প্রিয় ৫টি চলচ্চিত্র যা মুখ থুবড়ে পড়েছিলো বক্স অফিসে।

বক্স অফিস নিয়ে আমির খান বলেছিলেন,“একটা চলচ্চিত্র কেমন হয়েছে সেটা কখনোই বক্স অফিস নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু একটা চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে কিভাবে গৃহীত হয়েছে তা মাপার অন্যতম মাপকাঠি হলো এই বক্স অফিস।” আসলেই কি সবসময় তা-ই ঘটে? অনেক সময় ‘এভারেজ’ চলচ্চিত্রও বক্স অফিস হিট করে, এটা ব্যাপার না। কিন্তু যখন অনেক উঁচু মানের চলচ্চিত্র বক্স অফিসে টিকতে পারে না, তখন?

আজ এমন কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলবো যা বর্তমানে দর্শকদের কাছে বেশ প্রিয় এবং ক্রিটিকদের কাছেও বেশী নম্বর পাওয়া হলেও চলচ্চিত্রটি মুক্তির সময়ে বক্স অফিসে টিকতে পারেনি। অবশ্য সব যে দর্শক পছন্দ করেনি বলে ফ্লপ করেছিলো তা নয়, আরো অনেক প্রভাবকও রয়েছে। দেখে নেওয়া যাক।

৫. ব্লেড রানার (১৯৮২)

ব্লেড রানার, সাই-ফাই সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বড় চলচ্চিত্র এবং পরিচালক রিডলী স্কটের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয় একে। প্রধান চরিত্রে হ্যারিসন ফোর্ডের মতো অভিনেতা অভিনয় করলেও ১৯৮২ সালে মুক্তির পরবর্তী সপ্তাহেই অধিকাংশ সব সিনেমা হল থেকে নামিয়ে নেওয়া হয় এই মাস্টারপিসটি। ঐ বছরটা ছিলো সাই-ফাই মুভির বছর। ‘দ্য থিং’, ‘স্টার ট্রেক ২ : দ্য রথ অভ খান’ এবং বিশেষত স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ইটি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্টিরিয়া’, যা সে বছর সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্র হয়েছিল। কিন্তু এসবের ভীরে ব্লেড রানার মুক্তির প্রথম সপ্তাহে আয় করতে পেরেছিলো মাত্র ৬.৫ মিলিয়ন ডলার! অপমানই বটে! সহ্য হলো না কারোরই। পরবর্তীকালে ডিভিডির মাধ্যমে এবং ডিরেক্টর’স কাট হিসেবে আবার রিলিজ দেয় ওয়ার্নার ব্রাদার্স এবং ১৯৯৩ সালে ‘সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং নান্দনিকতায় স্বার্থক’ হিসেবে বিবেচনা করে লাইব্ররেী অভ কংগ্রেস এই সিনেমাকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস ন্যাশনাল ফিল্ম রেজিস্ট্রি’র জন্যে নির্বাচিত করে।

৪. দ্য লোন রেঞ্জার (২০১৩)

পাইরেটস অফ ক্যারিবিয়ানের একের পর এক সাফল্যের পর ওয়াল্ট ডিজনীর মনে হয় এক পর্যায়ে জনি ডেপকে সোনার ডিম পাড়া হাঁস মনে হতে লাগলো। আর তাইতো নিতান্ত সাদামাটা একটা স্ক্রিপ্টে ২১৫ মিলিয়ন ডলার ঢালতে কার্পণ্য করেনি তারা। কিন্তু ভুল ভাঙতে বেশী দেরী হলো না তাদের। প্রথম সপ্তাহে মোটামোটি ২৯ মিলিয়ন আয় করলেও কোনরকমে টাকাটা তুলে নেওয়ার যে সম্ভাবনা ছিলো তা হতে দিলেন না ক্রিটিকরা। একের পর এক বাজে রিভিউ (অবশ্য যা পুরোপুরিই সত্য), ধীরগতির স্ক্রিপ্ট, স্থুলকায় দৈর্ঘ্য নিয়ে তুমুল সমালোচনা তাদের প্রায় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসলো। যদিও পুরোবিশ্ব মিলিয়ে তাদের মোট আয় ২৬০ মিলিয়ন হয়েছিলো, যা মোটামোটি ভদ্র একটা ফিগার কিন্তু বিজ্ঞাপনে যে অনেক বেশীই ক্ষতি খরচ হয়ে গেছে!

তবে যা-ই হোক, জনি ডেপের ভক্তদের কাছে লোন রেঞ্জার বেশ প্রিয় এবং তারা তাদের প্রিয় অভিনেতাকে যেভাবে দেখতে চায়, সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে বলে এই সিনেমাকে পছন্দের তালিকায় বেশ উপরের দিকেই রাখেন তারা।

৩. হুগো (২০১১)

কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার জর্জ মেলিয়েসের প্রতি কৃতজ্ঞতার অংশ হিসেবে মার্টিন স্করসেজি নির্মাণ করেন এডভেঞ্চার ড্রামা ঘরানার কিছুটা শিশুতোষ চলচ্চিত্র হুগো। অসাধারণ গ্রাফিক্সের কাজের জন্যে একে মনে না রেখে উপায় নেই। কথিত আছে হুগো সিনেমায় রেলস্টেশনে প্রথম যে দীর্ঘ শটটা, শুধু ওেই শটটা তৈরী করতেই ১০০ টা কম্পিউটারের প্রায় ১ বছর লেগেছিলো। কষ্ট অনুযায়ী প্রত্যাশাও ছিলো তেমন। কিন্তু দিনশেষে ‘ভাবলাম কি আর হলো কি’! হুগোর সাথে প্রতিযোগীতায় ছিলো ডিজনীর ফ্যামিলি ড্রামা ‘দ্য মাপেটস’ এবং বিখ্যাত টোয়ালাইট সিরিজের ‘টোয়ালাইট: ব্রেকিং ডন পার্ট ১’। এদের সামনে যেন উড়ে গেল হুগো। ১৭০ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের বিপরীতে আমেরিকা থেকে আয় কেবল ৭৪ মিলিয়ন ডলার। অস্কারে তাই ১১টি বিভাগে মনোনয়ন কেবল স্বান্তনাই হয়ে রইলো।

২. দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশান (১৯৯৪)

দ্য লায়ন কিং, পাল্প ফিকশন, ফরেস্ট গাম্প, লিয়ন: দ্য প্রফেশনালসহ এত্তোসব হিট এবং মাস্টারপিস ১৯৯৪ সালে মুক্তি পেয়েছিলো যে আরেকটা অসাধারণ ফিল্ম যে কখন ফাঁক গলে চলে গেল, তখন খেয়াল করেনি তেমন কেউই। এর বাজেট ছিলো খুবই অল্প, মাত্র ২৫ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু মুক্তির ১০ সপ্তাহ পরেও এর আয় ছিলো কেবল ১৬ মিলিয়ন ডলার! কিন্তু না! শশাঙ্ক রেডেম্পশানের যা পাওয়া দরকার ছিলো, তা সে ঠিকই পেয়েছিলো। পরের বছর যখন ওয়ার্নার ব্রাদার্স ক্যাসেটে রিলিজ দিলো, দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তে লাগলো এই সিনেমা। ১৯৯৭ সালে টিভিতে সম্প্রচারের পর তো এর জনপ্রিয়তা একদম তুঙ্গে উঠে গেলো। ‘আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট’ কর্তৃক প্রকাশিত গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে এর নামতো রয়েছেই, পাশাপাশি বিখ্যাত সিনেমাবিষয়ক ওয়েবসাইট আইএমডিবির ১ নম্বর চলচ্চিত্র হিসেবেও অবস্থান করছে এই মাস্টারপিস। এত সব সফলতার মধ্যে নামের পাশে ‘বক্স অফিস ফ্লপ’  ট্যাগ। মুচকি কার হাসা উচিত? দ্য শশাঙ্ক রেডেম্পশানের নাকি বক্স অফিসের?

১. ফাইট ক্লাব (১৯৯৯)

জ্বি, ভুল কিছু দেখছেন না। ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত, ব্র্যাট পিট এবং এডওয়ার্ড নরটন অভিনীত মডার্ন ক্লাসিক ‘ফাইট ক্লাব’এর কথাই বলা হচ্ছে। মূল টুয়েনটিনথ সেঞ্চুরি ফক্স এর ভুল মার্কেটিং পলিসির কারণেই মুক্তির আগে থেকেই সমালোচনার শিকার হচ্ছিলো এই ফিল্ম যা পরবর্তীতে মুক্তির পর ‘পজিটিভ’ রিভিউগুলোও ভরাডুবি থেকে বাঁচাতে পারেনি এই ফিল্মকে। বিখ্যাত আমেরিকান টিভি ব্যক্তিত্ব রোজি ও’ডোনেল তার অনুষ্ঠানে ফাইট ক্লাবকে অনেক বেশী সমালোচনা করেছিলেন এবং এক পর্যায়ে ফিল্মের শেষের ‘টুইস্ট’টাই তিনি প্রকাশ করে দেন। এই বিষয়ে ব্র্যাট পিট এতটাই ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি ফাইট ক্লাবের ডিভিডি কমেন্ট্রি ট্র্যাকে বলেছিলেন, “ঠিক আছে, তিনি এটা পছন্দ না-ই করতে পারেন, এটা তার ব্যাপার তিনি কি দেখবেন আর কি দেখবেন না। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে তখনই, যখন তিনি ফিল্মটার শেষটাই একটা জাতীয় টেলিভিশনে প্রকাশ করে দেন। এটা পুরোপুরি ক্ষমার অযোগ্য”

৬৩ মিলিয়ন বাজেটের বিপরীতে আয় ছিলো মাত্র ৩৭ মিলিয়ন। যদিও অংকটা পরবর্তীতে ডিভিডি বিক্রী করে ১০০ মিলিয়ন পৌঁছেছিলো, কিন্তু যেখানে ব্র্যাড পিটের মতো তারকা ছিলো, সময় বিবেচনা করলে ১০০ মিলিয়ন ছাড়ালেও এটা ফ্লপের ঘরেই পড়বে।

Photo Credit : Disney