বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা: ঘরের কাছেই উত্তাল সমুদ্র

যেকোন ভিডিও প্রোডাকশনে লোকেশন রেকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আমার অভিজ্ঞতায় কখনো গল্প রচনার পর লোকেশন নির্ধারিত হয়েছে, কখনোবা লোকেশন দেখে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গল্প রচিত বা সম্পাদিত হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে সুন্দর নির্মাণের জন্য লোকেশন রেকি বা যথোপযুক্ত লোকেশন নির্ধারণ কতটা জরুরী।

সর্বশেষ একটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণের লোকেশন দেখতে গিয়েছিলাম কুমিরা-সন্দ্বীপ লঞ্চঘাট ও আশপাশ এবং বাঁশবাড়িয়া সাগর পাড়ে। দুটো জায়গাই চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহর এর অলংকার মোড় থেকে সীতাকুন্ডগামী ৮ নাম্বার গাড়ীতে চড়ে গেলে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০০ টাকা খরচ হবে যাতায়াতে, আর সময় লাগবে সবমিলিয়ে ২ ঘন্টার কিছু বেশি। আগেই বলে রাখি আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য থাকে নবীন নির্মাতাদের বাজেট ভীতি কমিয়ে নির্মাণে উৎসাহিত করা ও গুণগতমান ঠিক রাখা।

IMG_7083সময়টা ২০১৭ এর আগস্ট। সকাল ৮টার রোদও চামড়ায় বিঁধছিল তীক্ষ্ণ ফলার মত। এরই মধ্যে সহকারী পরিচালক আশরাফ আবির ও চিত্রগ্রাহক আশরাফুল সৌরভকে সাথে নিয়ে রওনা হই, গন্তব্য কুমিরা। এই দুইজন মানুষের নামেই শুধু মিল নয়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত অনেক মিলও রয়েছে। পরিশ্রমী ও আত্মত্যাগী, যা আমার কাজ অনেকটুকুই সহজ করে দেয়। কুমিরা ঘাটঘর নেমে, জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে টমটমে চড়ে আমরা যাই লঞ্চ জেটিতে। যেখান থেকে নিয়মিত বিরতিতে সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে লঞ্চ, ট্রলার ও স্পীড বোট ছেড়ে যায়। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভরা জোয়ার। উত্তাল সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ তখন আছড়ে পড়ছে পাড়ে বিছানো সিমেন্টের ব্লকের উপর, আর বৃষ্টির মত বড় বড় পানির ফোঁটা ছিটকে পড়ছে পাড়ে দাঁড়ানো আমাদের গায়ে। সাগরের গর্জন আর শোঁ শোঁ বাতাসে ঐ মুহূর্তটাকে মনে হলো কেউ আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

IMG_7148রোদের তীব্রতা বেশি থাকায় মানুষের আনাগোনা খুব বেশি একটা ছিল না। তবে নতুন করে এই জেটি নির্মাণের পর থেকে কুমিরা ঘাট যে কত জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা তা ছুটির দিনগুলোতে পরিলক্ষিত হয়। এখানে বেড়াতে আসার উপযুক্ত সময় হলো বিকাল, পশ্চিমাকাশে পড়ন্ত সূর্যের লাল আভা ভাটার টানে ফিরে চলা ফেনিল সাগরের পানিতে এক মোহনীয় দৃশ্য সৃষ্টি করে। তবে, ভর দুপুরে আমরা যখন জেটির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, ফুলে ফেঁপে ওঠা জোয়ারের পানি তখন নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অদ্ভুত এক অনুভূতি।

হলিউড ফেরত সিনেমাটোগ্রাফার (আবিরের ভাষায়) সৌরভ তখন ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমরা ভাবছিলাম অতি পরিচিত এ জায়গাটিকে কতটা সুন্দরভাবে মিউজিক ভিডিওতে উপস্থাপন করা যায়। সিদ্ধান্ত নিলাম যেহেতু দুপুরবেলা মানুষ কম থাকে আমরা ঐ সময় এখানে শ্যুটিং করবো, সাথে পাবো নীল আকাশ আর সাগরের উত্তাল ঢেউ।

IMG_7365এবার হাঁটার পালা। দুই লিটার পানি সাথে নিয়ে আমরা তিনজন হাঁটতে শুরু করলাম ব্রীজের ডানপাশের ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে। ভাঙাচোরা এ কারণে যে এখানে অনেকগুলো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড স্থাপিত হয়েছে, যেখান থেকে ভারী ট্রাক চলাচল করে। ততক্ষণে লোনা হাওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমাদের চামড়ায়। একেক জনের চেহারার রঙ কালো হয়ে আসতে থাকে। আমাদের হাঁটার উদ্দেশ্য ছিল একটু সবুজ ও সহজে বীচে নামা যায় এমন জায়গা খোঁজা। জন্মস্থান হওয়ার সুবাদে এখানকার সবকিছুই আমার চেনা জানা ছিল। কাঙ্খিত লোকেশন খুঁজে নিতে আমাদের সময় লাগলো না। কয়েক কিলোমিটার হেঁটে নারিকেল গাছ ঘেরা পুকুর, জেলেদের ছোট ছোট ঘর, সিমেন্টের ব্লক বিছানো দৃষ্টিনন্দন সাগরপাড়, জীর্ণ স্লুইচ গেট আর ভেজা বালিয়াড়ি- আমাদের পছন্দের লোকেশনগুলো। কোথাও কোথাও সারি সারি খেজুর গাছ, মাছ চাষের বড় বড় পুকুর- অনেকটা শান্ত দিঘীর মত।

বাঁধের একপাশে ছিল সাগরের গর্জন, অন্যপাশে সমতল ভূমিতে মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছিল আধাপাকা ধানের ছড়াগুলো। ধানক্ষেতের মাঝখানে পাশাপাশি দুটো খেজুর গাছ দেখে সৌরভ কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। অগত্যা খেজুর গাছের সাথে তার ছবি তুলে দিয়ে প্রকৃতি প্রেম নিবারণের কিছুটা চেষ্টা করলাম।

IMG_7359আমার মতে এ ধরনের জায়গায় এক্সপেরিমেন্ট করার অবাধ সুযোগ আছে। প্রকৃতির অনেকগুলো উপাদান একইসাথে একই জায়গায় পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে মিউজিক ভিডিও- লং শট কিংবা স্লো মোশন শট নিয়ে খেলার অনেক সুযোগ পাবেন চিত্রগ্রাহক। অসুবিধা একটাই, লোনা হাওয়ায় গায়ের চামড়া কালো কিংবা লবণাক্ত হয়ে আসা। তাছাড়া এখানকার স্থানীয় মানুষের যেহেতু শ্যুটিং বিষয়ে ধারণা কম, জড়ো হয়ে গেলে তাদেরকে বুঝিয়ে জোন ক্লিয়ার করার ব্যাপারটাও অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। জোয়ার ভাটার সময় হিসাব করেই এখানে শ্যুটিং শিডিউল ফেলতে হবে, কেননা কক্সবাজার বীচে যেমন জোয়ারের সময় বালিতে নামা সম্ভব এখানে তা ভাবাও যাবে না। জোয়ারের পানি একেবারে আছড়ে পড়ে সিমেন্টের ব্লকের উপর, আর ছিটকে এসে পড়বে গায়ে।

IMG_7289দেখতে দেখতে ৩টা বাজলো। এরই মাঝে হোমওয়ার্ক করার জন্য আমরা পেয়েছি অনেকগুলো ছবি আর ফুটেজ। কুমিরা বীচকে বিদায় জানিয়ে আমাদের যাত্রা এবার বাঁশবাড়িয়া। মাঝখানে ছোট কুমিরা বাজারের একটি ঝুপড়ি হোটেলে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। সীতাকুন্ডগামী ৮ নাম্বার গাড়ীতে চড়ে নামলাম বাঁশবাড়িয়া বাজারে, সেখান থেকে আবার সিএনজিচালিত অটোরিক্সা যোগে বাঁশবাড়িয়া সাগর বীচ। এখানেও সন্দ্বীপ যাওয়ার একটি ঘাট আছে। এটি আবার কুমিরা ঘাটের মত অত বড়সড় নয়, জোয়ারের সময় তলিয়ে যায়, আবার ভাটার সময় জেগে ওঠে। বাঁশবাড়িয়া বীচের অন্যমত আকর্ষণ হলো ঝাউবন। এত গভীর ঝাউবন আর তীক্ষ্ম সবুজ ঘাস বিছানো মাটি চিন্তাশীল যেকোন পরিচালকের জন্যই উপযুক্ত লোকেশন হতে পারে। যদিও পরবর্তীতে মিউজিক ভিডিওতে ঝাউবন ব্যবহার করিনি, অস্তগামী সূর্যকে সামনে রেখে স্লো মোশনে শেষ শটটা নিয়েছি যেখানে আর্টিস্ট সাগরের দিকে হেঁটে যায়।

IMAG0825এখানে মনে রাখার মত একটা সময় ছিল যখন ক্লান্তশ্রান্ত আমরা তিনজন সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে ছিলাম আকাশ পানে তাকিয়ে। এ অবস্থায় তিনজনই যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কেউ টের পাইনি। প্রায় ১৫ মিনিট পর আমাদের ঘুম ভাঙে আর অদৃশ্য এক সতেজতা ফিরে আসে। এরপর কিছুক্ষণ সাগরের পানিতে পা ভিজিয়ে সেদিনের মত লোকেশন রেকির ইতি টানলাম।

IMG_7461সন্ধ্যা নামার আগেই রওনা দিলাম সাগর থেকে। আশরাফ আবির ততক্ষণে কোন জায়গায় কি শট, কিভাবে নিবে বলতে শুরু করলো। আমরা শুনতে লাগলাম, চোখে ভাসতে লাগলো দৃশ্যগুলো। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে চিত্রনাট্য লিখে ফেলতে হবে, কারণ একটা দিন বিরতি দিলেই সুন্দর স্মৃতির জায়গা দখল করে নিবে দৈনন্দিন শহুরে ব্যস্ততার যত যন্ত্রণা।

লেখা : শারাফাত আলী শওকত, চলচ্চিত্রকার

ছবি: অাশরাফুল সৌরভ, চিত্রগ্রাহক