জন্মদিন স্পেশাল: ড্যনিয়েল ডে লুইসের সেরা পাঁচ

গত ৪ দশকেরও বেশী সময় ধরে হলিউডে দোর্দন্ড প্রতাপ ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। নামের পাশে তিনটি অস্কার, দু’টি গোল্ডেন গ্লোব, চারটি বাফটা এওয়ার্ড! কিন্তু তার অভিনীত চলচ্চিত্র কেবল ২১টি। ইতোমধ্যে সবাই বুঝেই গিয়েছেন যে ড্যানিয়েল ডে লুইসের কথাই বলা হচ্ছে। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অতিমাত্রার সংবেদনশীল এই অভিনয়শিল্পী ২০১৭ সালের জুন মাসে তাঁর সমৃদ্ধ অভিনয় জীবনের অবসর ঘোষণা করেন। আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিনে তাঁর অভিনীত শ্রেষ্ঠ ৫টি চরিত্র নিয়ে কথা বলবো।

৫. বিল দ্যা বুচার (Gangs of New York)

মধ্য উনবিংশ শতাব্দীর নিউ ইয়র্ক। শহরে গড়ে উঠছে নামে বেনামে বিভিন্ন গ্যাং। গ্যাংয়ে গ্যাংয়ে যুদ্ধ করে যারা টিকে থাকতে পারে, তারাই ফল লাভ করে। এমনই এক গ্যাং ‘বাওয়ারী বয়েস’এর প্রধান উইলিয়াম কাটিং ওরফে বিল দ্য বুচার। সর্বদা আগ্রাসী, ক্ষ্যাপাটে, নৃশংস বিলকে পর্দায় এত অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ডে লুইস যে তা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওকওে ছাড়িয়ে গিয়েছে বহুগুণে। কথিত আছে এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে তিনি ৬ মাস প্রায় কারো সাথেই কথা বলেননি, প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং পুরো শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে তিনি চরিত্রে এতটাই ঢুকে ছিলেন যে বিল দ্যা বুচারের ভারী ড্রেস, কস্টিউম পড়ে থাকতেন। এমনকি তার শ্যুটিং না থাকলেও তিনি চরিত্রের ভেতরেই থাকতেন এবং ওভাবেই কথা বলতেন। বিল দ্য বুচারে তার অসাধারণ অভিনয় তাকে তৃতীয়বারের মতো অস্কার মনোনয়ন এবং দ্বিতীয়বারের মতো বাফটায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরষ্কার এনে দেয়।

৪. রেনোল্ডস উডকক (Phantom Thread)

রেনোল্ডস উডকক, একজন বিখ্যাত দর্জি। দর্জি বলতে ব্যাপারটা যতটা ছোট বোঝায়, ইনি তার চেয়ে আরেকটু বেশী। তিনি বিখ্যাত ব্যক্তিদের পোষাক ডিজাইন করেন, এবং তা বানিয়ে দেন। স্বভাবত ভীষণ রকমের খুঁতখুঁতে উডকক এই খুতখুতে ব্যাপারটাকে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। কেউ তার সাথে ব্রেকফাস্টে বোসে টোস্টে জোরে কামড় বসাবে তো হয়েছে, এমন দৃষ্টিতে তাকাবেন যেন পারলে এখুনই আগুনে ভষ্ম করে ফেলেন। এত ‘পারফেকশনিস্ট’ একটা মানুষের জীবনে আচমকাই একজন মেয়ে আসে, একজন প্রেমিকা, সম্পূর্ণ তার আচার আচরণের বিপরীতের একজন। এই চরিত্রে প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৪০-১৯৫০ সালের ফ্যাশন শো দেখেছেন, বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারদের সাথে নিয়মিত কথা বলেছেন, এমনকি কিভাবে কাপড় সেলাই করতে হয়, তা-ও শিখে নিয়েছিলেন। ‘ফ্যান্টম থ্রেড’ ডে লুইস অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। যদিও এই চরিত্রটি তাকে তেমন বড় কোন পুরষ্কার এনে দিতে পারেনি কিন্তু এই চরিত্রের সাবলীল বাচনভঙ্গি (যেখানে তিনি মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নিজের স্টাইলে ইংরেজী বলেছেন) এই চরিত্রকে দর্শকদের মনে আলাদা এক স্থান দিয়েছে।

৩. আব্রাহাম লিঙ্কন (Lincoln)

‘মেথড এক্টিং’এর জন্যে বিশেষভাবে বিখ্যাত ড্যনিয়েল ডে লুইস এই আব্রাহাম লিঙ্কন চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে যে ধরণের ‘ডেডিকেশন’ দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনবদ্য। আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ সময়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। একের পর এক দুর্দান্ত সব কাজ উপহার দিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার শাসন এবং সাথে তার জীবনের অবসান হয় বিয়োগান্তক ঘটনার মাধ্যমে। আব্রাহাম লিংকনের বায়োগ্রাফি নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্যে ১০ বছর ধরে গবেষণার পর স্টিভেন স্পিলবার্গ ঠিক করেন এই চরিত্র যদি কেউ ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে পারেন তবে তা একমাত্র ড্যনিয়েল ডে লুইসই পারবে। তিনি ড্যনিয়েল ডে লুইসকে অফার করেন এবং বলেন যদি তিনি অভিনয় করতে রাজি হন, তাহলেই এই ফিল্ম হবে,যিদি তিনি অভিনয়ে রাজি না হন, তাহলে এই চলচ্চিত্র এখানেই বন্ধ হয়ে যাবে। ড্যনিয়েল ডে লুইস অভিনয় করেন এবং এতটাই অসাধারণ করেন, এই এক চরিত্র তাকে অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা, স্ক্রিন এক্টর গিল্ড এওয়ার্ড এনে দেয়।

২. ড্যানিয়েল প্লেইনভিউ (There Will Be Blood)

ডেনিয়েল প্লেইনভিউর ক্রমবর্ধমান উন্মত্ততা এবং নিষ্ঠুরতাকে জীবন দেওয়ার জন্যে ড্যনিয়েল ডে লুইসের উপরে আর কেউ হতো না। ডে লুইস যখন নির্মম কোন চরিত্রে অভিনয় করেন, এর চেয়ে সেরা মনে হয় আর কিছুই হতে পারে না। ড্যানিয়েল প্লেইনভিউ চরিত্রটা পুরোপুরি একদম এমনই, বিশেষত শেষ দৃশ্যটা! রাগ, জেদের সাথে হিংস্রতা এবং বর্বরতার মিশেলে তার অদ্ভুত সব ভঙ্গি সম্বলিত দৃশ্যটা ভোলা যাবে না কখনোই। আর এর সাথে দ্বিতীয়বারের মতো অস্কার ঘরে তোলেন ড্যনিয়েল ডে লুইস।

১. ক্রিস্টি ব্রাউন (My Left Foot)

ডে লুইস তার জীবনের প্রথম অস্কার মনোনয়ন এবং প্রাপ্তি ঘটে এই চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই। আইরিশ শিল্পী ক্রিস্টি ব্রাউনের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাই লেফট ফুট’ ছিলো পরিচালক জিম শেরিডেনের প্রথম চলচ্চিত্র। আইরিশ শিল্পী ক্রিস্টি ব্রাউন জন্মগতভাবেই মস্তিষ্কে পক্ষাঘাত জনিত সমস্য নিয়ে বেড়ে উঠেন এবং হুইলচেয়ারে বসে কাটানো এই শিল্পী শুধু তার বাম পা-টাই নাড়াতে পারতেন। ডে লুইস পুরো শ্যুটিং চলাকালীন সময়টা হুইলচেয়ারে বসেই কাটাতেন এবং এমনকি তিনি ক্রিস্টি ব্রাউনের মতো নিজ হাতে খেতেন না, আরেকজন খাইয়ে দিতে হতো। ক্রিস্টি ব্রাউন চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। My Left Foot ড্যানিয়েল ডে লুইসের সেরা অভিনয় পারফরফেন্স তো বটেই, চলচ্চিত্র ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা পারফরমেন্স বলে ধরা হয় একে।

Photo Credit: 20 Century Fox