহ্ন হয় খেলনা গাড়ীটি। তবে পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদের এ দায় সমাজের। এ বন্ধনের মূল্যায়ন সে করেনা, বরং দূরত্ব ও দুরাচারের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তাই হয়ত এমারসন তার ‘Self Reliance’ এ  বলেন, “Society everywhere is in conspiracy against the manhood of everyone of its members”.

সমাজ কেন্দ্রিক উপলব্ধির চিত্রায়ন উপভোগ করেছি। তবে দৃশ্যায়ন ও বাস্তবতার নমুনাচিত্রে কোন সংলাপ ছিল না। তারপরেও মূল বিষয়খানা যথার্থই দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তথাপি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুনঃমূল্যয়নের সুযোগটাও নিতে চাইছি। আমার কাছে ছেলেটিকে দিনের বেলা এভাবে রেখে আসাটা বেমানান মনে হযেছে। সেইসাথে নূর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ফারহানের টাকা, খাবার দেয়ার সাথে ডেকে নিয়ে গাড়ী বের করে দেয়াটা খানিকটা অপ্রত্যাশিত ছিল। এছাড়াও আবেগ, অনুভূতি ও স্পর্শকাতর জায়গাগুলো আরও ভাবপ্রবণ করা যেত। এ বিচ্যুতি বাদ দিয়েও পুরো চিত্রায়িত গল্পটি ছিল বেশ প্রশংসনীয়, মর্মস্পর্শী ও নিয়ত সামাজিক ভাবের প্রতিফলক।

সামগ্রিক বিবেচনায়, গাড়ী চলচ্চিত্রের হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যপট অভিভূত করেছে। নূরের মত বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা শুধু আমাদের দেশেই নয় পুরো পৃথিবী জুড়েই বাড়ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই জন্ম পরবর্তী মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ। পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে কন্যা ভ্রুণহত্যা আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও আমাদের দেশে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে যথা দূরগ্রহ ও লোকলজ্জায় মেরে ফেলা শিশুর সংখ্যাও বিবেচ্য। এ দূরাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজ যা স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে পুরো চলচ্চিত্রটিতে এবং সর্বশেষ প্রতিপাদ্য বাক্যে, ‘আমাদের দেশে এমনভাবে কত নূর বেঁচে গিয়েছে, কতজন লাশ হয়ে পড়ে থাকে নর্দমায়। আমাদের ভালোবাসা আর মনের চাহিদার কারণে লাশ হচ্ছে, এতিম হচ্ছে, কেউবা হচ্ছে পথশিশু,সমাজের চাপে হার মানছে মায়ের মমতা’

লেখক : সাজরুল ইয়াকিন ফরাজি, চিত্রনাট্যকার ও গবেষক