শেকড়ের গল্প : হালদা

অনেকদিন পর ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবি দিয়ে আলোচনায় এসেছেন নন্দিত পরিচালক তৌকির আহমেদ। ঠিক এ কারণেই তাঁর পঞ্চম ছবি ‘হালদা’ নিয়ে ছিলো আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। তিনি এর কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন সে আলোচনায় পরে আসছি, শুরুতে জানা যাক ‘হালদা’ নদী থেকে কিভাবে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবিতে রূপান্তরিত হলো।
আজাদ বুলবুলের কাহিনীতে চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লিখেছেন তৌকীর আহমেদ। এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী ও এর দুই পাড়ের জেলেদের জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে। গল্পের সকল কাহিনী ও উপকাহিনী আবর্তিত হয় নদী ও নারীকে ঘিরে। নদীর চরিত্রে হালদা নদীকেই ব্যবহার করেছেন তৌকির আহমেদ আর নারীর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। আরো অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, জাহিদ হাসান, দিলারা জামান, রুনা খান ও মোশাররফ করিমের মত অভিনেতারা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জাঁদরেল অভিনেতাদের ছোটখাটো একটা মিলনমেলা বলা যায়।

Screenshot (195)
বিষয়, গল্প ও চিত্রনাট্য:
এ চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে এর বিষয়বস্তু এবং সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে গল্প। বিষয়বস্তু হচ্ছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নদী এবং মেয়েদের অসহায়ত্ব ও নির্যাতনের বাস্তব চিত্র। উভয় ক্ষেত্রেই নদী ও নারী আমাদের ক্রমাগত দিয়ে যায় আর বিনিময়ে পায় শুধুই লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। হালদা নদী ও ‘হালদা’ ছবির হাসু (তিশা) চরিত্রের জীবন যেন একি সুতোয় গাঁথা।
হালদা নদী বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। এ নদীর পাড়ের জেলেদের জীবন অনেকাংশেই নদীর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দখলদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজের স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবার জন্য হালদার বুক ড্রেজার দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি, ইটভাটা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পদার্থ হালদার পানিতে মিশে মাছের প্রজননের উপযোগী পরিবেশ নষ্ট করে। এমন প্রতিকূল পরিবেশে যে ক’টি মা-মাছ বেঁচে থাকে তা আবার কোন কোন অসাধু ও লোভী জেলের শিকারে পরিণত হয়। তৌকির আহমেদ গল্পের সংকট গুলো খুব সুন্দর করে সিনেমার পর্দায় চিত্রায়ন করেছেন। নদীর এই দুর্দশার সাথে লেখক হাসু চরিত্রের অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখিয়েছেন। হাসুর জীবন ও নদীর মতই সংকটাপন্ন। ভালোবাসার মানুষ থেকে কেড়ে নিয়ে প্রভাবশালী নাদের(জাহিদ হাসান) দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে হাসুকে বিয়ে করেন। বাবার অসহায়ত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে হাসু নিজের সুখ আহ্লাদ ত্যাগ করে নাদেরের সংসার শুরু করে। নতুন সংসারে তাকে নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয় নাদেরের হাতে, ঠিক যেমন হালদার পানি দূষিত হয় নাদেরের মত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইশারায়। গল্পের শেষে হাসু অবশ্য বিদ্রোহ করে, পাল্টা জবাব দেয় সকল অন্যায় ও অবিচারের। এর মাধ্যমে হয়তো তৌকির আহমেদ বুঝাতে চেয়েছেন যে, একদিন হালদা নদীও আমাদের উপর চড়াও হবে। সেদিন নাদেরের সাথে সাথে আমরা যারা নাদেরদের সহ্য করি তারাও রক্ষা পাবো না।

Screenshot (198)
গল্পে নতুনত্ব কিছুই নেই। একটা পর্যায়ে গিয়ে গল্পটি আমার অনুমানের সাথে মিলে যায়। এমন অনুমেয় গল্প আমরা চাই না। তবে, গল্প সাধারণ হলেও তার অসামান্য চিত্রায়ন নিঃসন্দেহে হালদা চলচ্চিত্রকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
গান ও সংলাপ:
ছবির গান নিয়ে কোন কথা হবে না। এক কথায় অসাধারণ। পিন্টু ঘোষের কণ্ঠ ও কম্পোজিশনে প্রত্যাকটা গান ছিলো শ্রুতিমধুর ও হৃদয়ছোঁয়া। গানের সাথে সাথে পর্দায় চলমান দৃশ্যগুলি ছিলো অসাধারণ।
ডায়লগের ব্যাপারটা একটু জটিল। খাটি চাটগাঁইয়াদের কাছে মনে হবে এটা তো বিশুদ্ধ চাটগাঁইয়া ভাষা না, আবার অন্যান্য অঞ্চলের কাছে মনে হবে এটা পুরোটাই চাটগাঁইয়া ভাষা। আসলে তৌকির আহমেদ যথাসাধ্য সহজ করে এই কঠিন আঞ্চলিক ভাষাটি ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তাই তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য।
পরিচালনা ও চিত্রগ্রহণ:
পরিচালক হিসেবে তৌকির আহমেদের গুণগান গেয়ে শেষ করা যাবেনা। তিনি বরাবরই অসাধারণ নির্মাতা। অভিনেতা অভিনেত্রীদের থেকে শতভাগ কাজ বের করে আনতে তিনি একেবারে সিদ্ধহস্ত। আর তার চলচ্চিত্রে তিনি সবসময় মঞ্চ থেকে উঠে আসা শিল্পীদের গুরুত্ব দেন। তাই পর্দায় চলা অভিনয়কে আর অভিনয় মনে হয় না।
চিত্রগ্রহণ তো এক কথায় তুলনাহীন। প্রত্যেকটা শটকে যতটুকু সম্ভব ন্যাচারাল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টি, বজ্রপাত ও রাতের দৃশ্যগুলির এমন বাস্তব রূপায়ন আমি আগে কখনো দেখি নি। আর গানের সময়ে পর্দায় দেখানো প্রতিটি শট ছিলো অনবদ্য।

Screenshot (204)
গল্পের দুর্বলতা সত্ত্বেও ‘হালদা’ একটি পরিপূর্ণ ছবি মনে হয়েছে। গল্প ও বিষয়বস্তু একেবারে আমাদের শেকড়ের কথা বলে। তৌকির আহমেদকে আবারো ধন্যবাদ বাংলাদেশের নিজস্ব ধারার ছবি বানানোর জন্য। হলিউড বা বলিউড মুভি দেখে সবাই যেভাবে বুঝে এটা হলিউডের ছবি এটা বলিউডের ছবি, আমার বিশ্বাস তৌকির আহমেদের ছবি দেখেও একদিন সবাই বলবে এটা বাংলাদেশের ছবি।

লেখক : মোহাম্মদ তানভীর ফয়সাল, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র সমালোচক

ছবি : টাইগার মিডিয়া