ভালোবাসার সিনেতারুণ্য

জীবনের নানা ঘটনা রঙ মেখে সেলুলয়েডের রঙিন ফিতায় চলমান প্রক্রিয়াগত প্রবাহিত আলোর খেলার নামে আবেগ উৎসারিত জীবনের গল্পে তারুণ্য সংশ্লিষ্টতা থাকবেনা, তা কি হয়? আসলেই হয়না। সিনেমার সাথে তারুণ্য। তাই সিনেতারুণ্য। ‘সিনেমা’ মাত্র তিনটি অক্ষর। এই তিন অক্ষরের শব্দে লুকিয়ে থাকে অনেক মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা, শ্রম আর অর্থ। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের দেশে সিনেমা বানানো এখনো স্বপ্নের মতো, কেননা সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট আছে প্রচুর অর্থব্যয় আর পরিশ্রমের গল্প। এত স্বল্পতা ও অপ্রাচুর্যতা জেনেও একদল তরুণ-তরুণী তাদের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে এসে গড়ে তোলে ‘সিনেতারুণ্য’।

IMG_0091সিনেতারুণ্যের প্রতিষ্ঠা হয় ২০১৫ সালের মে মাসের ৩০ তারিখে। নাসের আহাম্মেদহাসান শান্তের আহ্বানে সাড়া দিয়ে  চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত বেশকিছু চলচ্চিত্রপ্রেমী নগরীর সিআরবিতে এক মিটিং এর মাধ্যমে একত্রিত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে গঠন করে সিনেতারুণ্য। তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজেদের মেধা-মনন ও যোগ্যতা দিয়ে নিজেদের দর্শন, চিন্তা-ভাবনাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার প্রত্যয়ে গঠিত হয় সিনেতারুণ্য। চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যে কয়টি টিম সুপরিচিত তার মধ্যে সিনেতারুণ্য অন্যতম। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ গ্রুপটি বর্তমানে তাদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে দেশে-বিদেশে বেশ কিছু ফেস্টিভ্যালে স্থান করে নেয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে সক্ষম হয়েছে।

সিনেতারুণ্যের ফিল্মমেকিং এ পথচলা শুরু হয় জাহিদ আলমের রচনা ও পরিচালনায় ‘বাঁধন’ নামক একটি শর্টফিল্মে কাজের মাধ্যমে। যদিও কাজটি পরবর্তীতে সম্পূর্ণ করা হয়নি বা রিলিজ দেয়া হয়নি তবুও ‘বাঁধন’ই ছিলো সিনেতারুণ্যের পথচলার প্রথম ধাপ। তারপর সিনেতারুণ্যের ব্যানারে হাসান শান্তের পরিচালনায় তৈরী হয় ‘মানিব্যাক’। নিজেদের এযাবৎকালের সবগুলো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে গল্প, নির্মাণশৈলী এবং দেশ বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাদৃত হওয়ার দিক বিবেচনা করলে সিনেতারুণ্যের সবচেয়ে সফল এবং শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘খুন্নাস’। নাসের আহাম্মেদের পরিচালনায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রে সমাজের তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি বৈষম্যের দিকটি বেশ পরিস্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তনয় রাশেদের পরিচালনায় নির্মিত ‘অভিদের প্রেম’ও বেশ সাড়া ফেলেছিলো দর্শকদের মাঝে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের নানা দিক নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি রচনা করেন পরিচালক নিজেই। অদ্ভুত বিরহে কাতর এক যুবকের জীবনের খন্ডাংশ নিয়ে তাহা খানম’র পরিচালনায় কিছুটা কাব্যিক ভাবধারায় নির্মিত হয় ‘এক কাপ লবণ চা’।  ২০১৬ সালে ‘We Art Water’ নামে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে লক্ষ্য করে সিনেতারুণ্য নির্মাণ করে তিনটি চলচ্চিত্র, যার একটি ডকুমেন্টারি, বাকি দুটি ফিকশন। কর্ণফুলী নদীর দূষণকে কেন্দ্র করে নাসের আহাম্মেদের পরিচালনায় নির্মিত হয় ডকুমেন্টারি ‘Water: The Biosoul’ নদীর পাশের বস্তির জীবনযাত্রাতে কিভাবে নদীদূষণ প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে আসরার আসাদের পরিচালনায় নির্মিত হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘Behind the Dream’। কিবরিয়া জিহাদের পরিচালনায় চাক্তাই খালের দূষণে খালের দু’পাশের উচ্চবিত্তদের ভূমিকা ও তাদের প্রতি ওই দূষণের প্রভাব নিয়ে নির্মিত হয় ‘Pollution Cycle’।

_MG_2360সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি সাড়া দিয়ে সমাজ সচেতনতামুলক চলচ্চিত্র ‘বরেশাপ’ নির্মিত হয় আসরার আসাদ এবং হাসান শান্ত’র যৌথ পরিচালনায়। এ ছাড়াও সিনেতারুণ্যের ব্যানারে বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় আছে তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। যার একটি কাজী জিল্লুর রহমান পরিচালিত ‘আদুরি’, একটি নাসের আহমেদ পরিচালিত ‘শুভ্রলতা’ এবং অন্যটি কিবরিয়া জিহাদ পরিচালিত ‘কৃষ্ণকলি’। এ ছাড়াও প্রি-প্রোডাকশন চলছে এম. ডি আরিফের পরিচালনায় ‘Never Give Up’ (অপরাজিতা) নামক একটি চলচ্চিত্রের।

প্রোডাকশন হাউস সিনেতারুণ্যের নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘খুন্নাস’ ২০১৬ সালে চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জিতে নেয় সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার। এছাড়াও চলচ্চিত্রটি ঢাকা, দিল্লি, কানাডা, ডিআইইউ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। কিবরিয়া জিহাদের Pollution Cycle স্পেনের We Art Water Film Festival-এ বিশ্বের প্রায় ২৫০টি ছবির মধ্যে সেরা ৫ এর  শর্টলিস্টে জায়গা করে নেয়। সিনেতারুণ্যের সবগুলো চলচ্চিত্রই এডিটিং করেছেন সিনেতারুণ্যের নিজস্ব এডিটর ইমতিয়াজ আহমেদ। এ ছাড়াও টিমের অন্যতম সদস্য এম ডি নাঈম সিনেতারুণ্যের অনেকগুলো চলচ্চিত্রের সহকারি পরিচালক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

সিনেতারুণ্য সবসময় চেষ্টা করেছে দর্শকদের নতুন কিছু দিতে। তারই ধারাবাহিকতায় অভিনেতা অভিনেত্রীর জায়গায়ও সিনেতারুণ্যের কাজে দর্শকেরা নিয়মিতভাবে দেখে আসছেন নতুন মুখ। খুন্নাস-এ কাজী জিল্লুর রহমানের অনবদ্য অভিনয় ‘খুন্নাস’কে করেছে বাস্তবধর্মী, সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন আলিশা আলিফা। ‘অভিদের প্রেম’ চলচ্চিত্রে তনয় রাশেদের অভিনয় তাকে নতুন করে ‘অভি’ নামে পরিচিত করেছে সবার কাছে, সাথে অহরনার অভিনয়ও ছুঁয়ে গেছে দর্শকদের মন। সাড়াজাগানো এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে হলেও আদনান ফারাবী, রাওনার জাহাঙ্গীর, নাজমুল শাওনের অভিনয়ও ছিলো বেশ সাবলীল। Pollution Cycle-এ অভিনয়ের মাধ্যমে কাবেরি আইচ নিজের অভিনয় জীবনের সূচনা করেছেন। এছাড়াও সিনেতারুণ্যের ‘কৃষ্ণকলি’র মাধ্যমে অভিনয়ের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে মৈত্রী চক্রবর্তী ও সুমনের।

IMG_0628সিনেতারুণ্যের প্রচেষ্টা আছে নতুন শিশু শিল্পীদেরকে দর্শকদের সামনে তুলে নিয়ে আসার। তারই ধারাবাহিকতায় ‘খুন্নাস’ চলচ্চিত্রে আশরাফ; ‘Pollution Cycle’ এ পূর্ণ বিশ্বাস, ‘বরেশাপ’এ জাহিদ, এবং ‘কৃষ্ণকলি’তে অশ্বিন অভিনয় করেন শিশুশিল্পী হিসেবে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রত্যয়ের পাশাপাশি নির্মাতা এই দলের সদস্যদের থেকে অনেক আক্ষেপের গল্পও জানা গেছে। চট্টগ্রামে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চর্চার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলেন টীমের জেষ্ঠ্য সদস্য কাজী জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, “এখানে কাজ করতে গেলে আমাদের প্রথম যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হচ্ছে পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা এবং দ্বিতীয়ত সিনেমা মেকিং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও শিল্পীর স্বল্পতা, যেটা ঢাকায় খুব সহজলভ্য। টীমের আরেকজন জেষ্ঠ্য সদস্য আসরার আসাদ বলেন “সৃজনশীল কাজে বরাবরের মতই নানা প্রতিবন্ধকতায় ভরপুর থাকে। এখানেও অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বারবার সামনে এসেছে নানা আর্থিক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। দেখা গেছে একটা কাজের পর আরেকটা কাজে হাত দিতে অনেক সময় লেগেছে। হতাশায় নুয়ে পড়লেও হাল ছেড়ে দিইনি। নতুন স্বপ্নে আবারো ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এভাবেই একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি”। ঢাকার বাইরে চলচ্চিত্র চর্চা সত্যিই কঠিন। দেশের সিংহভাগ চলচ্চিত্রই ঢাকাকেন্দ্রিক। দর্শকের ভালোবাসা ও পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তরুণ এই দলটি  সামনে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। স্বপ্ন দেখে বাংলা চলচ্চিত্র বদলে দেয়ার যুদ্ধে সহযোদ্ধা হওয়ার।

লেখক: কিবরিয়া জিহাদ, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার