ডুব : ঘোষণা, মহরত, শ্যুটিং, বিতর্ক, বিতর্ক, বিতর্ক!!

ঘোষণা :

গুণী নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী। নির্মাণ করতে চলেছেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ‘নো ল্যান্ড’স ম্যান’- যেখানে অভিনয় করবেন বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা নওয়াজউদ্দীন সিদ্দীকি। ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ফিল্ম মার্কেটে সেরা প্রজেক্টের পুরষ্কারও জিতে নিয়েছে। ২০১৬ এর মার্চ এর আগ পর্যন্তও মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর নতুন সিনেমা বলতে এইটুকুই মুখে মুখে ছিলো। মার্চ ১- হঠাৎই ফারুকী ঘোষণা দেন পরবর্তী ছবি ‘নো ল্যান্ড’স ম্যান’ নয়, এর আগে তিনি নির্মাণ করবেন চলচ্চিত্র- ডুব। যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকবেন বলিউডের ইরফান খান, টলিউডের পার্ণো মিত্র এবং বাংলাদেশের নুসরাত ইমরোজ তিশা, রোকেয়া প্রাচী। আনুমানিক বাজেট ১৫ লাখ ডলার অর্থাৎ ১২ কোটি টাকা যার দায়িত্ব নেবে বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া এবং কলকাতার এসকে মুভিজ। আরো বলা হয়, গল্পটি ভালোবেসে ইরফান খান নিজে সহ-প্রযোজক হিসেবে থাকতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। আচমকা এতগুলো খবরে কেঁপে উঠলো পুরো দেশ, কলকাতা এমনকি বলিউডও। যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও বলিউডের অনেক পরিচালক ইরফান খানের শিডিউল পাননা, কী এমন গল্প যে তিনি অভিনয় তো করবেনই আবার সহ-প্রযোজকও হতে রাজি! সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো ‘ডুব’।

মহরত ও শ্যুটিং :
১৮ মার্চ ২০১৬, রাজধানীর এক অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত হলো ‘ডুব’ এর মহরত। অনুষ্ঠানে পরিচালক, প্রযোজকসহ সব কলাকুশলী উপস্থিত ছিলেন। ২০ মার্চ থেকে শুরু হলো শ্যুটিং- ইরফান খানের ছিলো ২৫ দিনের শিডিউল। তাই ঠিক ২৫ দিনের মধ্যে ঢাকা ও বান্দরবানের দুর্গম অঞ্চলে ‘ডুব’ এর শ্যুটিং শেষ করা হয়। টানা শ্যুটিং শেষে ১৫ এপ্রিল তিনি দেশে ফিরে যান। বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে কবে নাগাদ দেখা যাবে ‘ডুব’।

বিতর্ক শুরু :
এতদিন পর্যন্ত সব ঠিকঠাকভাবেই চলছিলো। বিতর্কের শুরু ৪ নভেম্বর ২০১৬। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়- ডুব ছবিতে ইরফান খান অভিনয় করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হূমায়ুন আহমেদের চরিত্রে। গল্পটাও তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রানিত। আরো বলা হয় এই ছবিতে হুমায়ুন আহমেদের কন্যা শিলা আহমেদের চরিত্রে অভিনয় করছের বাংলাদেশের নুসরাত ইমরোজ তিশা, প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মেহের আফরোজ শাওনের চরিত্রে অভিনয় করছেন টালিগঞ্জের পার্ণো মিত্র।

এমন অপ্রত্যাশিত এক খবরে বাংলাদেশের দর্শক, পরিচালক সবাই কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। মেহের আফরোজ শাওন সরাসরি প্রতিবাদ করে বসলেন। বলেন, যদি ডুব সত্যি সত্যিই হূমায়ুন আহমেদের বায়োপিক হয়ে থাকে, তবে অনুমতি না নেওয়ায় তিনি পরিবারের একজন হিসেবে ডুবের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিবেন বলেও হুমকি দেন। তবে হুমায়ুন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর কন্যা শীলা আহমেদ বলেন – “এটা হুমায়ূন আহমেদের জীবন অবলম্বনে হলে অবশ্যই ওর (পরিচালকের)আমাদের কাছ থেকে পারমিশন নেওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু ও যদি কয়েকটা ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটা বানায়, সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই”। তবে বায়োপিক বানানোর প্রশ্নে পরিচালক কূটনীতির আশ্রয় নেন। পরিচালক বলেনছবির ক্রেডিট বা ক্যাম্পেইনে বা কমিউনিকেশন ম্যাটেরিয়েলে আমরা কখনোই দাবি করি নাই বা করার কোনো সম্ভাবনাও নাই যে ‘আমরা হূমায়ুন আহমেদের বায়োপিক বানাচ্ছি’। আমরা কোনো বায়োপিক বানাচ্ছি না। এই ছবির প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক”।

ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তাঁর কথায় আসলে মানুষ দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে থাকে। পরিচালক বায়োপিক বানানোর কথা অস্বীকার করেছেন কিন্তু কাল্পনিক চরিত্র তৈরী করে ভাব মিল রেখেও তো চলচ্চিত্রটি হতে পারে। সেটা কি হচ্ছে? নাকি অযথাই সস্তা জনপ্রিয়তা কিংবা হাইপের লোভে হুমায়ুন আহমেদকে টেনে আনা হয়েছে- উঠছে সে কথাও। কারণ বাজেটটা অনেক বেশী, ১২ কোটি টাকা! সে যা-ই হোক, হূমায়ুন আহমেদের ভক্তরা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উঠেছে ঝড়, শুরু হয় পাল্টাপাল্টি যুক্তি প্রদর্শন। বিনোদন পাতা থেকে পত্রিকার প্রথম পাতায় চলে এসেছে এই সংবাদ। তবে হূমায়ুন আহমেদ আছেন কি নেই সেটা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা না হলেও ডুব নিয়ে মাতানো যে ব্যাপারটা, আনন্দবাজারের এক নিউজে সেটা অনেকটাই হয়ে গিয়েছিলো।

বিতর্কের তুঙ্গে:

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭-এডিট করে ‘ডুব’ সেন্সর প্রিভিউ কমিটিতে জমা দেওয়া হয়েছে। কদিন পর সেন্সর পার পেয়ে যাবে- এমন কথাই চলছে। ১৪ এপ্রিল এর মুক্তি দেওয়ার সম্ভাব্য তারিখও ঠিক করা হয়। কিন্তু সেন্সর প্রিভিউ বোর্ড থেকে সেন্সর বোর্ডে চলচ্চিত্রটি জমা দেওয়ার আগেই ১৩ ফেব্রুয়ারি মেহের আফরোজ শাওন সেন্সর বোর্ডের কাছে একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি জানান যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তিনি জানতে পারেন ‘ডুব’ সিনেমাটি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবন অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে। এতে পরিবারের কারো অনুমতি নেয়া হয়নি।  তিনি বিষয়টি সেন্সর বোর্ড কর্তৃপক্ষের নজরে নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তার ১ দিন পরেই ডুবের জন্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংবাদটি প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক বিনোদন পত্রিকা ভ্যারাইটি। তারা জানায়, ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এফডিসি) ‘ডুব’ স্থগিত করেছে বা ‘সার্টিফিকেট’ বাতিল করেছে।  যৌথ চলচ্চিত্রের নীতিমালা মেনে ১২ ফেব্রুয়ারি প্রিভিউ কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয় সিনেমাটি। প্রিভিউ শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি এক অনাপত্তিপত্রের মাধ্যমে ছাড় দেয় কমিটি। কিন্তু তার এক দিন পরই ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় এক আদেশে অনাপত্তিপত্রটি স্থগিত করে প্রোডাকশনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। বলা হয়, তথ্য মন্ত্রনালয়ের আদেশে ‘ডুব’ স্থগিত করা হয়। এই স্থগিতাদেশটা ফারুকীর জন্যে বড় রকমের ধাক্কা হয়ে আসে। তিনি বলেন যে তাকে প্রথম দরজায় আটকে দেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনের আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর ছবিটিকে। তিনি এটাকে বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন। সহ-প্রযোজক ও অভিনেতা ইরফান খান বলেন “ডুব ছবিটি আটকে দেয়ার ঘটনায় আমি খুবই বিস্মিত! মানবিক গল্পের এ ছবিতে একজন পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও টানাপোড়েনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। এটি কীভাবে সমাজের ক্ষতি করতে পারে তা আমি বুঝতে পারছি না”। তবে পরবর্তীতে জানানো হয় এই স্থগিতাদেশ স্থায়ী কিছু নয়।

পোস্টার বিতর্ক :

এর মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি ডুব-এর অফিশিয়াল পোস্টার রিলিজ দেওয়া হয় এবং চলচ্চিত্রের ট্যাগলাইন ঠিক করা হয় “বুকের ভেতর বয়ে চলে পাহাড় নামের নদী। আহারে জীবন, আহা জীবন”! বিতর্ক এখানেও যেন পিছু ছাড়েনা ডুবের। ১৯৮৫ সালে নির্মিত হলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘রকি ৪’ এর পোস্টারের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে মোস্তফা সরায়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবির পোস্টারে। পোস্টার নকল বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই কথা বলতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে পরিচালক ফারুকী নকলের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “যারা দুটোকে এক করে দিচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।”

 

হঠাৎ চুপ যেন সব, আবার :

পোস্টার রিলিজের পরপরই কেমন যেন সব চুপচাপ হয়ে গেলো। তেমন মাতামাতি নেই। তবে ভেতরে ভেতরে কাজ চলছিলো। ইতোমধ্যে বিদেশের বেশ কিছু উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ডুব। ৩৯তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ডুব ‘কমেরসান্ত জুরি প্রাইজ’ এবং সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ‘গোল্ডেন গবলেট অ্যাওয়ার্ড’এর জন্য মনোনয়ন পায়। এছাড়াও ভ্যাঙ্কুবার ফেস্টিভাল ও ১২ অক্টোরর ২২তম বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে বলে জানানো হয়েছিলো। পাশাপাশি ‘হলিউড রিপোর্টার’, ‘স্ক্রিন ডেইলি’তে বের হয় প্রশংসাসূচক রিভিউ। বাংলাদেশেও ৮ আগস্ট সেন্সরবোর্ড থেকে ছাড়পত্র পায় ‘ডুব’। ছাড়পত্র পাবার আগে অবশ্য বিভিন্ন সময়ের মোট ৫ টি দৃশ্য যা সর্বমোট ২ মিনিট ২৫ সেকেন্ড বাদ দিয়েছে সেন্সর বোর্ড। তবে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী জানান এসব দৃশ্য কাহিনীতে তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। বিতর্ক কি চলে গেছে ভাবছেন? ভুল। সেন্সর বোর্ডের পরিচালক ও ফারুকী সহ অনেক গুলো বানানভুল নিয়েও তো কত কথা হল।

ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রথমে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো যে, আসছে নভেম্বরের ৩ তারিখ মুক্তি পাচ্ছে বহুপ্রতীক্ষিত ‘ডুব’। পরবর্তীতে পরিচালক-প্রযোজক মহল থেকে জানানো হলো, ডুবের মুক্তি এগিয়ে আনা হয়েছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে সিনেমাটি। আরো জানানো হয় বাংলাদেশ ও ভারতে একই দিনে মুক্তি দেওয়া হবে এবং মুক্তি দিন অভিনেতা ইরফান খানও উপস্থিত থাকবেন। মুক্তির ঠিক ১ মাস আগে ২৭ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয় ‘ডুব’র ট্রেইলার এবং ১২ অক্টোবর মুক্তি দেওয়া হয়  এই সিনেমার একমাত্র গান ‘আহারে জীবন”। ট্রেলার এবং গানের লক্ষাধিক ইউটিউব ভিউই বলে দিচ্ছে দর্শকের কি পরিমাণ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ডুব।

অপেক্ষা কেবলই মুক্তির :

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে ২৭ অক্টোবর। বাংলাদেশের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর কারণে অক্টোবরের পুরোটা প্রচারণায় ব্যয় করতে না পারলেও ১৪ অক্টোবর থেকে কোমর বেঁধে নেমেছেন ডুব টীম। দর্শকেরাও অপেক্ষা করছেন। অবশ্য পছন্দের লেখক হূমায়ুন আহমেদকে টেনে এনে প্রচারণার করার অভিযোগ এনে ইতোমধ্যে ‘ডুব’ বর্জন করেছে অনেকেই। সে যা-ই হোক, আসলেই হূমায়ুন আহমেদের জীবনী কিংবা ছায়া অবলম্বনে কি না? নাকি এ কেবলই প্রচারণার কৌশল? ইরফান খানের মুখে বাংলা কেমন লাগবে? আবার কোন বিতর্ক বাঁধবে না তো? সিনেমাহলে কেমন চলবে? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ২৭ তারিখ ।

 

তথ্যসূত্র : ১লা মার্চ, ২০১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ২০১৭ পর্যন্ত দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা

2 comments

  1. ‘ডুব’ কী আসলেই হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক!! বিশ্বাসও হয় না, আবার অবিশ্বাসও-বা করি কী করে?

    তবে, কোন সিনেমা নিয়ে এত্তো এত্তো ‘নাটকীয়তা’ আগে দেখেছি-শুনেছি বলে মনে পড়ে না। হাহ্! অপেক্ষা-ই করি ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত।

    ধন্যবাদ, আবির— কষ্টসাধ্য সুন্দর লেখাটির জন্য। আগে বাড়ো …!

    #ডুব #DOOB #27thOctober Jaaz Multimedia #NoBedOfRoses Mostofa Sarwar Farooki Nusrat Imrose Tisha Irrfan Parno Mittra Rokeya Prachy Humayun Ahmedㅣহুমায়ূন আহমেদ

    Like

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে।