নিঃসঙ্গ জীবন তরী

শাকিল মাহমুদ

ইউনুস হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসে। ইদানিং এটা ঘনঘন হচ্ছে। ছোটবেলায় হতো, বিয়ের আগেও হত, বিয়ের পরও মাঝে মাঝে হয়েছিলো। এখন বয়স ষাটের কাছাকাছি। বয়সের কারণে নানা রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। পুরনো রোগগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। হার্টে বসেছে দুটো রিং। রাতে ঘুমও ঠিকমত হয়না। ঘুম একটু গাঢ় হলেই আজেবাজে সব স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। হার্টবিট বেড়ে যায়। তখন সে ধড়ফড় করে উঠে বসে। যখনই এমন হয় তখনই পাশে সালমাও উঠে বসে। তারপর স্বামীর কাঁধে হাত রেখে বলে পানি খাবা?

পানি খেলে একটু শান্তি লাগে। পানির একটি বোতল এখন সে মাথার পাশে রাখে। কারণ গত কিছু দিন ধরে সালমা বাড়িতে নেই। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলে যখন বুক ধরফড় করে তখন পানি সে খুঁজে পাবেনা। এজন্যই পানিটা হাতের কাছে রাখা। আজকে শুধু বুক ধরপড়ই করেনি রীতিমতো ব্যথা শুরু হয়েছে। চিনচিনে ব্যথা।

ইউনুস কয়েকবার সালমা…সালমা বলে ডেকে থেমে গেলো। সালমা যে নেই সেটা এতক্ষণ মনে ছিলোনা । কোন রকমে পানির বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেল। পানি খেতে গিয়ে গা ভিজিয়ে ফেলেছে। হাতটা এমনভাবে কাঁপছিলো যে বোতলের পানি সারা শরীরে পড়ে বিছানাও কিছুটা ভিজে গেল। একটু পরই হয়তো আজান হবে। ফজরের জামাতে অংশ নিতে পারবে কিনা সেটা সে নিশ্চিত না। শরীর কাঁপছে। সামান্য না। বেশ ভালোমতো কাঁপাকাঁপি। স্বামীকে এরকম অসুস্থ অবস্থায় রেখে সালমার বেড়াতে যাওয়া ঠিক হয়নি। দীর্ঘ সময় সে একাকী প্রবাস জীবন কাটিয়েছে। জীবনের শেষ সময়টা একাকী কাটানো অনেক কঠিন কাজ। ইউনুস আবার শুয়ে পড়েছে। তার ঘুম আজ আর আসবেনা। শত চেষ্টা করলেও আসবেনা। সে ভাবছে ইদানিং কেন এমন স্বপ্ন দেখছে। সে দেখেছে তার বড় ছেলে ইমরান হঠাৎ পানিতে পড়ে গেছে। পানি থেকে বাঁচার কোন চেষ্টাই সে করছেনা। পুরো শরীর ডুবে গেছে শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। সে চোখ দিয়ে ইমরান বাবার দিকে চেয়ে আছে। ইউনুস ছেলেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন জানি সে পানিতে নামতে পারছেনা। আশেপাশে প্রচুর মানুষ চলাফেরা করছে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেনা। ইউনুস চিৎকার করছে আর হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তখনি তার বুক ধড়ফড় শুরু হল। সালমা পাশে থাকলে ব্যাপারটা তাকে বলা যেত। সালমাকে এখন তার নির্দয় মনে হচ্ছে।

স্বপ্নে ইমরানকে বেশ ছোট মনে হয়েছিলো। ইমরান এখন অনেক বড়। পড়াশোনার জন্য গত চারবছর ধরে সে অষ্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছে। এছাড়া ডিস্ট্রিক্ট সুইমিং এ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যে ছেলে আলমারিতে দুটো গোল্ড মেডেল ঝুলিয়ে রাখতে পারে সে পানিতে ডুবে মরার কোন মানে নেই।

সালমা গেছে তার মেয়ের বাড়ি। মেয়ের নাম ফাতিমা। ফাতিমা দ্বিতীয়বার মা হতে চলেছে। ওর স্বামীটা অনেকটা বোকা গোছের। মা বাবার একমাত্র সন্তান হওয়াতে শহরের ছয়তলা বিল্ডিংটার অধিকার পেয়েছে। তার জীবন চলে বিল্ডিংয়ের ভাড়া তুলে। বলতে গেলে এটাই তার আয়ের একমাত্র উৎস। আরেকটা উৎস অবশ্য আছে। তার কিছু বন্ধু শেয়ারে কি যেন করেছিলো। সেখান  থেকে কিছু টাকা আসে। সবাই মুরগী পেলে বোকাসোকা হিসেবে সে ডিম হলেও পায়। ফাতিমার শ্বশুর বেশ ভালো একটা মানুষ। তার কর্মজীবন ছন্দময়। দেশের মাটিতে তিনি বহু কিছু করেছেন। অকর্মণ্য ছেলেটাকে তিনি খুবই ভালোবাসেন। ছেলের কোন ইনকাম নাই, এ নিয়ে বাবার কোন মাথা ব্যথাও নেই। তিনি এ ব্যাপারে সংক্ষেপে বলেন, সে আমার ছেলে গুণ হিসেবে এটাই তার জন্য যথেষ্ট।

ফাতিমার শ্বশুর যতটা ভালো ঠিক ততটাই খারাপ তার শাশুড়ি। তার কাজ হল সারাদিন পুত্রবধূকে সন্দেহ করা। ফাতিমার সবকাজ তার অপছন্দের। ফাতিমা টিভি দেখলে চিৎকার দিয়ে বলেন সারাদিন টিভি দেখার জন্য এ বাড়িতে এসেছো?

আর টিভি না দেখলে বলেন, বৌমা এ বাড়িতে যে টিভিটা আছে সেটা কি সারাদিন বন্ধ করে রাখার জন্য কেনা হয়েছে? একটা টিভি যে এ বাড়িতে আছে সেটাতো দিন দিন ভুলেই যাচ্ছি। নাকি ভুলিয়ে ভালিয়ে টিভিটা বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবার ফন্দি করেছো?

ফাতেমার আবারও মেয়ে হবে এ খবরে তার শ্বশুর বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, মেয়ে হলো আল্লাহর খাস রহমত। যে ঘরে মেয়ে শিশু থাকবে সে ঘরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে”। অন্য দিকে ফাতিমার শাশুড়ি বলল, “নবাবজাদীর কপাল এতো পোড়া কেন? বংশের মুখ রাখবে কে?” এতো কিছুর ভেতর ফাতিমা বেশ সুখে আছে। কারণ তার স্বামী আমজাদ বোকা হলেও তাকে খুব ভালোবাসে। মা যেদিন ফাতিমাকে বকাঝকা করে আমজাদ সেদিন মুখ ফুলিয়ে রাখে। রাতে নিঃশব্দে কাঁদে। কিছু বলেনা।

ইউনুস দুপুরে খেতে বসেছে। সকালে সে বাজারে গিয়েছিলো। বাজারে নদীর ছোটমাছ পাওয়া গেছে। এসব মাছ সহজে বাজারে আসেনা। যখন আসে তখনই কিনে ফেলতে হয়। তারপর ফ্রিজে রেখে দাও। যখন ইচ্ছা বের করে রান্না করে ফেলো। অবশ্য ছোটমাছ ফ্রিজে রাখলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। কাজের মহিলার রান্নার হাত ভালো। যা রান্না করে তাই-ই স্বাদ হয়। ঘর বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় সে বেশ সচেতন। সব কিছু ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। তার রান্নার হাত যতটা ভালো চুরির হাত তার চেয়ে বেশি ভালো। চুরি করে কিন্তু ধরা পড়েনা। সেদিন ইউনুস বাজারে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। সালমা দুটো পাঁচশত টাকার নোট টেবিলে গ্লাসের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছে। পাশে বাজারের ব্যাগও ছিলো। ইউনুস রেডি হয়ে দেখে ব্যাগ আছে শুধু টাকাটা নেই। চোখের পলকে একাজ শুধু কাজের মহিলাই করতে পারে। কিন্তু তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই সে টাকা সরিয়েছে। কলতলায় ধোয়ামোঝা করছে আর গুনগুন করে গান করছে। তাকে এখন টাকার কথা জিজ্ঞেস করলে সে এমন ভাব করবে যেন আকাশ কালো মেঘের বজ্রপাতসহ তার মাথায় পড়েছে। পাঁচমিনিট সে হা করে থাকবে। তার অবস্থা দেখে ইয়াসিনের মনে হবে টাকার কথা জিজ্ঞেস করে সে মহাপাপ করে ফেলেছে।

তবে অন্য সময় সে অকপটে স্বীকার করে ফেলে। এমন ভাবে স্বীকার করে যেন দোষের কিছু করেনি সে। আজ সে সুযোগটা এসেছে। ইউনুস খেতে খেতে বলল, “ফুলির মা, রান্নাতো অসাধারণ হয়েছে। রান্নায় কি দিয়েছো?”

ফুলির মা কথা বলেনা। হাসে।

ইউনুস আবার বলে তোমার বাসার সবাই ভালো আছে?

ফুলির মা বলে, “আছে, ভালা আছে। তয় লোকটার সামান্য জ্বর আছিল। এইটা তেমন কিছুনা।”

ইউনুস বলল, “তোমার জামাইরে কি বলে ডাকো?”

ফুলির মা হাসে, জবাব দেয় না।

ইউনুস বলল, “আচ্ছা, ঠিক করে বলতো সেদিন এক হাজার টাকা দিয়ে কি করেছো?”

ফুলির মা বলল, “লোকটার দরকার আছিলো, সকালে চাইছিলো।”

ইউনুস আর কিছু বলেনা। চোর চুরির দায় স্বীকার করেছে। তাকে শাস্তি দেওয়া উচিৎ। কিন্তু ফুলির মাকে শাস্তি দেওয়া যাবেনা। কাজের জন্য মানুষ সহজে পাওয়া যায় না। তার মত করিৎকর্মা লোক হাতছাড়া হয়ে গেলে আর ফিরে পাবার সম্ভাবনা কম। এর আগেও বেশ কয়েকবার ফুলির মা ধরা পড়েছে। তার কোন বিচার হয়নি। একবার ধরা পরেছে পুকুর চুরিতে। ইউনুস সৌদি থেকে আসার সময় সালমার জন্য একটা স্বর্ণের নেকলেস এনেছিলো দু’ভরি ওজনের। সালমা গোসলের সময় নেকলেস খুলে শোকেসের উপরে রেখেছিলো। আর পায় নি। এটা যে ফুলির মায়ের কাজ তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইউনুস ফুলির মাকে কিছু বলেনি তখন। সে আশে পাশের জুয়েলারি দোকান গুলোতে বলে রেখেছিল। চুরির এক সপ্তাহ পর ‘মা জুয়েলারি’র লোকজন ফুলিকে হাতে নাতে ধরে নিয়ে আসে। ইউনুস সেবারও ফুলির মাকে কিছু বলেনি। শুধু সালমা বলছিলো- এ নেকলেস আমি আর পড়বোনা।

ইউনুসের বয়স যখন ঊনিশ তখন সংসারে প্রচন্ড আর্থিক সংকট চলছিলো। পরিবারের প্রয়োজনে তাকে সৌদি আরব পাঠানো হল। প্রবাসের দূর্বিষহ জীবন এখনো মনে পড়ে। কষ্ট হয়। শুরুর দিকে সে বাগানের কাজ পায়। আরবীতে এটাকে মাজরা বলে। প্রতিদিন সকালে উটের গাড়ি তাকে দূরে একটা খেজুর বাগানে রেখে আসতো। সাথে দুটো খুবজুন আর দুম্বার দু’টুকরো গোস্ত । আরবীতে রুটিকে খুবজুন বলে। সারাদিন রোদ মাথায় নিয়ে কাজ করত ইউনুস। নিঃসঙ্গ একাকী। আশেপাশে কেউ নেই যে একটু আধটু কথা বলা যায়। মাঝেমধ্যে একাকীত্ব দূর করতে ইউনুস খেজুর গাছের সাথে কথা বলত। নিজে প্রশ্ন করত নিজেই উত্তর দিতো। দেশের কথা চিন্তা করে কাঁদতো। কি জীবনটাই না ছিলো। স্বচ্ছ নদীর পানিতে উদাম সাঁতার কাটা, ইচ্ছেমতো গোল্লাছুট খেলা। আহা সেসব দিন, আহা!

সু’সময়টা একদিন চলেই এলো। ইউনুসের প্রমোশন হল। সে বাজারে মালিকের সবজি দোকানে কাজ করবে। বেতন ভাতাও বেড়েছে। কষ্ট কমেছে, দশ বারো ঘন্টা ডিউটি। বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠায়। বাড়ি থেকেও নিয়মিত চিঠি আসে। দেশ থেকে কেউ সৌদি এলে মা চালতার আচার, চালের পিঠা, নারকেলের পিঠা, চ্যাঁপা শুটকি ইত্যাদি পাঠান। বেশির ভাগ সময় মা’ই চিঠি পাঠান। নিজে লিখতে পারেননা বলে পাশের বাড়ির মনসুরকে দিয়ে লেখান। মনসুর ইউনুসের বন্ধু। তাদের অবস্থা ভালো। বাবা অবশ্য নিজে লিখতে পারেন। তবে তিনি খুব একটা চিঠি দেননা। মায়ের চিঠিতেই যা বলার বলে দেন। গত পরশু বাবার একটা চিঠি এসেছে।  বাবা বাড়ি যাবার কথা বললেন। গ্রামের বাড়িতে দো’চালা ঘর উঠেছে। ছোট বোনের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদরের বোনটার এরকম একটা সময়ে পাশে থাকতে না পেরে ইউনুসের কষ্ট হয়, কান্না পায় তার। চিঠির শেষাংশে বাবা লিখেছেন, “তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। বংশ মর্যাদা ভালো। পড়াশোনাও আছে। চেহারা ছবি পছন্দ হবার মত। এখনো কথা পাকা হয়নি। তুই আসবি নিশ্চিত হলে কথা পাকা করে ফেলব।” – এ অংশটা সে দুবার পড়ে ফেলল। তারপর লজ্জা পেয়ে হেসে দিয়েছে।

ইউনুস ছুটি ম্যানেজ করে। দশ বছর পর বাড়ি যাচ্ছে। শেষ চিঠিতে সে বাবাকে নিশ্চিত করেছে একমাসের ছুটি সে পেয়েছে। যে দিন সে দেশে এসেছে ব্যাগ বোঝাই করে সবার জন্য গিফট এনেছে। ছোট বোনের জন্য এনেছে সোনার চেইন, কানের দুল, নাকফুল। বোনের বরের জন্য এনেছে একটা হাত ঘড়ি। শ্বশুরের জন্য একটা টর্চ, জায়নামাজ। নিজের বাবা মায়ের জন্যও অনেক কিছু এনেছে। কম্বল এনেছে চারটা। যেদিন সে দেশে এলো তার দুদিন বাদেই ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। বাসর ঘরে একটা মেয়ে গুটিসুঁটি মেরে বসে আছে। কিছুক্ষণ পরপর কেঁপে উঠছে। বিয়েটা মেয়েদের জন্য প্রথম দিকে বেশ বেদনার। মা বাবা ছেড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সাথে থাকা সহজ ব্যাপার না। ইউনুস অভয় দেয়। সারাদিনের ক্লান্তি তাকে ঘুমের ঘোরে নিয়ে যায়। সে সালমাকেও ঘুমিয়ে পড়তে বলে। সালমা ঘুমিয়ে পড়লে মৃদু আলোয় ইউনুস সালমার চেহারা দেখে থমকে যায়। কি অপরুপ, কি অপূর্ব মায়াবী চেহারা। সেই মাস টা ছিলো জীবনের সেরা মাস। তারপর একদিন আসে সে বিষাদের দিন। ছুটি শেষ। রাতেই তার ফ্লাইট। সালমার চোখের পানি, মায়ের আহাজারি, বাবার আর্তনাদ কোন কিছুই তাকে আটকাতে পারেনা। এই কিছু মুখের খাবার, ওদের ভালো থাকার জন্যইতো প্রিয়জনের মায়া তাকে ছাড়তে হবে। বিমানে ইউনুস বেশ কিছুক্ষণ কাঁদে। তারপর আবার একে একে চলে যায় কত শ্রাবণ, কত মাঘ, কত বসন্ত। পদোন্নতি হয়। সে সবজি দোকানের ম্যানেজার। বেতন অনেক। কিন্তু সারাক্ষণই টেনশন বাড়ি নিয়ে। এর ভেতর তার মা বাবা দুজনই মারা গেছেন। সালমার কোল জুড়ে এসেছে দুটো নতুন মুখ। ফুটফুটে সন্তান দুটোর বয়সের ব্যবধান তিন বছর। ইউনুস তখন মোটামুটি বয়স্ক। বয়স পঞ্চাশের ঘর পার হল। এর ভেতর সে আরো বেশ কবার দেশে গিয়েছিলো। যত বারই গিয়েছে আর ফিরতে ইচ্ছে করেনি। যখন একেবারে ফিরে ততদিনে নিজের মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল। সে বাবার আদর যতœ ঠিকমতো পায়নি। ছেলেটা চলে গেল দেশের বাইরে। ছেলে মেয়ে দুজনই বাবার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি। সারাটা জীবন পরিবারের জন্য দিয়ে গেল। পরিবার তাকে কাছে টানেনি।

সালমা পড়েছে ভীষন বিপদে। আজ ফাতিমার ডেলিভারির ডেট। কিছুক্ষণের মধ্যে এম্বুলেন্স আসার কথা। এম্বুলেন্স এলেই সে ফাতিমাকে নিয়ে হসপিটালে রওনা হতে পারে। ঠিক এ সময়ে খবর এসেছে ইউনুসের অবস্থা ভালোনা। সম্ভবত ষ্ট্রোক করেছে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ফাতিমার শ্বশুর বাড়িতে অন্য ঝামেলা শুরু হয়েছে। আজই মূল ঘটনা জানা গেছে। ফাতিমার শ্বাশুড়ি আমজাদের নিজের মা নয়, এ তথ্য এতোদিন গোপন ছিলো। আজ দুজন ঝগড়া করার সময় সেটা প্রকাশ হয়ে গেছে। ফাতিমার শ্বশুর শ্বাশুড়ী দুজন দুদিকে মুখ গোমরা করে বসে আছে। আমজাদ এম্বুলেন্সের জন্য গিয়ে এখনো ফিরে নি। বোকাটা কি করছে কে জানে। সালমা কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা। ব্যথায় কাতর মেয়েটাকে ফেলেও যেতে পারছেনা। আবার স্বামীর পাশেও থাকতে পারছেনা।

হসপিটালে ইউনুস একা। কিছুক্ষণ আগে তার জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারছেনা। তার খুব পানির তৃষ্ণা পেয়েছে। সে কয়েকবার সালমাকে ডাকার চেষ্টা করল। সালমাকে তার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তার আসলে সবাইকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কেউ নেই। ইউনুসের মনে হল সে শূন্যে ভাসছে। এটা তার নিজস্ব জগৎ বলে কেউ প্রবেশ করতে পারছেনা। আবার মনে হল কেউ একজন তার পাশে আছে। সে মাথায় বিলি করে দিচ্ছে। কোনরকম চোখ তুলে দেখে তার মা নিজেই চুলে বিলি করে দিচ্ছে। গুনগুন করে গানও গাইছে “গোল করোনা, গোল করোনা, খোকন ঘুমায় খাটে”। ইসমাইলের মনে পড়লো, ছোটবেলায় তার মা তাকে খোকন ডাকতো। তার ঘুম চলে আসছে। প্রচন্ড ঘুম।

অলংকরণ – ইতি