সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র: শশাঙ্ক রেডেম্পশন: একটি আশাগল্প

ইমরান হোসাইন

একজন মানুষকে যদি বিনা দোষে শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। কিন্ত ব্যাপারটা আরো কঠিন মনে হবে যখন ঐ শাস্তি তার স্বাধীনতা কেড়ে নেবে, যখন স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হবে চারদেয়ালের মাঝে, বিচ্ছিন্ন  করে দেয়া হবে পৃথিবীর সাথে, যেখানে একটু সহানুভূতি দেখানোর মতো মানুষ পাওয়া দুষ্কর, সময় আরো কঠিন হয়ে পড়বে যখন উপরোক্ত বিষয়গুলোর সাথে জীবনের একটি বিশাল সময় অতিবাহিত করার পর, ঐ চারদেয়ালের সাথে মানিয়ে নেয়ার পর, একদিন ছেড়ে দেয়া হবে পৃথিবীর বুকে, তখন আপনি কি করবেন? তখন আপনি নিজেকে কোনো সভ্য পৃথিবীর মানুষ বলে দাবি করতে পারবেন না, কারণ ৪০/৫০ বছর আগে আপনি পৃথিবীকে যে পরিস্থিতিতে দেখে এসেছেন সেই পৃথিবী এখন আর আগের মতো নেই, কিন্তু আপনি? আপনি আগের মতোই আছেন, তখন শুধু একটি জিনিসের অপেক্ষায় থাকবেন আপনি, আর তা হলো ‘মৃত্যু’! কিন্তু এখানেও ভাগ্য আপনার সাথে নতুন খেলা খেলবে, তখন মৃত্যুও আপনাকে দেখা দিবে না, আপনাকে দিয়ে পাড়ি দেয়াবে আরো বহু ক্রোশ। কিন্তু আপনি ঐ চার দেয়ালের মধ্যে প্রবেশ করার পর যখন এর পৈশাচিকতা সম্পর্কে জানতে পারবেন তখন আপনি মরিয়া হয়ে উঠবেন মুক্ত হওয়ার জন্য। মিথ্যা হত্যা মামলায় আরোপিত করে এক ব্যক্তিকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় বন্দিশালায়। দেখানো হয় সেই বন্দিশালায় তার লড়ে যাওয়ার গল্প। এটি শশাঙ্ক রেডেম্পশনের গল্প না, এটি মূলত রাশিয়ান লেখক লিও টলস্টয়ের একটি ছোট গল্প ‘গড সি দ্য ট্রুথ, বাট ওয়েটস’। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭২ সালে, টলস্টয়ের এই ছোট গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিখ্যাত মার্কিন লেখক স্টিফেন কিং ছোট গল্পটিকে রূপান্তরিত করেন উপন্যাসে, নামকরণ করেন ‘রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশাঙ্ক রেডেম্পশান’। যা পরবর্তীতে মূল গল্পের উপর কিছু ঘষামাজা করে ‘দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশন’ নামে সিনেমার পর্দায় ফেলেন ফ্রাংক ডারাবন্ট।

বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ছয়শ সিনেমা পুরো বিশ্বে মুক্তি পায়। এই ছয়’শ সিনেমার মাঝে কিছু সিনেমা মনকে নামমাত্র বিনোদিত করতে সক্ষম আবার কিছু সিনেমা মনের গভীরে দাগ টেনে যায়। কি ছিলো এই সিনেমায় যা এভাবে দাগ টেনে গিয়েছিলো? সেই সময় তো মরগান ফ্রিম্যান, টিম রবিন্স কারোর-ই তেমন জনপ্রিয়তা ছিলনা, এছাড়াও ছিলো না বড় কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী। আর পরিচালক ফ্রাংক ডারাবন্টও এই সিনেমা দিয়ে নিজেকে বড় পরিসরে মেলে ধরতে চেয়েছিলেন। সে বছর-ই মুক্তিপ্রাপ্ত আরো একটি সিনেমা ‘পাল্প ফিকশন’ বক্স অফিস ঝড় তুলেছিলো, সিনেমাটির বিষয়বস্তু (মোস্টলী ভায়োলেন্স এন্ড স্টোরি) ছিলো দর্শকদেরকে সিনেমা ঘরে আনার জন্য যথেষ্ট। সে হিসেবে শশাঙ্কে এই কনটেন্টের অনুপস্থিতির কারণে বক্স অফিসে তেমন সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হয়। সাড়া ফেলতে না পারার আরো একটি কারণ ছিলো ‘নো একশন’ আর প্লট ‘প্রিজন ড্রামা’। বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্ট এই সিনেমার বক্স অফিস সম্পর্কে বলেন “এই সিনেমা প্রথমত প্রিজন নিয়ে নির্মিত তার উপর সিনেমায় কোনো একশন সিকুয়েন্স নেই, মূলত এই দুটি কারণে বিশেষত নারী দর্শকদের কাছে সিনেমাটি সমাদৃত হতে পারেনি”।

Shawshank-Redemption-2

মুক্তির সময় সিনেমার নাম শুনে অনেকেই একে একশনে ঠাসা প্রিজন ব্রেক সিনেমা মনে করে হলে গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে অস্কারে সাতটি নমিনেশন ছাড়া প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূণ্যই বলা চলে । বক্স অফিসে সাড়া না পেয়েও ‘দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশন’ আজ সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর একটি। সেরা সিনেমার তালিকা অপূর্ণ থেকে যায় এই সিনেমার নাম তালিকাভুক্ত না হলে। সিটি অফ গড, মার্সল্যান্ডে বা এমেলি সিনেমার মত চোখ জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফি ছিলো না কিন্তু এর টাইম ফ্রেম টেকনিক এতো-ই ফলপ্রসূ ছিলো যে সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকে-ই চরিত্র আর স্টোরিকে অডিয়েন্সের সাথে একদম কানেক্ট করে দিয়েছে ।

সরলরৈখিক চিত্রনাট্য দিয়ে পরিচালকের মূল লক্ষ্য ছিলো সিনেমার গল্পকে প্রথম মিনিট থেকে-ই দর্শকের মনে গেঁথে দিবেন। এই কারণে মূল চরিত্রকে অঙ্কিত করেন স্বল্প ডায়ালগের মাধ্যমে, সিনেমায় অন্যতম প্রধান চরিত্র (রেড) এর তুলনায় মূল চরিত্রের ডায়ালগ ছিলো প্রায় অর্ধেক। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন টিম রবিন্স, টিম রবিন্সের আগে এই চরিত্রে টম হ্যাঙ্কস (ফরেস্ট গাম্প সিনেমার সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় এই সিনেমার কাজ ছেড়ে দেন), কেভিন কস্টনার, জনি ডেপ সহ আরো বেশ কয়েকজন প্রথম সারির অভিনেতাকে অভিনয় করানোর কথা বিবেচনায় রাখা হলেও শেষে টিমকে-ই এন্ডি ডুফ্রেন চরিত্রে চূড়ান্ত করা হয়। অনবদ্য অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘Innocent Man in prison’ রূপকের চরিত্র ।

Shawshank-Redemption-3পুরো সিনেমা এগিয়ে চলছে মরগান ফ্রিম্যানের জাদুকরী গল্পকথনের মাধ্যমে। এটিই ছিলো মরগান ফ্রিম্যানের প্রথম ন্যারেট করা সিনেমা। এর আগে ‘ড্রাইভিং মিস ডেইজি’র মাধ্যমে আলোচনায় আসেন কিন্তু ব্রেক থ্রু ঘটে এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই। ‘রেড’ চরিত্রে পুরো সিনেমা জুড়েই ছিলেন তিনি। সব কাজেই দোষ ধরা রেড চরিত্রের অন্যতম একটি গুণ, সাহিত্যের ভাষায় রেড চরিত্রকে যদি বর্ণনা করা হয় তাহলে বলা যেতে পারে ‘রেড এমন একটি চরিত্র যার বিশুদ্ধ আত্মা অশুভ কৃতকর্মে আবদ্ধ’। একজন দৃঢ়ভাবে স্বাধীনচেতা (এন্ডি) আরেকজন ঋজুরেখায় আবিষ্ট (রেড), এই দুইজনের বন্ধুত্বের নামই হচ্ছে ‘দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশন’।

অস্কারে সাতটি নমিনেশন পাওয়ার পর যেনো নদীর জল উল্টো দিকে বইতে শুরু করলো। সেরা সিনেমার নমিনেশন যেনো এই স্রোতে ধনাত্মক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ’৯৫ সালের সর্বাধিক রেন্টেড সিনেমা হয়ে যায় বক্স অফিসে অসফল ‘দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশন’। আর এভাবেই ‘স্ট্রেন্থ অফ মাউথ’ এর মাধ্যমে দ্য শশাঙ্ক সর্বকালের সেরা সিনেমার একটিতে পরিণত হয়।

শশাঙ্ক রেডেম্পশন তাদের উদ্দেশ্যে নির্মিত যারা সামান্য ঝড়ে পরাস্ত হয়ে নিজেকে সঁপে দেয় ঝড়ের কাছে। আর তাদের উদ্দেশ্যেই সিনেমায় এন্ডি’র এই ডায়ালগ “Hope is the good thing, maybe the best of things, and no good things ever dies”.

লেখক : চলচ্চিত্র সমালোচক • আই, জানুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত

এ সংখ্যার অন্যান্য লিখা পড়তে: আই, জানুয়ারি ২০১৭