আত্মকথন : দানিয়েল আলম

দানিয়েল আলম, সম্ভাবনাময়ী পরিচালক ও সিনেমাটোগ্রাফার। সন্দ্বীপের এই মেধাবী যুবক জানেন কিভাবে টিকে থাকতে হয়, হাল ধরে রাখতে হয়। সময় ও পরিস্থিতির কাছে হার না মানা এ তরুণই আমাদের সংখ্যার তরুণ মুখ। ‘আই’-তে তিনি কথা বলেছেন চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা, তাঁর যাত্রার কথা। সাথে ছিলেন মোমেন খান

ছোটবেলা থেকে তেমন কোন স্বপ্ন ছিল না যে আমি ফিল্মমেকার হবো। কলেজের ১ম বর্ষে এক বন্ধুর মারফতে শ্রদ্ধেয় মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী পরিচালিত ৪২০ ধারাবাহিক নাটকটি দেখার সুযোগ হয়। আমার ধারণা ছিল ফিল্ম মানেই অনেক টাকার ব্যাপার। কিন্তু আমার লাইফের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ‘৪২০’। ধীরে ধীরে তাঁর কাজের ভক্ত হয়ে যাই। তাঁর নির্মিত সব কাজ দেখে ফেলি। তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন আর্টিকেল পড়ি। তারপরে নতুন করে ইরানী চলচিত্রের প্রেমে পড়ি। বিভিন্ন দেশের ফিল্ম দেখতে থাকি। অনলাইনে, অফলাইনে যখনই সময় পাই ফিল্ম রিলেটেড কিছুনা কিছু স্টাডি করতে থাকি। লেখাপড়া নিয়ে পরিবার থেকে অনেক চাপ ছিল। তারপরও এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষার আগ পর্যন্ত ফিল্ম রিলেটেড কিছু করার জন্য সময় বরাদ্দ রাখতাম। ইতোমধ্যে কলেজের বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে একটা গ্রুপ করে ফেলি। প্ল্যান ছিল পরীক্ষার পরে একটা ১ ঘন্টার নাটক বানাবো। নাটক লিখে ফেলা হয়। আমার জীবনের প্রথম লিখিত নাটকের নাম দিই ‘পাঁচফুট ভালোবাসা’। প্ল্যান ছিল নাটক বানানোর টাকা জোগাড় না হলে প্রয়োজনে কম্পিউটার বিক্রি করে দেবো। ঠিক পরীক্ষার পরপর পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার কারণে গ্রামে মাইগ্রেট করা লাগে। টাকার জন্য ঘরের অনেক কিছুর সাথে কম্পিউটারটিও ঢাকাতে বেঁচে দিয়ে আসতে হয়। তখন মনে হচ্ছিল স্বপ্নগুলো থেকে অনেক অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। তবু কেমন যেন এক অদৃশ্য সুতার টান অনুভব করতে লাগলাম। সন্দ্বীপ থেকেই শুরু করলাম আমার স্বপ্নকে সত্যি করার প্রচেষ্টা। কারো কাছ থেকে হাতে কলমে কাজ শেখা বা একাডেমিক লেখাপড়ার কথা তোয়াক্কা না করে বিয়ের ভিডিও করার ক্যামেরা নিয়ে নেমে গেলাম শর্টফিল্ম বানাতে। সন্দ্বীপের মত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে থেকে মনে হতো মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী তো কোন মানুষের কাছ থেকে হাতে কলমে কাজ শিখেন নি অথবা ফিল্মমেকিং রিলেটেড কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেননি। উনিও মানুষ, আমিও ব্যতিক্রম নই।

গ্রামে কাজ করতে গিয়ে যেমন অনেক মানুষের সাপোর্ট পেয়েছি তেমনি নানান কুৎসার সম্মুখীন হয়েছি। প্রথম প্রথম নিজের কাজ নিজে দেখেই খারাপ লাগতো। মনে মনে বলতাম কি কল্পনা করেছিলাম আর এখন বানানোর পরে কি হয়েছে। বারে বারে হতাশ হয়েছি কিন্তু থেমে যাইনি। আমার তখন থেকেই বিশ্বাস ফিল্মমেকিংয়ে নিজের ভুল থেকে শেখার চাইতে আর বড় কোন শেখার জায়গা হতে পারে না। ২০১৩ সালের শীতের মাঝামাঝি, নির্মাণ করি শর্টফিল্ম – আতু, ২০১৪ সালের রোজার ঈদে ১ ঘন্টার নাটক ‘আমরা সবাই পোলাপান’ তারপর নাটক ‘শূন্যস্থান’। বেশকিছু শর্টফিল্ম এর স্ক্রিপ্টও লিখতে থাকি সময়ে সময়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে – মোমেন খান পরিচালিত ‘অসামাজিক’, শারাফাত আলী শওকত পরিচালিত ‘আকাশ নীলের খোজে’, ইমরান পরিচালিত-‘হুইল অফ লাইফ’ ইত্যাদি। সিনেমাটোগ্রাফি করি নাসের আহাম্মেদ পরিচালিত ‘খুন্নাস’ শর্টফিল্মে। প্রকৃতপক্ষে তখন চট্টগ্রাম শহরে সমমনা মানুষজনদের সাথে পরিচিতি বাড়তে থাকে। আর কাজ করতে করতে একটু একটু করে অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে।

এরই মধ্যে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর প্রোডাকশন হাউস ‘ছবিয়ালে’র সাথে বেশ কিছ টিভিসিতে হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতা হয়। এর পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারিতে ক্যান্ডিফ্লস ফিল্মে অফিশিয়ালি জয়েন করি ডিরেক্টর ও স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে। একই বছর মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী পরিচালিত আন্তর্জাতিক চলচিত্র ‘ডুব’ এ হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ হয়। চোখ খুলে যায় ফিল্মমেকিং জগত! কত বিস্তৃত! কত কিছুইনা শিখার আছে! একই বছর ক্যান্ডিফ্লস ফিল্মস থেকে বেশ কিছু ডকুমেন্টরি ফিল্ম, শর্টফিল্ম, এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইন প্রমোশনাল পরিচালনা করি।

ফিল্ম নিয়ে আমার নিজের কোন একনিষ্ঠ পর্যালোচনা নেই বা থাকলেও তা ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়। কারণ আমি বিশ্বাস করি আমি প্রতিনিয়ত কাজ করতে করতে শিখছি অনেকটা হোঁচট খেতে খেতে হাঁটতে শিখার মতন। নিজ ধারণা থেকে বলতে পারি, ভবিষ্যৎ ফিল্মমেকাররা হবেন বাহক আর দর্শকরা হবেন ধারক। ফিল্ম বলতে যা বর্তমানে বুঝি অর্থাৎ টিভি সেট বা বড়পর্দায় তা আর থাকবে না। দর্শক নিজেই ফার্স্ট পারসন হয়ে ফিল্মের ক্যারেক্টার প্লে করবে, ক্যারেক্টার এর স্থলে নিজেকে অনুভব করবে। এমনকি সাসপেন্স, থ্রিল, আনন্দ, ভয়, বেদনা সবই বাস্তবিকভাবে অনুভব করবে। সবই হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। অর্থাৎ মানব মস্তিষ্কে যান্ত্রিক উপায়ে সবকিছুই ইনপুট দেয়া হবে। হয়তো ফিল্ম নামটাই পালটে যাবে।

Daniel-2

ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে। এই সেক্টরে নতুন নতুন মেধাবীমুখ দেশের চলচ্চিত্রের মুখ উজ্জ্বল করবে। যেহেতু ফিল্ম জিনিসটা মাত্র কয়েক শতাব্দী পুরনো তাই এর অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন হবে। নতুন যারা ফিল্মমেকিং এ আসতে চান তাদের উচিত প্রচুর দেশী-বিদেশী ফিল্ম দেখা। সকল ধরনের লেখালেখি পড়া। আর সাহস করে নেমে যাওয়া। কারণ নিজের ভুল থেকে শিখাই হচ্ছে এমন শিক্ষা যা শতভাগ কাজে লাগে।

ফিল্মমেকিং এর জন্য পরিবার পরিজন থেকে খুব একটা বাধা বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয় নি। বরং সাপোর্ট পেয়েছি তবে অনেকাংশই শুধু মানসিক সাপোর্ট। অনেক বেলা না খেয়ে কাটিয়েছি, কোন সময় ৩ টাকার ১ কাপ রঙ চা আর ২ টাকার এক পিস সল্টেড বিস্কুটে সূর্য থেকে সূর্য পার করেছি।

শুরুতেই বলেছি যে আমি ছোটবেলা থেকে কোনদিন স্বপ্ন দেখতাম না বা স্বপ্ন ছিল না যে আমি ফিল্মমেকিং করব। তাই বলে কি বড়বেলাতে কোন স্বপ্ন জন্ম নিবে না? এখন আমি স্বপ্ন দেখি ভুল করতে করতে ফিল্মেকিংটা সত্যি সত্যিই শিখে ফেলব। পৃথিবীকে এমন কিছু দিয়ে যেতে চাই যেন ভবিষ্যৎ পৃথিবী আমায় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। সর্বোপরি মানুষের মতো মানুষ হবো।

 

ছবি : শারাফাত আলী শওকত