নীল চোখের বেদনা

নীল চোখের মানুষ দেখেছেন? একদম গাঢ় নীল চোখ? আমি দেখেছি। সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। উপমহাদেশে নীল চোখের মানুষের অভাব।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। কোচিংয়ে যাব। রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। খানিক পরে পাশে একটা রিক্সা এসে থামল,

– “বাজান, কই যাবেন??”

মানুষটা বৃদ্ধ। সাদা দাঁড়ি। রোদে পুড়ে যাওয়া তামাটে চামড়া। চেহারাটা পোড়খাওয়া। ঘামে চব চব করছেন। সাধারণত বৃদ্ধদের রিক্সায় উঠা উচিত না। একে তো স্লো, তার উপর ভাড়া বেশি দাবি করে। আবার না দিয়েও পারা যায় না। কিন্তু উনারাও তো পেট চালানোর জন্য রিক্সা চালান। আমরাই যদি উনাদের রিক্সায় দু’টাকা বেশি দেওয়ার ভয়ে না উঠি, তাহলে উনারা চলবেন কিভাবে? না, আমি এত মহাপুরুষ অথবা ধনী নই। উনাকে এড়িয়ে যাওয়াটাই আমার জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু এড়াতে পারি নি। এড়াতে না পারার কারণ উনার চোখ। গাঢ় নীল রঙের মায়াবী চোখ। সচরাচর দেখা মিলে না। উঠে পড়লাম। সিনেমায় দেখা নীল চোখের প্রতি বরাবরই একটা আগ্রহ ছিল। সুন্দর লাগত, আফসোস হত, আমার নীল চোখ নাই কেন!! হঠাৎ এভাবে দেখা পেয়ে যাব ভাবি নি। কথা বলতে ইচ্ছে করছে উনার সাথে। কিন্তু কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিলাম না। উনিই সহজ করে দিলেন,

– “বাজান, কোন কেলাসে (ক্লাসে) পড়েন??”

উনার কন্ঠে ভোলা বা বরিশালের দিকের টান। সাধারণত কক্সবাজারে ওদিককার মানুষ আসে, জালের ব্যবসা অথবা মাঝি হয়ে। আমার যতটুকু ধারণা ছিল।

– “ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। মানে আইএ তে।”

Nil-Chokher-Bedona - Copy

এরপর উনার বাড়ি কই জিজ্ঞেস করলাম। বলল বরিশাল। ছোটখাট কথা হচ্ছিল। জানতে পারলাম এই রিক্সা বা ভ্যান চালানো ছাড়া আর কিছুই পারেন না। আট ছেলে মেয়ের জনক তিনি। সবাই মোটামুটি পড়ালেখা করছে। উনি চান না, উনার মত কেউ হন। পড়ালেখা করে যাতে সবাই মোটামুটি ভালভাবে চলতে পারে। বড় ছেলেটা বরিশাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করছে।

আমার গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম। নীল চোখের মানুষটাকে বিদায় জানাতে হবে। এক প্রকার মায়া জন্মে গিয়েছিল তাঁর উপর। রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দেয়ার আগে জিজ্ঞেস করলাম,

– “আপনি বউ ছেলে মেয়ে ফেলে এত দূরে রিক্সা চালাতে আসছেন কেন? বরিশাল তো এই কক্সবাজারের চেয়েও বিশাল শহর।”

উনি হাসলেন খানিকটা। ভাড়া নিতে নিতে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু হাসিটা মুখ থেকে সরে যায় নি। ধীরে ধীরে বললেন,

– “পোলা ভার্সিটি পড়ে। তার বাপে যদি রিক্সা চালায়, তাইলে কেমন দেখায়! পোলার একটা মান সম্মান আছে না! আর এই কাজ ছাড়া তো কিছু করতেও পারি না। পোলা মাইয়াগো খাওয়ামু কি? ভাল করে পড়াশোনা করো বাপজান। বড় মানুষ হও। যাই, আমি।”

আমার মুখ থেকে আর কথা বের হয় নি। স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। ছেলের মানসম্মান রক্ষা করছেন, পরিবার থেকে এত দূরে এসে!

মুখে হাসি রেখে, উনি যেন আর্তনাদ করছিলেন। কথাগুলো বলতে উনার ঠোঁট কাঁপছিল। কান্না চেপে রাখার চেষ্টা। নীল চোখে তখন বেদনা, টলটল করছে পানিতে। মায়া ঝরা চোখ দু’টোতে তখন রাজ্যের কষ্ট, হতাশা এসে ভর করেছে। ঘামে ভিজে মলিন জীর্ণ শার্টটা গায়ে লেগে আছে। ক্লান্ত পায়ে প্যাডেল ঘুরাচ্ছেন। মানসিক, শারীরিক কষ্ট যেন তাঁকে আঁকড়ে ধরে আছে।

তাঁর গমন পথের দিকে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন বাবা নামক মানুষগুলোর সন্তানের জন্য ত্যাগ। হঠাৎ মনে হলো, বাবাকে অনেকদিন জড়িয়ে ধরা হয় নি। কেমন আছেন, জিজ্ঞেস করা হয় নি।

লেখক : মোফাজ্জল হোসেন, ছাত্র ও লেখক

অলংকরণ : লিমা