কোকো: মনোমুগ্ধকর রঙীন আবেগঘন এক গীতিকবিতা

১৯৯৫ সালে ‘টয় স্টোরি’ দিয়ে যাত্রা শুরুর পর, পিক্সার আর ওয়াল্ট ডিজনী পিকচার্স মিলে এতসব মাস্টারপিস এনিমেশন ফিল্ম উপহার দিয়েছে যে, এখন যা-ই নিয়ে আসুক না কেন, একটু নড়েচড়ে বসতেই হয়। পিক্সার এনিমেশন স্টুডিও মানেই বিশেষ কিছু। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই ব্যাপারটা ঠিক জমছিলো না। ২০১৫ সালের ‘ইনসাইড আউট’ এর সফলতার পরে কেমন যেন থমকে গিয়েছিলো তারা। ‘দ্য গুড ডায়নোসর’ অতো ভালো কিছু না, ‘ফাইন্ডিং ডোরি’ ও আশা পূরণ করতে পারেনি আর ‘কারস ৩’ তো পিক্সারের সবচেয়ে খারাপ ফিল্ম বলেই মনে করেন অনেকে। তো এই অবস্থায় এমন কিছুর দরকার ছিলো যা শুধু হিট করলেই হতো না, পিক্সারকেও তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে ‘ব্যক ইন ফর্ম’ ঘোষণা করার সুযোগ দিতে হতো। ‘কেকো’ ঠিক এই কাজটাই করে দিলো কি অবলীলায়! ‘কোকো’ কে ব্যাখ্যা করতে গেলে বলতে হয়, মনোমুগ্ধকর রঙীন আবেগঘন এক গীতিকবিকা যা চোখের জন্য দৃষ্টিসুখকর এবং মনের জন্যে মনোরঞ্জক তো বটেই, এ যেন আত্মারও খোরাকী।

MV5BODE1NDk0NDktNzljNC00YjAyLWExZTktMGVlNmU1YmUwNTNiXkEyXkFqcGdeQXVyNDE5MTU2MDE@._V1_মেক্সিকোর ছোট্ট একটি গ্রাম সান্তা সেসিলার সংগীতপ্রেমী একটি ছেলে মিগুয়েল। বাবা-মা, দাদী এবং দাদীরও মা কোকো’কে নিয়ে এমন এক পরিবারে থাকে যেখানে গান জিনিসটা নিষিদ্ধ বলে কম বলা হবে, গানটাকে সরাসরি পাপের পর্যায়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ছোট্ট মিগুয়েল পরিবারের এই বাধা মানতে নারাজ। সেলারে লুকিয়ে, কাঠ দিয়ে গিটার বানিয়ে চলতে থাকে তার সাধনা, স্বপ্ন তার সে একদিন জগৎবিখ্যাত শিল্পী আর্নেস্ত দে লা ক্রুজের মতো হবে। মিগুয়েল যে অঞ্চলে থাকে, সেখানে একটা উৎসব হয় যেখানে ধারণা করা হয় যে মৃত ব্যক্তির ছবি ঝুলিয়ে রাখলে তারা পৃথিবীতে একদিনের জন্যে ঘুরতে আসে, পরিবারকে দেখতে আসে। ঐদিনই মিগুয়েল জানতে পারে, জগৎবিখ্যাত শিল্পী আর্নেস্ত দে লা ক্রুজ তার পরিবারেরই একজন এবং এই পরিবার ফেলে তার নিরুদ্দেশ হওয়ার কারণেই এই পরিবারে সংগীত জিনিসটা এইরকমভাবে নিষিদ্ধ। এরই ঘটনাক্রমে মিগুয়েল ভুল করে মৃতদের দেশে ঢুকে পড়ে যেখানে তার সাথে দেখা হয় ভবঘুরে হেক্টরের সাথে। শুরু হয় মিগুয়েলের পৃথিবীতে ফেরত যাওয়া এবং তার পরিবারের সম্পূর্ণ ইতিহাস উদঘাটনের যাত্রা।

MV5BY2RmYzMwZDctMDUwNC00YmI2LWIwMjItMzdmNzcxYTgzMzRjXkEyXkFqcGdeQXVyMzc1MTQ5MTI@._V1_SX1777_CR0,0,1777,742_AL_সব ল্যাটিন চরিত্র, মেক্সিকান রূপকথা, সংস্কৃতি এসব নিয়েই চলচ্চিত্র কোকো। মেক্সিকোকে এখানে বিশেষভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মৃতদের পৃখিবীতে একদিনের জন্যে ফেরত আসার ‘ডে অফ দ্য ডেথ’ উৎসবটা এখানে দেখানো হয়েছে, তা মেক্সিকান লোকসংস্কৃতিরই অংশ। পূর্বেই বলা হয়েছে, পিক্সার মানেই এনিমেশনের সেরা কাজ। এই ফিল্মেও তা অব্যাহত রেখেছে তারা। বলা যেতে পারে, সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। ছোট্ট গ্রাম সান্তা সেসিলা তো বটেই, মৃতদের শহরেরও গঠন ও ডিটেইলস ছিলো চোখ ধাঁধানো।

MV5BMWJiMTY2MmUtMDM5ZS00OTg0LWI0ZjEtZjc0NzZkMGMxYzZkXkEyXkFqcGdeQXVyMzc1MTQ5MTI@._V1_SX1777_CR0,0,1777,769_AL_এই চলচ্চিত্রের অন্যতম বিষয় হলো এর ‘মিউজিক’। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায় গল্প আর পাল্লা দিয়ে তার মিউজিক। মেক্সিকান লোকসংগীতকে ট্রিবিউট করা হয়েছে এই ফিল্মে। মিউজিকই এই সিনেমার চালিকাশক্তি বললে গল্পটাকে ছোট করা হবে, কিন্তু মিউজিক যেন আবেগের স্রোতে  ভাসতে একপ্রকার বাধ্যই করেবে প্রতিটি দর্শককে। ‘উন কোকো লোকো’ গানটা যেমন নাচাবে আবার ‘রিমেম্বার মি’ গানটা দেখে চোখের পানি আটকে রাখা দায় হয়ে পড়বে। কোকো লোকো গানটা নিয়ে একটা কথা না বললেই নয়। শুরুতে এই গানের কোন প্ল্যানই ছিলো না। কিন্তু এই সিনেমার ডিরেক্টর লি উঙ্করিচ খেয়াল করলেন মিগুয়েল চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়া এন্টনি গঞ্জালেজের গানের গলা বেশ ভালো তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মিগুয়েল গিটার ও গান দুটোই করবে। আর তার পরেই জন্ম এই অসাধারণ সৃষ্টির। ‘রিমেম্বার মি’ নিয়ে আর কিই বা বলা যেতে পারে! শ্রেষ্ঠ ‘অরিজিনাল ট্র্যাক’ হিসেবে তো এবছর অস্কারই পেয়ে গেলো এই গান। অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা সবগুলোতে সেরা এনিমেটেড সিনেমার পুরষ্কার ইতোমধ্যে পকেটে পুরে নিয়েছে কোকো।

MV5BNjUyMWI2NmItNDY2Mi00MTdmLTliYWMtYjkyM2FlOTU4YTY0XkEyXkFqcGdeQXVyNDE5MTU2MDE@._V1_হাস্যরস কিংবা মজার ফাঁকেও কোকো যেভাবে জীবনবোধের ছাপ রেখে যায়, তা সত্যিই অনবদ্য। সর্বোপরি যে জিনিসটা এই চলচ্চিত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, তা হলো পরিবারের মূল্য বোঝানো। এমনভাবে ব্যাপারটা দেখানো হয়েছে, প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে নিজের সাথে মিল খুঁজে পাবেন। ‘পরিবারের চাওয়া বনাম নিজের স্বপ্ন’ এই দ্বন্দ্বে এগিয়েছে কাহিনী। প্রস্তাব থাকবে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে দেখুন সিনেমাটা! দেখার পর একজন আরেকজনের দিকে তাকান। আপনা-আপনিই একে অপরকে জড়িয়ে ধরবেন, পাক্কা।

লেখক: আদিত মোস্তাফিজ, চলচ্চিত্র সমালোচক