রাজনীতি

Rajneeti

রাজনীতি বলতে ক্ষমতার লড়াইকে বুঝায়। রাজনীতির মূলে আছে ক্ষমতা। রাজনীতিই নির্ধারণ করে কিভাবে ক্ষমতা অর্জন করা যায়, ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায় এবং ক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক সমাজে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ করা যায়। ক্ষমতার লড়াইয়ে যে টিকে থাকে, রাজনীতির ময়দান তার। রাজনীতি হল দাবার প্রত্যক্ষ খেলার মাঠ। দাবায় যেমন একটি ভুল চাল পুরো খেলার ভাগ্য পরিবর্তন করে দেয়, রাজনীতির খেলাতেও একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো হিসাব উল্টাপাল্টা করে দেয়। বুলবুল বিশ্বাস পরিচালিত ঈদ-উল-ফিতরের সিনেমা- ‘রাজনীতি’ যেন এই কথার প্রতিফলন ঘটেছে প্রতিক্ষেত্রে। কেমন ছিল রাজনীতি? তা জানার আগে সিনেমার কাহিনী সম্পর্কে একটু ধারণা দিয়ে রাখি।

রাজনীতি সিনেমার কাহিনী এগিয়েছে পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে ভালোবাসার গল্পকে পুঁজি করে। বিদেশ ফেরত শিক্ষিত ছেলে শাকিব খান দেশে ফিরে এসে দেশের জন্য কিছু করতে চায়। কিন্তু ক্ষমতার লোভের কাছে নিজের বড় ভাইয়ের সাথে সংঘাত এবং সাথে ভালোবাসার জালে জড়িয়ে পড়ে সে। এভাবেই এগিয়ে চলে রাজনীতির দৃশ্যপট।

‘রাজনীতি’তে অভিনয় করেছেন আলীরাজ, শাকিব খান, মিলন, অপু বিশ্বাস, সাদেক বাচ্চু, অমিত হাসানসহ আরো অনেকে। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন বুলবুল বিশ্বাস। সিনেমাটি ঈদে মুক্তি পেলেও যৌথ প্রযোজনার দুইটি বড় সিনেমার শোরগোলে দেশীয় কাহিনী নির্ভর এ সিনেমাটি অনেকটা আড়ালেই চলে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে। সিনেমাটি দেখার পর আপনি নিজে একটা ঘোরের মধ্যে থাকবেন। হয়তো ভাববেন, আচ্ছা, এভাবে শেষ না করে যদি এভাবে শেষ করত তাহলে বেশি ভালো হত। ঠিক এ ভাবনা যখন কোন দর্শকের মধ্যে ঢুকে যায় তখন মনে করতে হবে সিনেমাটি সফল, নির্মাতা সফল। কারণ তার কাজ নিয়ে দর্শক ভাবছে, কথা বলছে, আলোচনা করছে; এর থেকে বেশি আর কি চাওয়ার থাকতে পারে একজন নির্মাতার?

‘রাজনীতি’ কোন দৃষ্টিকোণ থেকে সফল, চলুন একটু আলোকপাত করি। সিনেমার বিচারে রাজনীতি স্বল্প বাজেটের হলেও (ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত অন্য সিনেমার তুলনায়) সিনেমাটিতে আছে জম্পেশ একটি কাহিনী।

রাজনীতি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিষয়টি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। সরকার ও বিরোধীদল একে ওপরের উপর দোষারোপ এবং প্রতিহিংসার আগুন কিভাবে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয় তার স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। জনগণের জানমালের কোন ঠিক নেই, ইচ্ছেমত হরতাল যে রাজনৈতিক দলের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির বিষয় ব্যতীত অন্য কিছুই নয়।

রাজনীতির আসনের বেড়াজাল শুধুমাত্র পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নতুন কোন শক্তি বা নতুন কোন দলের কোন সুযোগ নেই সেখানে। পরিবারের শাসনতন্ত্রের মত রাজনীতিও হয়ে গেছে পরিবারতান্ত্রিক। নিজের ছেলে, তার ছেলে, তার ছেলে বা মেয়ে এভাবেই শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু কেউ যদি সেখানে ভালো কিছু করতে চায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় নতুনভাবে সেখানে আসবে পাহাড়সম বাধা। একসময় সে ভালো মানুষটিও রাজনীতির মারপ্যাঁচে খারাপ ও কূটবুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে যাবে। ঠিক এভাবেই ভ্রমণ পিপাসু শাকিব খান রাজনীতির ময়দানে একজন পাকা খেলোয়াড় হয়ে যায়। বুঝে যায় দাবার চাল নিজের কাছে রেখে কিভাবে অন্যের কিস্তিমাত করতে হবে।

‘রাজনীতি’আমাদের দেখিয়েছে রাজনীতিতে ভালোবাসার কোন স্থান নেই, নেই কোন সম্পর্কের দাম। রাজনীতি মানেই হল নিজেকে সবার আগে এগিয়ে নিয়ে যাবার খেলা। যে খেলাতে সামনে যদি স্বয়ং জন্মদাতাও আসেন তাহলেও তাকে শেষ করে নিজের গদি ঠিক করতে হবে। বুলবুল বিশ্বাস খুব সুন্দর করেই প্রতিটি জিনিসকে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন।

এতোসব গুটিবাজি, চালবাজির পরেও রাজনীতিতে আছে একটি ভালোবাসার গল্প। প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা, ভাই-ভাইয়ের ভালোবাসা, বাবা মার ভালোবাসা, সন্তানের সাথে পিতামাতার ভালোবাসার পারিবারিক ব্যাপারগুলোও ফুটে উঠেছে এখানে। সিনেমার শেষে খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছে পরিবারের থেকে বড় বা আপন কেউ নেই। কু বুদ্ধি দেওয়ার মত মানুষ অনেক থাকলেও ভালোবেসে জড়িয়ে ধরার মানুষ শুধুমাত্র ঐ পরিবারেই আছে।

রাজনীতিতে কি শুধু ভালো গল্পের বুনন আর সামাজিক কিছু সমস্যাই আছে? আর কিছু নেই? আছে, রাজনীতিতে আছে মিলন, অমিত হাসান, আলীরাজ ও সাদেক বাচ্চুর অভিনয়। আনন্দ অশ্রু সিনেমার পর সাদেক বাচ্চুর অভিনয় দেখে যেন চোখের শান্তি লেগেছে, এমন মনে হয়েছে। অমিত হাসান এবং আলীরাজ স্বভাবসুলভ ভালো অভিনয় করেছেন তবে সিনেমার শেষদিকে অমিত হাসানের মাত্রাতিরিক্ত হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি বাজে লেগেছে। ডায়লগ ডেলিভারি স্বাভাবিকভাবেও দেওয়া যেতো, যেভাবে সিনেমাতে ট্রেড মার্ক ডায়গল ডেলিভারি দিত আমাদের শ্রদ্ধেয় হুমায়ূন ফরিদী স্যার, সেভাবে দিলে সিনেমার ক্লাইমেক্স আরো দূর্দান্ত হত। তবে সিনেমাতে কারো কথা যদি আলাদা করে বলা লাগে, তাহলে বলতে হবে মিলনের কথা। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে একা টানছে পুরো সিনেমাটি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমানতালে অভিনয় করে গিয়েছেন। শাকিব খানের সাথে পদ নিয়ে জোরালো গলায় তর্ক কিংবা মায়ের সাথে বাকবিতন্ডা, মনে হচ্ছিল পুরো ক্যারেক্টারের মধ্যে ঢুকে গেছেন তিনি। সিনেমার একদম শেষ দৃশ্যতে নিজের ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরার আকুলতা অনেকের মন ছুঁয়ে যাবে। রাজনীতির জন্য যদি মিলন জাতীয় পুরস্কারও পেয়ে যান অবাক হবার মত কিছু হবে না। অসাধারণ একজন অভিনেতার দেখা পাওয়া গেছে‘রাজনীতি’তে। শাকিব, অপু তাঁদের মত করে সেরাটা দেবার চেষ্টা করেছেন।

রাজনীতিতে কি সব ভালো? হ্যাঁ, গান ভালো, চিত্রায়ন সুন্দর, ড্রোন শটগুলো বেশ লেগেছে তবে একটা খারাপ আছে। হ্যাঁ খারাপ আছে, তা হল কস্টিউম ও মেকআপ। সিনেমার পোষ্টার এবং ট্রেইলার দেখার পর থেকেই মনে একটা কথা মনে বেজে চলেছিল আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা কি এ ধরণের সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরেন, সাথে চাদর থাকে? নাহ, আমি কোথাও দেখি নি। এছাড়া নকল গোঁফ বেশি বেমানান লেগেছে। কোন প্রয়োজন ছিল না হয়তো এধরনের কস্টিউমের। মুজিব কোর্ট কিংবা স্যুট টাই পড়িয়েও জাঁদরেল রাজনীতিবিদের রোল প্লে করা যায়। আশা করছি নির্মাতা এ বিয়য়ে পরবর্তীতে খেয়াল করবেন। আর শাকিব খানের চুলের কথা নাই বা বললাম। তিনি বরাবরই এ বিষয়ে উদাসীন।

সব কথা শেষ করা হল, রাজনীতি একটি সুন্দর সিনেমা। সিনেমাটি আরো ভালো হত যদি পরিচালক রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ও কৌশলের সহিত একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপসংহার টানতেন। হয়তো পরিচালক এমন একটি এন্ডিং চেয়েছেন যেন তিনি পরবর্তীতে এটির একটি সিক্যুয়াল নির্মাণ করতে পারেন। বহুদিক তিনি খোলা রেখেছেন, রেখেছেন কিছু অসমাপ্ত চরিত্র। সর্বদিক বিচারে একটি সামাজিক সিনেমা রাজনীতি, যা পরিবার নিয়ে উপভোগ করার মত। নির্মাণ, কাহিনী ও অভিনয়ের বিচারে রাজনীতিকে ১০ এ ৭ রেটিং নিঃসংকোচে প্রদান করা যায়।

লেখক : আবদুল্লাহ আল মানী, চলচ্চিত্র সমালোচক | ছবি : ইন্টারনেট