স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের আদর্শ- তৌকির আহমেদ

“যা আমাদের ভাবায়, যন্ত্রণা দেয়, সে বিষয়গুলোই আমাদের কাজে উঠে আসে। আমাদের সিনেমা আমাদের জীবন নিয়েই হতে হবে, আমাদের গল্প নিয়েই হতে হবে।” এই উক্তির মধ্যেই তৌকির আহমেদের গভীর জীবনবোধ এবং তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনা উঠে আসে। ঝা চকচকে কিছু নয়, অতো রঙিন কিছু দিয়ে সাজানোও নয়, তৌকির আহমেদের চলচ্চিত্র মানেই কিছু প্রান্তিক জীবন, তাদের হাসি-কান্না-কষ্টের মাঝে একটা বোধের প্রকাশ। তৌকির আহমেদ মানেই চোখের প্রশান্তি, মনের তৃপ্তি। “We Measure genius by quality, not quantity”- আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী ওয়েন্ডেল ফিলিপসের এই কথাটা তৌকির আহমেদের ক্ষেত্রে পুরোপুরিই খাটে। মোটে সিনেমা করেছেন ৫টি, কিন্তু এরই মধ্যে বাংলা চলচ্চিত্রের হল অব ফেমে (কল্পিত) নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের আদর্শ তিনি।

MV5BNGExNjFhYzgtMjJjMC00ZDM1LWE1OTAtY2ZlZmMzMTdiN2NhXkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_SY1000_CR0,0,677,1000_AL_তৌকির আহমেদের জন্ম ১৯৬৫ সালের ৫ মার্চ। ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী তৌকির ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক-এর গন্ডি পার করেন। তারপর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্য বিষয়ে স্নাতক অর্জন করেন। পড়াশোনার বিষয়বস্তু ‘স্থাপত্য’ হলেও ছোটবেলা থেকেই মঞ্চ বেশ টানতো তাঁকে। ১৯৮৯ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব থিয়েটার অব নেশন-এ অভিনয়ের উপর থেকে মঞ্চে আইটিআই ট্রেইনিং সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল কোর্ট থিয়েটার থেকে মঞ্চ নাটক পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেন।

তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে মঞ্চে তুমুল অভিনয় করে যান তৌকির আহমেদ। পাশাপাশি অভিনয় করতে থাকেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হারজিত, হাসুলি, নিজামউদ্দিনের বিত্ত ভাবনা, দিক বিদিক, দোলা প্রভৃতি বিখ্যাত নাটকে অভিনয় করেন। নব্বইয়ের দশকে টিভির পরিচিত এবং প্রিয়মুখ তৌকির আহমেদ। পাশাপাশি নাটক পরিচালনাও শুরু করেন। তৌকির আহমেদ পরিচালিত প্রথম নাটক ‘তোমার বসন্ত দিনে’।

২০০০ সালের কিছু সময় পর থেকে তিনি অভিনয় কিছুটা কমিয়ে দিয়ে চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করেন। ইতোমধ্যে তিনি ‘নদীর নামটি মধুমতি’, ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ ও ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেছিলেন যা বিপুল দর্শক জনপ্রিয়তা পায়। ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমী থেকে চলচ্চিত্রে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। জীবনের বড় একটা মোড়ের জন্যে নিজে প্রস্তুত হয়ে নিচ্ছিলেন আরকি। তৌকির আহমেদের চলচ্চিত্র পরিচালনায় অভিষেক ঘটে ২০০৪ সালে ‘জয়যাত্রা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আমজাদ হোসেনের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন বিপাশা হায়াত, আজিজুল হাকিম, তারিক আনাম খান, হূমায়ুন ফরীদি, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়সহ নামী দামী সব তারকারা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একটি নৌকায় পাড়ি জমানো কিছু মানুষের গল্প নিয়ে নির্মিত করে চলচ্চিত্রটির জন্যে ২০০৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, শ্রেষ্ঠ প্রযোজক ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারও লাভ করেন। প্রথম চলচ্চিত্রেই এত কিছু! আর কি চাই!

প্রথম চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘রূপকথার গল্প’। ছোট একটি বাচ্চার হারিয়ে যাওয়া এবং সাধারণ কিছু মানুষের জীবনযাত্রার গল্প নিয়ে নির্মিত হয় এই চলচ্চিত্র। চঞ্চল চৌধুরী, তুষার খান, ঝুনা চৌধুরী, হূমায়ুন ফরীদি ছাড়াও তৌকির আহমেদ নিজেও অভিনয় করেন এই চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি দ্বিতীয়বারের মতো মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেন এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ২০০৭ সালে হূমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’। এই চলচ্চিত্রে তৌকির আহমেদ নিজেকে কিছুটা ভাঙবার চেষ্টা করেন। কিছুটা বাণিজ্যিক ঘরানায় তৈরী চলচ্চিত্রটিতে রিয়াজ, মোশাররফ করিম, মম, আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত অভিনয় করেন এবং চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত হয়েছে ভার্সিটি পড়ুয়া কিছু তরুণ-তরুণীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ও এ নিয়ে টানাপোড়েনকে ঘিরে। এ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্যে আবুল হায়াত শ্রেষ্ঠ সহ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন পাশাপাশি চলচ্চিত্রটি বালি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দর্শক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

Touqir Ahmed Posterএকটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে, তৌকির আহমেদের সব চলচ্চিত্রেই তিনি মঞ্চে বা টিভিতে শক্তিশালী সব অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করে থাকেন। এর কারণ যে তাঁর দীর্ঘদিনের মঞ্চ ও টিভিতে কাজ করায় তাঁদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফসল, তা জানাতে তিনি কার্পণ্য বোধ করেন না। আর পরীক্ষিত অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করলে যে কাজ অর্ধেক সম্পন্ন হয়ে যায়, তা তিনি প্রায়ই বলে থাকেন।

‘রূপকথার গল্প’ পর্যন্ত তৌকির আহমেদ দু’হাত ভরে সফলতা আর সফলতাই বয়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু এরপর যে কি হলো, কোনকিছুই ঠিকঠাক হচ্ছিলো না। ‘ফাগুন হাওয়া’ নামে একটি চলচ্চিত্রের কথা ভাবছিলেন যা নির্মিত হবে ’৫২র ভাষা আন্দোলনের উপর কিন্তু এর জন্যে তিনি প্রযোজক খুঁজতে থাকেন দীর্ঘদিন ধরে কিন্তু প্রযোজক কিংবা সরকারী অনুদান কোনোটাই মেলে না। এর মধ্যে অবশ্য কিছু টেলিভিশন নাটক পরিচালনা করেন।

অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর ২০১৬ সালে, তার নিজের রচিত উপন্যাস ‘অজ্ঞাতনামা’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনাম’। খুবই অল্প বাজেটে, ক্যানন ৫ডি মার্ক থ্রি ক্যামেরায় নির্মিত হলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুঃখ-দুর্দশা এবং অধিকারের গল্প দর্শকদের ছুঁয়ে যায়। ফজলুর রহমান বাবু, শহিদুজ্জামান সেলিম, মোশাররফ করিম, নিপূন অভিনীত ছবিটি ব্যবসা সফল না হলেও দর্শকের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে এই চলচ্চিত্র। আর এটাই তৌকির আহমেদের চাওয়া। তিনি মনে করেন চলচ্চিত্র ব্যবসা সফল হবে কি হবে না, এটা তার হাতে নয়, কিন্তু দর্শক এটা পছন্দ করে কিনা, এটাই তাঁর কাছে বিবেচ্য বিষয়। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬তে অজ্ঞাতনামা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।

Tauqir Ahmed Shootঅজ্ঞাতনামার পরের বছরই তিনি নিয়ে আসেন ‘হালদা’। নদী ও নারীকে এক করে, এর প্রতি অবহেলাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই চলচ্চিত্র। না, এই সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ ছিলো না। নুসরাত ইমরোজ তিশা, মোশাররফ করিম, জাহিদ হাসান অভিনীত ‘হালদা’ দেশব্যাপী ৮০টি হলে একসাথে মুক্তি পায়। আর এখানেই তৌকির আহমেদের সফলতা। তৌকির আহমেদ মনে করেন, দর্শক কি পছন্দ করে, সে জিনিস না বানিয়ে দর্শকের রুচি পরিবর্তন করাটাই হবে সচেতন চলচ্চিত্রকারের কাজ আর সে কাজটাই তিনি কি সুনিপুণভাবেই না করেছেন! এখন স্বাধীন চলচ্চিত্রকারদের ‘জনপ্রিয়তা নেই’ বলে দূরে ঠেলে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যেতো, সেটাও অনেকটা কমে এসেছে এবং কথিত বাণিজ্যিক ধারা এবং ‘বিকল্পধারা’র ব্যবধানও কমে এসেছে।

এখন তৌকির আহমেদের সুসময়। তাঁর আটকে যাওয়া সেই চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’ আলোর মুখ দেখছে। তরুণ অভিনেতা সিয়াম ও নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত এই চলচ্চিত্রের শ্যুটিংও প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। এর ভবিষ্যৎ কি হবে তা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে তৌকির আহমেদের যে অবদান, তার জন্যে একটা টুপিখোলা অভিবাদন তো তাঁর প্রাপ্য।

লেখা: আশরাফ আবির

ছবি: ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, সংগ্রহ