পোড়ামন – ২ : সনাতন গল্পে আধুনিক নির্মাণ

ভালোবাসা কি অন্যায়? ভালোবাসা যদি অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে তুমি কেন মানুষের মনে এত ভালোবাসা দিলা?

মানুষ সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার কষ্ট সহ্য করতে পারে না।

ট্রেইলার দেখেই আঁচ করেছিলাম এটি একটি ট্রাজেডি। কিন্তু বলাকা-তে পুরো সিনেমা দেখার পর মনে হয়েছে, ট্রাজেডির চেয়েও বেশি কিছু আছে পোড়ামন ২ তে।

শুরুটাই হয় ট্রাজেডি দিয়ে, একটা মৃত্যু। কারণ, ভালোবাসায় অবিশ্বাস আর ধোঁকার মিশ্রণে সৃষ্ট এক সামাজিক অস্বীকৃতি।

পদে পদে সমাজ ব্যবস্থা আর পরিবারের কর্তাদের অসুস্থ গোঁড়ামি উঠে এসেছে গল্পে। কামলা জমিদার শ্রেণীবিভাগ, সহনশীলতা আর মানবিক দৈন্যতার উপস্থাপন হয়েছে অনেকগুলো চরিত্রের যথার্থ চরিত্রায়নের মাধ্যমে।

ভালোবাসার চেয়ে প্রয়োজন বেশি আর কিইবা আছে, বাবার কাছে মেয়ে, ভাই এর কাছে বোন ততক্ষনই প্রিয় যতক্ষণ সে তাদের পছন্দে চলতে রাজি, যখনই নিজের পছন্দ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, আস্তে আস্তে সবাই নিয়মের শৃংখল পড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। অপরদিকে সম্পদের দিক দিয়ে গরিব, কিন্তু মন ও স্বপ্নে বড় আরেকটি পরিবার ভাবে কিভাবে সুখে থাকা যায়, সুখে রাখা যায়। শহুরে ভাবসাবের ছিটেফোঁটাও নেই পুরো ছবি তে, তারপরও ছবিটি আধুনিক, কারণ বাংলা ছবির দোহাই দিয়ে কোথাও যাচ্ছেতাই উপস্থাপনা নেই। যতটুকু প্রয়োজন, না দিলেই নয়, তাই ছিল।

IMG_20180627_183519

গল্প: নতুন কিছু না। সেই পুরনো প্রেম-ভালোবাসার বাঙালি গল্প। নতুনত্ব বলতে, কয়েকটা জায়গায় ভালো ভালো টুইস্ট, আর কল্পনাতীত ক্লাইমেক্স। প্রথমবারের মত প্রিয় সালমান শাহ কে একটি সৃষ্টিশীল ট্রিবিউট। ও হ্যাঁ, সুজন শাহ’র এন্ট্রির জায়গাটা খুবই ভালো হয়েছে।

নির্মাণ: পরিচালক রায়হান রাফি’র কাজ খুব কাছ থেকেই দেখেছি। কোন বিষয়ে ছাড় দিতে না চাওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে প্রতিটি দৃশ্যে।

সিনেমাটোগ্রাফি ও কালার: বাণিজ্যিক ছবির বিচারে বাংলা ছবিতে সাধারণত এমন দৃশ্যধারণ চোখে পড়ে না। গ্রামীণ প্লটে অসাধারণ ফ্রেমিং, ক্যামেরা মুভমেন্ট, কটকটে কালার পরিহার ছবিটি দেখতে অনেক শান্তি যুগিয়েছে চোখে।

অভিনয়: বেশি আগ্রহ ছিল সিয়াম আহমেদ এর অভিনয় দেখার। হতাশ করেননি, আবার খুব বেশি খুশিও হতে পারিনি। আরো ন্যাচারাল অভিনয় আশা করেছিলাম। সবচেয়ে বেশি ইমোশনাল জায়গাটিতে বেশিক্ষণ ইমোশন ধরে রাখতে পারেননি, এক্ষেত্রে কিছুটা দায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেরও। পুজা চেরি- উৎরে যাওয়ার মত অভিনয় করেছেন। সুজন শাহ’র দুই সাগরেদ, বস্তা ও কাঠি- পরিমিত কৌতুক করার চেষ্টা করেছেন, যা ছবির মাঝে মাঝে দর্শক হাসিয়েছে। খারাপ না। ছবিতে দাদী (আনোয়ারা) ও মা (নাম জানি না) এ দুইজনের বয়স প্রায় কাছাকাছিই মনে হয়েছে। দাদী- পরীকে অনেক ভালোবাসে, তাকে সাপোর্ট করে কিন্তু সে তুলনায় প্রয়োজনীয় আবেগ সৃষ্টি করা হয়নি আগে থেকে। মনে হয়েছে, যখনই পরীর সাহায্য দরকার, তখনই দাদী হাজির হয়েছেন। সাপোর্টিং ক্যারেকটার হিসেবে পরীর বান্ধবীকে অনেকটা তার অনুচর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ হয়নি। বাবা চরিত্রে নাদের চৌধুরী, ভাই চরিত্রে সৈয়দ বাবু- বেশ ভালো করেছেন। ভিলেন খরা কাটাতে পারেন সৈয়দ বাবু, চোখের অভিব্যক্তি অসাধারণ। আর তার সেই ডায়লগ- ভাল্লাগছে, খুউউব ভাল্লাগছে।

বাপ্পারাজ: ছোট বেলায় দেখেছি বাপ্পারাজ সবসময় কাঁদো কাঁদো থাকতেন, এখন অবশ্য তা নাই, কিছুটা মজাও দিয়েছেন, ভাই এর প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ঠিকঠাক ফুটে উঠেছে।

ফজলুর রহমান বাবু:  স্ক্রিন টাইম যাই হোক, এই মানুষের তুলনা নাই। ছবির একদম শেষের দিকে কবরের পাশে শুয়ে নিজের গায়ে মাটি ঢালতে থাকেন তিনি, ঐ জায়গায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠবে।

গান ও কস্টিউম: সবগুলো গানই অসাধারণ, পোড়ামন গানটি মনে বাজছে। তবে ওহে শ্যাম গানের কালার ও কস্টিউমে অনেকটা সাউথ ইন্ডিয়ান প্রভাব দেখা গেছে, যা কিছুটা বিরক্তিকর। সবচেয়ে ভালো যেটা হয়েছে তা হলো, কোনো একটা গান হুট করে চলে এসেছে এমন মনে হয়নি, একটা গান ডিমান্ড করার মত যথেষ্ট পরিবেশ সৃষ্টি করেই গান যোগ করা হয়েছে।

36359953_1791066607637918_3775049556220182528_o

আগেই বলা উচিত ছিল, আমি সাধারণত রিভিউ লিখি না, আসলে লিখতে পারি না। কাছের কয়েকজন মানুষের অনুরোধে লিখলাম। দিনরাত হলিউডি কিংবা ইউরোপিয়ান ফ্লেভারের মুভি/সিরিজ দেখার পর যদি আপনি সেই একই এক্সপেকটেশন নিয়ে পোড়ামন ২ দেখতে যান- ভুল করবেন। ভালোবাসা যেমন কোন লজিক মানে না, পোড়ামন ২ তেও জায়গায় জায়গায় লজিকের অভাব আছে। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যে একটা অদ্ভুত মায়া আছে, যা আপনাকে ধরে রাখবে। কোনো বোরিং ক্যারেকটার নাই, অতিনাটকীয়তা নাই- পরিমিত, পরিচ্ছন্ন বাংলা ছবি। ৩/৪ টা প্যারালাল গল্প দিয়ে আপনাকে হাইপোথেটিক্যাল ফিল দেয়ার কঠিন চেষ্টা পরিচালক করেননি বরং একটি সাদামাটা গল্পকে ধীরে ধীরে মাথায় ঢুকিয়েছেন, তারপর খাঁটি বাংলা ছবি সম্পর্কে আপনার মাথায় পূর্ব ধারণ থাকলে সেটি মুছে দিয়ে নতুন একটি ধারণার জন্ম দিয়েছেন, তারপর হল থেকে বের হওয়ার সময় আপনাকে পরিতৃপ্তি দিয়েছেন।

35649178_1772647702813142_6266756755477233664_o

পোড়ামন ২ একটি ব্যালান্সড ছবি। লাইনের দুই পাশের দর্শকের জন্যই এটি উপভোগ্য। এটি একটি প্রোপার টীম ওয়ার্ক। পোস্টার থেকে শুরু করে, ট্রেইলার, গান হয়ে সিনেমা পর্যন্ত সব জায়গাতেই টীমের মুন্সিয়ানা পরিলক্ষিত হয়েছে। আমি অবশ্যই রিকমেন্ড করবো পোড়ামন ২ দেখার জন্য। যদিও এখনো চট্টগ্রামে মুক্তি পায়নি, তাই বাণিজ্যিক রাজধানীতে এই ছবির আশু মুক্তি কামনা করছি।

এবং সবসময় যা বলি, বাংলা ছবি দেখার জন্য রিভিউ লাগে না।

এ শিল্পকে বাঁচাতে, এগিয়ে নিতে- ভালো খারাপ সবগুলো মুভিই সাধ্যমত দেখা উচিত আর গঠনমুলক সমালোচনা ও চর্চার জন্য রিভিউ লেখা উচিত।