খামে ভরা মুগ্ধতার গল্প

রাজীব রূদ্র

আজ অনিকের জন্মদিন। প্রতিবার জন্মদিনে সে বাড়িতে চলে যায়, জন্মদিন উপলক্ষে কোন আয়োজন করতে চাইলে তাকে পাওয়া যায় না। এই জন্মদিনে তাকে পাওয়ায় আমার যতটা না খুশি তার চেয়ে বেশি আফসোস হচ্ছে। যেদিন থেকে শহরে এসে উঠেছি তার একমাস পর থেকে আমি অনিকের সাথে একই ছাদের নিচে, এবছরই আমাদের শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তি হয়েছে তাই চাইলেও আর একসাথে হয়তো থাকা হবে না। একজন ভাল মনের মানুষ আর বন্ধু হিসেবে অনিক আমাকে অনেক ভাল মুহুর্ত উপহার দিয়েছে, সে তুলনায় আমার দেওয়ার পাল্লা একেবারেই নগণ্য কেননা ছেলেটা আমাকে কখনো সেরকম কোন সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে হয় না। আজ আমার অনেক কাজ কেননা জীবনে একবার আমি এই ছেলেটার জন্মদিন পালন করার সুযোগ পেলাম। এই সুযোগ কোনভাবে হাতছাড়া করা যাবে না। এই প্রথম কোন কাজে এত আগ্রহী আমি !

নিজের অবচেতন মনকে প্রশ্ন করে উত্তর পেলাম এটা তো অনিকের জন্মদিন, কাছের বন্ধুদের দাওয়াত করা হল। ব্যাচেলর জীবনের কোন দাওয়াত মানে তো বোঝা যায় আলাদা আগ্রহের জায়গা, এখানে বসবাসরত সামজিক প্রাণীগুলোর কোন উপলক্ষের দরকার পড়ে না তারা শুধু উদযাপনটা জানে তা বেশ ভালোভাবে জানে। সন্ধ্যায় সবাইকে আসতে দেখে অনিক যেন ভড়কে গেল, পরক্ষণে আমরা সবাই তাকে ছোটখাট উপহার দিয়ে নিজেরা সন্তুষ্ট হলাম। রাতের ভুরিভোজের পর সবাই আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে ব্যস্ত। আমি আর অনিক রুমে বাকিরা চলে গেছে; আমি নিজে শুতে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছি। এই সময়ে আমার মনে পড়ল, আজ তো বৃহস্পতিবার রাত!

অন্যদিনের মত নিশ্চয়ই কিছু একটা অনিয়ম হচ্ছে সত্যিই তো অনিয়ম হচ্ছে। এই অনিয়মটা করছে অনিক। আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে যাব ভাবলাম ওর নিজস্ব বিষয়ে মতামত দেয়ার তো যৌক্তিকতা নেই, তাই না? আমার সব শংকা যেন উবে গেল, অনিক এসে বলল কাল রাতে বাড়ি যাবে এবং সাথে আমাকেও নিয়ে যাবে। আমি এতদিন ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা বললে সে এড়িয়ে যেত। আজ তার পক্ষ থেকে এমন একটা আবদার আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। পরদিন আমাদের যাত্রা…..

আমি অনিকের যে অনিয়মের কথা বলছিলাম তা তো ভুলেই গেছি, যেদিন থেকে অনিকের সাথে দেখা এরপর প্রতি সপ্তাহান্তে বৃহস্পতিবার রাতে অনিক বসে যেত চিঠি লিখতে। এই চিঠি লিখত ভালবাসার মানুষটিকে,আধুনিকতার মোড়কে এমন খাঁটি বা প্রকৃত ভালবাসা আমি দেখি নি, খুব সম্ভবত আর কোথাও এখন অন্তত প্রচলিত নেই। আসলে বিষয়টা বোধগম্য নয়, তার নিজেরও আমার মত মাঝারি মানের একটা মোবাইল ফোন ছিল তারপরও ছেলেটি নিয়ম করে সপ্তাহান্তে একটা প্রকান্ড চিঠি লিখতে বসতো তার মায়ের কাছে।

মা-ছেলের নিরেট ভালবাসার সেতুবন্ধন ছিল একেকটা চিঠি, সারা সপ্তাহে যা যা ঘটত তার সবটাই থাকত, বাদ যেত না আমার কথাও। আমি প্রতিনিয়ত শিখে যাচ্ছি এই যে দুরে থেকেও কিভাবে আপনজনকে ভালবাসা যায়। এই ব্যস্ত নগরে কয়জনই আমরা নিয়ম করে খবর রাখি আপনজনের? আমি অনিকের মতন ধীরস্থির না হওয়ায় মায়ের সাথে ঝটপট কথা বলে মায়ের প্রতি দূর্বলতাটা লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করতাম। আমি একবার অনিককে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার চিঠি লেখার নেপথ্যে কি? সেদিন সাবলীল ভাষায় কঠিন একটা উত্তর দিয়েছিল, রীতিমত হৃদকম্পন শুরু হয়ে গিয়েছিল আমার, ভয়ানক একটা সত্য কোন মানুষ এতটা নির্ভার হয়ে বলতে পারে আমার জানা ছিল না। অনিকের সাথে বাড়িতে যাওয়ার জন্য গোছগাছ করছি। আমি মফস্বল শহরে একক পরিবারে বেড়ে উঠায় গ্রামের প্রতি দূর্বলতার নিমিত্তে একটা টান অনুভব করি। এই বৃহস্পতিবার রাতে অনিকের চিঠি না লেখার কারণ নিশ্চয়ই পরিষ্কার। পরদিন যাত্রা শুরু করলেও আমার এখনো ঘোর কাটছে না, আমি ওনার মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজেকে যতটা পারি স্বাভাবিক রাখার সব কৌশল শিখে নিচ্ছি। যাত্রাপথের ক্লান্তি এড়াতে আলাপ জুড়ে দিলাম যেখানে উঠে আসল এক মমতাময়ী মায়ের আখ্যান যিনি নিজের জীবনের সমস্ত কিছুকে ফেলে কিভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁর আদরের সন্তানদের। অনিকের বাবার যখন অকালমৃত্যু হয়েছিল তখন তাদের কোন সহায়সম্বল ছিল না। ঐ সময়ে ভরসার জায়গা বলতে মায়ের স্বল্প বেতনের চাকরিটা, ভাগ্য বিধাতা বোধহয় সহায় ছিল না। অনিকের মায়ের বড় ধরনের একটা দূর্ঘটনা হয়েছিল।

অনিকের ভাষায় “আমার মা বাইরে থেকে একদম দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি ভেতরটাই এতটা মুষড়ে যান নি যে তাঁকে কেউ চাইলে নিজের অবস্থান থেকে একবিন্দু নাড়াতে পারবে।”

তিনি নিজের সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের কাজের  প্রতি এতটাই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, পরবর্তীতে অফিসের কর্তাগণ বরং তাঁর ইচ্ছাশক্তির কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে চাকরিতে বহাল রাখেন। সাগরের অথৈ জলরাশিতে ডুবতে বসা কোন মাঝির কাছে ভেসে আসা খড়কুটা যেন পরম সম্বল, সেখানটায় অনিকের মায়ের কাছে দুই ছেলেই ছিল পরম ভরসার পাত্র।

ওনার প্রতি শ্রদ্ধা কয়েকগুণ বেড়ে গেল, আমার মায়ের মুখ-খানা ভেবে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। এসময়ে অনিক বলল আমরা নাকি পৌঁছে গেছি এবার একটু হাঁটলেই তাদের বাড়ি চলে আসবে। আমার নিজের ভেতর ভাললাগা আর উৎকন্ঠা সমানভাবে কাজ করছে। আমি নিজেকে স্বাভাবিক রেখে অনিকের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে লাগলাম, বাড়িতে পৌঁছেই আমি একজন চল্লিশোর্ধ মহিলাকে দেখলাম, তিনি নিজের কাজে যারপরনাই ব্যস্ত  ছিলেন। আমাদের দিকে কোন ভ্রুক্ষেপই করলেন না। আমি বারান্দায় বসেছিলাম, হঠাৎই ভদ্রমহিলা এসে অনিকের কপালে বারকয়েক চুমু এঁকে দিলেন, অনিককে উদ্দেশ্য করে একই প্রশ্ন বারবার করে যাচ্ছে। প্রশ্নের বিপরীতে অনিকের জবাবে বুঝলাম উনি আসলে জানতে চাইছেন, এই সপ্তাহে কেন চিঠি আসেনি? প্রশ্নের জবাবটা হাসির ছলে উচ্চস্বরে বলতে লাগল– এই সপ্তাহে বাড়ি আসবে তাই তার চিঠি লেখা হয় নি, জবাবটা আসলে আমার জন্য ছিল কেননা আমি যাতে বুঝতে পারি তারা মা ছেলে কি বিষয়ে কথা বলছে। আমি যেন নিজেকে হারিয়ে ফিরছি আমাদের মায়েরা সন্তানদের কি আসলে এইভাবে ভালবাসে? জানেন….

অনিকের মায়ের সাথে যে দূর্ঘটনাটা হয়েছিল তাতে তিনি নিজের সবটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান, দূর্ঘটনার পর তিনি বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যান। এখন আমি বুঝতে পারছি অনিকের কাছে কেন চিঠিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মায়ের সাথে যোগাযোগের এই ছিল অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম, চমকের যেন আরো বাকি ছিল কেননা অনিক মায়ের সামনে একটা খাকি রংয়ের খাম তুলে ধরল। এই সময়ে ওনার চেহারা দেখে আমারও বিস্ময় জাগল এই খাকি খাম তো ওনার কাছে অপরিচিত বটে। আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটল বৈকি, এই খামে ছিল অনিকের চাকরির নিয়োগপত্র। অনিক এই ঘটনাটা আমাকে বলে নি ভালই হয়েছে, বললে আমি মায়ের পরমতৃপ্তির আনন্দে উজ্জ্বল মুখখানা দেখার সুযোগটাই হারিয়ে বসতাম। অনিকের মায়ের কাছে সুখবর পৌঁছানোর অন্যকোন পন্থা আমার মাথায় আসছে না।

সেদিন সন্ধ্যায় আমার সামনে একটা জাদুর বাক্স খুলে বসলেন, পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখেছেন অনিকের পাঠানো সব চিঠি। প্রতিটা চিঠির সাথে খামটাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।

ওনার নিজের ভাষায় প্রতিবারই যখন ওনার ছেলের কথা মনে পড়ে তখন একটা করে খাম যেন আবার নতুন করে খোলেন, এই খামে নাকি ছেলের একটা ভালবাসা জড়িয়ে আছে। প্রতিবারই তিনি এক পরম মুগ্ধতায় বিমোহিত হন খামগুলো খুলে চিঠিগুলো পড়তে গিয়ে। এই মা-ছেলে আমাকে বারংবার মুগ্ধ করেই যাচ্ছে।

বাক্সের এক জায়গায় লিখে রেখেছেন “মুগ্ধতায় ভরা খামের গল্প”; এইযুগে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে যেন সবচেয়ে সুখী মা আমি, ছেলের লেখা চিঠির ভাঁজে আমি অকৃত্রিম একটা ভালবাসা খুঁজে পাই। ওনার ভাষায় চিঠির প্রতিটা খাম যেন মুগ্ধতায় ভরা একেকটা ভালবাসার ঝুলি।

আমি অনিকের বাড়িতে ঘুরে এসেছি প্রায়ই ছয়মাস হল। সে সময়ের কিছু স্মৃতি আমি ফ্রেমে বন্ধী করে নিয়ে এসেছি। আজ আমি আরো একটা কারণে বেজায় খুশি কেননা আজ অনিক তার মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। মায়ের এই সমস্যার কথা শুনে ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন কানে যদি একটা যন্ত্র বসানো হয় তবে তিনি অন্ততপক্ষে শুনতে পারবেন। এই প্রকৃতির কত কিছুই তো আছে যা শোনার জন্য কতটা ব্যাকুল হয়ে আছেন। ছেলেদের মুখে মা ডাক শোনার তো একটা আবদার থেকে যায়। মানুষকে খুশি করার জন্য কারণে অকারণে নির্মল একটা হাসি দেন তা হোক নিঃশব্দে, তাতে লুকিয়ে আছে ভালবাসার শুভ্রতা। আমি ফ্রেমে বন্ধী ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে স্মৃতিচারণ করছি ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে বসে। উনি বেরিয়ে এসে আমাকে দেখে নিশ্চয়ই একটা সুচিন্তিত হাসি দিবেন, মায়ের মুখে এমন একটা হাসি তো পরম- প্রাপ্তিই যেকোন ছেলের জন্য। এই বুঝি চলে এলেন… …।

অলংকরণ : ইতি