ব্যতিক্রমভাবে চিত্রনাট্য পরিবেশনায় নিজস্ব সত্তার একটা ছাপ রাখতে চাই : জয়দীপ মজুমদার

জয়দীপ মজুমদার, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ানিয়ারিং’এর ছাত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়লেও গতানুগতিক কাজের বাইরে কিছু করার আগ্রহ থেকেই চলচ্চিত্র অঙ্গনে আসা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই বন্ধুর সাথে মিলে গড়ে তোলেন ‘মৃত্তিকা ফিল্ম প্রোডাকশন’ যা থেকে পরবর্তীতে মা, নারীকণ্ঠ, অতঃপর অমিত সহ আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও মিউজক ভিডিও। গতানুগতিক জীবন যেমন চাননি, তেমনি চলচ্চিত্রেও গতানুগতিক ধারার বাইরে ব্যতিক্রমভাবে চিত্রনাট্য পরিবেশন করতে পছন্দ করেন তিনি। তরুণ চলচ্চিত্রকার জয়দীপ মজুমদার কথা বলেছেন এবারের আত্মকথনে। সাথে ছিলেন আশরাফ আবির।

আমার কাছে চলচ্চিত্র শব্দটি অনেক মাহাত্ম্যপূর্ণ। সাধারণভাবেই জানা, চলমান চিত্র মানেই চলচ্চিত্র,  কিন্তু আমার কাছে চলচ্চিত্রের মানে ’আমার চলচ্চিত্র, আমার স্বপ্ন রাজ্য’। যেখানে আমি একজন ক্রিয়েটর, নিজের মতই সাজাচ্ছি পরিবেশ, চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ, এই এক আলাদা ভালবাসার জগত, শত পরিশ্রমের পর দিনশেষে প্রাপ্তি এক অনাবিল প্রশান্তি। অনেকে হয়তো চলচ্চিত্রকে পাঁচমিশালি শিল্প বলে, আবার কেউ শিল্প বলতে নারাজ।একটা জিনিস মনে না রাখলেই নয়- আগে শিল্পী, তারপর শিল্প। যদি শিল্পীই না থাকে তবে বাকি হাজার শিল্পের উপকরণ থাকলেও ওই শিল্প ব্যর্থ। তবে আমার মতে শিল্প না বলে শক্তি বলাই উত্তম। লেখকের হাতে যেমন কথা তেমনি চলচিত্রকারের হাতে ছবি ও শব্দ। এই দুইয়ের মিলিত যে শক্তি তা প্রয়োগে যদি একজন চলচিত্রকারের অভাব দেখা দেয় তবে সফল কিছু আশা করা অসম্ভব। তাছাড়া সমাজে অনেক বিষয় আছে যা মানুষ বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না। বোঝে বা না বোঝে অনেক অনৈতিকতা করেই চলেছে সেই ক্ষেত্রে এই চলচ্চিত্র অন্যতম এক শক্তি।

560চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রাটা আমার কাছে আচমকা বাতাসের মতই। ছোটবেলা থেকেই ছিল গতানুগতিক চিন্তাধারা, হয় ডাক্তার নয় ইঞ্জিনিয়ার। এতকিছু চিন্তা ভাবনা তখনো আসেনি, বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখা। তবে স্কুলজীবনের শেষেরদিকে সেন্ট প্লাসিডস স্কুলে এক মঞ্চনাটকে ছোট্ট এক চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম, রিহার্সালের সময়গুলো অনেক মজার ছিল। কলেজে পড়াকালীন সময়ে খুব ভাল একটি বন্ধুমহল ছিল, তখন হঠাৎ শখ করেই বন্ধুদের একসাথে থাকা কিছু ছবি দিয়ে গানের তালে স্লাইড শো বানিয়ে কিছু ফুটেজ তৈরি করতাম, ফুটেজগুলো বন্ধুদের কাছে অনেক প্রশংসিত হয়েছিল,  তখন অবশ্য চলচ্চিত্র বিষয়টা থেকে অনেক দূরে ছিলাম, বলতে গেলে মাথায় এই ব্যাপারে কোন কথাই আসত না। আগে মুভির জেনার একটা গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখন হয়ত বাংলা সিনেমার এক ধরনের একঘেয়েমি যুগ চলছিল, যদিও এসব দেখা টেলিভিশনেই সীমাবদ্ধ ছিল। আস্তে আস্তে যখন জেনারের গন্ডি বদলাতে লাগল, দেখা হতে লাগল নানান ধরনের নানান ভাষার মুভি তখন বুঝতে পারলাম চলচ্চিত্র নিছক কোন বিনোদন ক্ষেত্র নয়, এর রয়েছে আলাদা এক জগত,আলাদা এক শক্তি। কলেজ গন্ডি পরিয়ে গতানুগতিক জীবনের লক্ষ্য এর তাড়নায় শুরু হল একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার যাত্রা, কিন্তু তখনো বুঝতে পারি নি মনের মধ্যে এক স্বপ্ন ঘুমিয়ে ছিল। ১ম বর্ষের শুরুতে আমার এক কাছের বন্ধুর শখ হল কাউকে দিয়ে তার এক গল্প নিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম বানাবে, আমি তখন বলে উঠলাম আমরা নিজেরা বানালে কেমন হয়, ঠিক তখনই ‘মৃত্তিকা ফিল্ম প্রোডাকশন’ নামের মাধ্যমে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। সত্যি কথা বলতে তখন আমাদের না ছিল কোন স্বল্পমূল্যের ক্যামেরা বা কোনমতে চালানো যায় এমন কিছু, না ছিল কোন অর্থ, না ছিল এই বিষয়ে শিক্ষা। আসলে আমার জানাই ছিল না একটা ফিল্ম কিভাবে বানানো হয়, এডিটিং তো অনেক দূরের কথা। কোন রকমে আরো কিছু বন্ধু মিলে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করলাম আমাদের প্রথম শর্টফিল্ম ‘পার্থক্য’। মজার বিষয় হচ্ছে আমি এই ফিল্মের একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছি অর্থাৎ বলা যায় আমার যাত্রা শুরু হয় একজন অভিনেতা হিসেবে। ভাগ্যিস কোন সংলাপ ছিল না, তাই হয়ত অভিনেতা বনে যাওয়া ভারী তকমাটা ০.০১ ভাগ হলেও সার্থক হয়েছিল। যাই হোক, এই শর্ট ফিল্মটি আমাকে সাহায্য করেছিল চলচ্চিত্রের সুন্দর জগতটির সাথে পরিচিত হতে, পরিচিত হলাম বিভিন্ন শাখার সাথে। আসলে বই পড়ে বা তথ্য ঘেটে জানা এবং হাতে-কলমে জানার মধ্যে বিশাল এক ঘাটতি থেকে যায়। যদিও সব হঠাৎ করেই কোন কিছু চিন্তা না করেই শুরু হয়েছিল, তবে আমি বলব এটাই আমার দরকার ছিল। ঠিক তখন এবং তার পরপরই পরবর্তী  কাজ U-Turn এর মাধ্যমে আমার হাতে-কলমে যাত্রা শুরু হয় একজন পরিচালক, একজন এডিটর হিসেবে। তারপর মৃত্তিকার ব্যানার থেকে বানাই ‘অতঃপর অমিত’, ‘নারীকন্ঠ’,  ‘দেখ’, ‘মা’সহ আরো কিছু ছোট-খাট এড-ইন্ট্রো ও মিউজিক ভিডিও। সম্প্রতি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি হতে বানিয়েছি ‘একটি ছায়া গল্প’। চলচ্চিত্রটির আলাদা এক বিশেষত্ব রয়েছে, চেষ্টা করেছি সাধারণ গল্পই একটু ব্যতিক্রম করে পরিবেশন করতে। আপাতত ‘একটি ছায়া গল্প’ সর্বসাধারণের জন্য মুক্তি দেয়া হয়নি, তবে অতিশীঘ্রই সবাই দেখতে পারবে প্রযুক্তির মারফত। আমার একটা হয়ত বদভ্যাস আছে, ব্যতিক্রম করে চিত্রনাট্য পরিবেশনার নিজস্ব সত্তার একটা ছাপ রাখতে চাই। ‘মা’ চলচ্চিত্র ঠিক তেমনটাই, সকল দৃশ্য প্রদর্শিত হয়েছে একটি মাত্র ফ্রেমে।

DSC_2912 01কেউ হয়ত দর্শকের জন্য বানায়, কেউ অর্থ-যশের জন্য আবার কেউ নিজের জন্য তবে আমি বানাই আমার আর দর্শকের জন্য। চলচ্চিত্র বানানোর এই রাজ্যে ‘I Am Graduate’ নামে কোন বাক্য নেই, সে যত বড় মুনশিই হোক না কেন। সেকাল এবং একালের অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে প্রযুক্তি। আমি ঠেকে ঠেকে নিজে থেকে শিখেছি, এখনো শিখছি এবং দিনকে দিন শিখেই যাচ্ছি তাই হয়তোবা চলচ্চিত্র বানানোর গতিটা মন্থর। চলচিত্রের নিত্য-নতুন শিক্ষা আর এই শিক্ষার কোন শেষ নেই কারণ সৃজনশীলতার কোন সীমানা নেই। এই যে লং শট, মিড শট, ক্লাজআপ শট এসবগুলা বেসিক ব্যাকরণ, চাইলেই এসব মাথায় রেখে  নিজের মত নতুন শট আবিষ্কার করা যায় তবে তা হতে হবে জ্যামিতিকভাবে দৃষ্টিনন্দন। আমার কাছে চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ চার খন্ডে বিভক্ত, ১) চিত্রনাট্য রচনা  ২)পরিবেশ বাছাই / পরিবেশ তৈরি করে চরিত্রানুযায়ী শিল্পী দিয়ে শুটিং করা, ৩)চিত্রনাট্য গুছিয়ে সাজানো-এডিটিং ৪)শব্দের সঠিক ব্যবহার। এই চারখন্ডের মধ্যে আমার একটু বেশি পছন্দের জায়গা ১ম খন্ড- চিত্রনাট্য রচনা করা-যা আমি নিজের মতই করি, আমার মতে চিত্রনাট্য একটি চলচ্চিত্রের প্রধান কাঠামো।

14435336_1425881507427073_6032058109475394783_oআমার ভালবাসার জায়গা বরাবরই  ‘মৃত্তিকা ফিল্ম প্রোডাকশন’। এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা, আসলে প্রোডাকশন বলব না, এটি একটি সুখী পরিবার। এছাড়াও সাথে আছে কিছু অনুজ, তাদের সাথে শেয়ার করছি আমার অভিজ্ঞতা, মৃত্তিকা-কে সুপ্রতিষ্ঠিত করাই অন্যতম লক্ষ্য। আমার কাছে পূর্ণদৈর্ঘ্য / স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে কোন ভেদাভেদ নেই, সবই তো চলচ্চিত্র। আমার ইচ্ছা- আমি এখনো চলচ্চিত্র বানাতে চাই, আগামীতেও চলচ্চিত্রই বানাতে চাই। আমার চলচ্চিত্র একদিন দর্শকদের জীবনে দাগ কেটে বিরাজমান থাকবে আমার জীবনাবসানের পরেও। মাথার ভিতর বেড়ে উঠা ‘চলচ্চিত্র পোকা’টি যেন সময়ের সাথে বিশালাকার হয়ে আঁকড়ে ধরে পুরো পৃথিবীটাকে- এটাই একমাত্র স্বপ্ন।

DSC_2আমার মত মধ্যবিত্ত ছেলে-মেয়েদের জন্য এই জগতটা তেমন সুখকর নয়, অনেক কষ্ট-অর্থ-ত্যাগ-ধৈর্য-ঘামভেজা পরিশ্রমের জায়গা, তবে এইসবের মাঝে লুকিয়ে আছে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। এই পথে আমার অনুপ্রেরণার শীর্ষে গুরু সত্যজিৎ রায় আর আদর্শের শীর্ষে আমার স্বর্গীয় দাদু চিত্ত রঞ্জন মজুমদার এবং আমার মা-বাবা। ধন্যবাদ জানাই আমার পরিবার এবং কাছের মানুষদের।

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s