একুশের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র

বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ হতে আজ অবধি সময় পর্যন্ত অনন্য অসাধারণ গৌরব তিলক হয়ে জ্বলজ্বল করছে আমাদের ভাষার লড়াই, ঊনিশশ’বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রাগুক্ত সময়ে ভাষার আন্দোলনই বাঙালি জাতির সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদী সুপরিকল্পিত ও সম্মিলিত দ্রোহের বিস্ফোরণ। সহস্র বৎসর ধরে বিদেশি-বিজাতীয়দের দ্বারা শোষিত বাঙালি চিরদিনই সংগ্রাম করেছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হলেও এই শতাব্দীর মধ্যাহ্নে জাতীয়তাবাদী চেতনা ভারতবর্ষের কোথাও ব্যাপ্তি লাভ করেনি। পূর্ব ও পশ্চিম শিরোনামে বিভক্ত পাকিস্তানে পশ্চিমাদের নিরন্তর শোষণ ও নির্যাতনের বিপরীতে পূর্ব বাংলার গণমানুষের মাঝে তীব্র দ্রোহ আর জাতীয়তাবোধ প্রখর হয়ে উঠেছে সেই সময়। বাঙালি জাতিরতো অবশ্যই, সারাবিশ্বের মানুষের জন্য অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংগ্রামেরই জন্ম দিলো বীর বাঙালির আমাদের দেশের দুঃখী-দ্রোহী মানুষেরা। পৃথিবীর কোথাও কোনদিন ঘটেনি, আর ঘটার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সেই ঘটনাই বীর বাঙালিরা ঘটিয়ে দিলো পৃথিবীর ইতিহাসে, ১৯৫২ সালে। নিজের মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে, কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে রক্ষার্থে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের রক্তে নদী বইয়ে দিয়েছিলো বিংশ শতাব্দীর উত্তাল মধ্যাহ্নে। বাঙালিই পৃথিবীতে একমাত্র গর্বিত জাতি যে বুকের রক্তে মায়ের মুখের ভাষার মূল্য মিটিয়েছে। মানবজাতির ইতিহাসে বাঙালিকে এই অনন্য-অসাধারণ গৌরবের তকমা প্রদান করেছে রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতসহ অজস্র ভাষা সৈনিকেরা। তাঁদের রক্তের সিঁড়ি বেয়েই বাঙালি সাহস আর দ্রোহের সীমানা পেরিয়েছে, এসেছে স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা।

বায়ান্নর ভাষাআন্দোলন এদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে নয় বরং শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা বাঙালি জীবনের সর্বক্ষেত্রেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক মূল্যবোধের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। এই কথা আজ নিরঙ্কুশভাবে সত্য যে, বাঙালির ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই চলচ্চিত্র শিল্পের (শিল্পকলা ও ইন্ডাস্ট্রি দ্বৈতার্থেই) শুভ সূচনা করেছিলো। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে দ্রোহী চেতনাপ্রবাহ বাঙালির রক্তে অনুক্ষণ তোলপাড় করেছে তারই জোয়ারে এদেশের চলচ্চিত্রের পথিকৃৎপুরুষ আব্দুল জব্বার খান ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের পরিচালক ড. সাদেকের ডাকা সভায় বিজাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন এবং ইতিহাস সাক্ষী বাঙালির সেই অগ্নিসন্তান পুরোনো আইকো ক্যামেরা ও ভাঙা টেপ রেকর্ডার দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন পূর্ববাংলার প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ। বাঙালির সম্মান ও দ্রোহকে তিনি মুখ থুবড়ে পড়তে দেননি খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোসানীসহ অন্যান্য পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে। অভিনেতা, নাট্যপরিচালক, প্রকৌশলী আব্দুল জব্বার খান সেই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহে বাঙালিকে বাংলা ভাষায় বিজয়ীই শুধু করলেন না, বাংলাভাষায় বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের বিপুল সম্ভাবনারও দ্বারোন্মোচনও করলেন। মুখ ও মুখোশের ঐতিহাসিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আমরা পেলাম এক ঝাঁক দেশপ্রেমিক, কমিটেড চলচ্চিত্রকার। পেলাম সুস্থ ধারার জীবনবোধসম্পন্ন সমাজসচেতন কিছু চলচ্চিত্র (ষাটের দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিছু কিছু), একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্টুডিও যা এফ.ডি.সি নামে পরিচিত এবং আরও কয়েকটি বেসরকারি স্টুডিও, পেলাম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রশিল্পী, সমালোচক, চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনা ইত্যাদি ইত্যাদি এবং একজন জহির রায়হান’কে।

MV5BMTVkOTdmY2EtYmQ3Mi00MmM4LWFlNjgtNTA1OWM5MTQzNGQ0XkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_বায়ান্ন’র ভাষাসৈনিক তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা জহির রায়হান পঞ্চাশের দশকে চলচ্চিত্রের সাথে সংযুক্ত হয়েছিলেন। প্রথমে এহতেশাম, এ. জে. কায়দারের সহকারী হিসাবে কাজ করলেও প্রান্তিক পঞ্চাশে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন এবং ’৬১ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘কখনো আসেনি’ মুক্তি পাওয়ার পরই তিনি মেধাবী ও কমিটেড চলচ্চিত্রকাররূপে আত্মপ্রকাশ করে মাত্র দেড় দশকের চলচ্চিত্র জীবনে ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বাহানা’, ‘সঙ্গম’, ‘আনোয়ারা’, ‘বেহুলা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ ইত্যাদি জীবনবোধে উজ্জীবিত শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নিজের স্বাতন্ত্র্য স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একমাত্র রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার (চড়ষরঃরপধষ ঋরষস গধৎশবৎ) জহির রায়হানই সার্বিক অর্থে গণমানুষের রাজনীতি ও বাঁচার সংগ্রামকে সেলুলয়েডে চিত্রায়ণ করতে সক্ষম হয়েছেন প্রশ্নাতীত আন্তরিকতার মাধ্যমে। তিনিই উপমহাদেশে একমাত্র চলচ্চিত্রকার যাঁর ছবি (জীবন থেকে নেয়া) দেখার দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত মিছিল করেছে এদেশের মানুষ। তিনি নানা জনের নামে বাণিজ্যিক ছবি অনেক করলেও বক্তব্যধর্মী রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণে নিরন্তর ইচ্ছের আগুনে জ্বলেছেন। এদেশের মানুষের জীবনসংগ্রামকে, রাজনীতিকে মহাকাব্যিক সুষমায় সেলুলয়েড চিত্রায়ণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্নেই তিনি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ ছবির কাজ শুরু করেছিলেন কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণে সেই ছবি অসমাপ্ত রয়ে গেলো। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান আরও ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতা চিত্রায়ণের মাধ্যমে রাজনীতিকে চলচ্চিত্রে আরও প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং আওয়ামী লীগের কতিপয়ের স্বরূপ প্রকাশ পাওয়ার আশংকায় তারাই স্বাধীনতা উত্তরকালে জহির রায়হানকে গুম করে ফেলেন (জহির রায়হানের পরিবার সূত্রে এই অভিযোগ করা হয় এবং রাজপথে তাঁরা মিছিলও করেন সেই সময়। জহির রায়হান হত্যার তদন্ত তৎকালে সরকারি হস্তক্ষেপে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং আজও তা উদ্ঘাটিত হয়নি)। ফলে এই চলচ্চিত্রটিও আর নির্মিত হয়নি। ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনের উপর ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নামে আরও একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ভাষা আন্দোলনের এক যুগ পরে একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সব প্রাথমিক কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করলেও এই চলচ্চিত্রটিও শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বাধার কারণে। তবুও জহির রায়হান সেই বাধাকে চ্যালেঞ্জ করে ছবি নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন বলে জানা যায় কিন্তু পাকিস্তান সরকারের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার (যিনি জহির রায়হানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু) পরামর্শে সময়ের প্রয়োজনে জহির রায়হান সেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ কাজ স্থগিত করেন। কিন্তু জহিরের জন্য সেই সুসময় আর আসেনি। ফলে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ চলচ্চিত্রটিও আর নির্মিত হয়নি কোনদিন।

‘কাঁচের দেয়াল’ নির্মাণের পর একুশে ফেব্রুয়ারী চলচ্চিত্রটি তৈরির উদ্যোগ নেন জহির রায়হান। ইতিপূর্বে তাঁর নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্রই শিল্পোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বাণিজ্যিকভাবে অসফল হওয়ার কারণে এবং সম্পূর্ণার্থে একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হওয়ার কারণে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ছবির জন্য তিনি কোন প্রযোজক জোগাড় করতে সক্ষম হননি তখন। পরে কিছু বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করে অর্থ সঞ্চয় করেন এবং নিজেই নবারুণ ফিল্মস-এর ব্যানারে ছবিটি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জহির রায়হানের পরিকল্পনায় ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ছবিতে চারটি পরিবার থাকার কথা এবং এই চারটি পরিবার সমাজের চারটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে তিনি একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিটির খসড়া তৈরি করেন এবং স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী মূর্তজা বশীরকে চূড়ান্ত চিত্রনাট্য রচনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। মূর্তজা বশীর শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী পরিবারটির মুখে আঞ্চলিক ভাষা চয়নের জন্য বস্তিতে ঘুরে ঘুরে সংলাপ তৈরি করেন। শাহরিয়ার কবিরের রচনা থেকে জানা যায়, “মূর্তজা বশীর আমাকে পরে বলেছেন একুশে ফেব্রুয়ারী চিত্রনাট্য লেখার জন্য জহির রায়হান তাঁকে অগ্রিম একশ টাকাও দিয়েছিলেন। তাঁর মতে এফ.ডি.সি’তে খুঁজলে চিত্রনাট্যটি পাওয়া যাবে।” চূড়ান্ত চিত্রনাট্য তৈরি হয়ে গেলে জহির রায়হান তা এফ.ডি.সি’তে জমা দেন ছবি নির্মাণের জন্য (নির্মাণের পূর্বে নির্মাণ কাজ শুরুর সময় এফ.ডি.সিতে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য জমা দেওয়ার নিয়ম আছে এবং নির্মাণ শেষে সেন্সর বোর্ড এ জমা দিয়ে সেন্সর ছাড়পত্র নেয়ারও নিয়ম আছে)।

চিত্রনাট্য জমা দিয়েই জহির রায়হান লোকেশন ও শিল্পী নির্বাচনের কাজও সম্পন্ন করেন। একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিতে খান আতাউর রহমান, সুমিতা দেবী, রহমান, শবনম, আনোয়ার হোসেন, সুচন্দা, কবরী প্রমুখের অভিনয় করার জন্য সবকিছুই চূড়ান্ত হয়েছিল কিন্তু ছবিটির নির্মাণ কাজ পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে দেয় এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে এফ.ডি.সি’তে জমা দেয়া চিত্রনাট্যটি পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে গুম করে ফেলা হয়। ছবিটির নির্মাণের জন্য প্রস্তুতিমূলক সব কর্ম সম্পাদিত হলেও শ্যুটিং শুরু করার সময় তা কেন নিষিদ্ধ করা হলো, কেন ছবিটি নির্মাণ করলে জহির রায়হানের জীবন সংশয় দেখা দিয়েছিলো, কেনইবা জহির রায়হানের আমলা বন্ধু তাঁকে ছবিটি নির্মাণ করতে নিষেধ করেছিলেন ইত্যাদি সব কৌতূহলী প্রশ্ন এখনও আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। কি ছিলো সেই ছবিতে, কি করতে চেয়েছিলেন জহির রায়হান ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ চলচ্চিত্র প্রকল্পের মধ্য দিয়ে?

জহির রায়হানেরই অনুজ তৎকালীন সাহিত্য-চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সমীপেষু’র সম্পাদক শাহরিয়ার কবিরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় (কেননা প্রচন্ড ব্যস্ত জহির রায়হান ছবি নির্মাণ ও অন্যান্য কাজে সময় বের করতে পারছিলেন না) ঈদের ছুটির সময় অনেকটা জোর করেই শ্রুতলিপি আকারে চিত্রনাট্যের খসড়াটি লিখে নেন শাহরিয়ার কবির। একুশে ফেব্রুয়ারী চলচ্চিত্রের খসড়া চিত্রনাট্যটি ‘সমীপেষু’ পত্রিকার জন্য আদায় করেন এবং ১৯৭০ সালে তা ছাপা হয় শিল্পী হাশেম খানের অলংকরণসহ, ফলে আমরা জানতে পারি একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিটির অবয়বগত কাঠামো।

MV5BZjk1YWM3ZTEtMWU4My00NDY4LTgzYjYtN2RkMWQ4OTY5OGVlXkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কারফিউ ভঙ্গকারী প্রথম দলটির অন্যতম একজন জহির রায়হান। ভাষা আন্দোলনে প্রথম দশজনের নেতৃত্ব প্রদানের ঘটনা সম্পর্কে তাঁর অনুজ শাহরিয়ার কবিরকে তিনি বলেন, ‘পার্টির নির্দেশ ছিলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার। ছাত্রদের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। ছয় গ্রুপে ভাগ করা হলো। আমি ছিলাম প্রথম দশ জনের ভেতর।…. সিদ্ধান্ততো নেয়া হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে। কিন্তু প্রথম ব্যাচে কারা যাবে? হাত তুলতে বলা হলো। অনেক হাত থাকা সত্ত্বেও হাত আর ওঠে না। কারণ ক্যাম্পাসের বাইরে পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে পজিশন নিয়ে বসে আছে। ভাবখানা এই যে, বেরুলেই গুলি করবে। ধীরে ধীরে একটা দুইটা করে হাত উঠতে লাগলো। গুণে দেখা গেলো আটখানা। আমার পাশে ছিলো ঢাকা কলেজের একটি ছেলে। আমার খুব বাধ্য ছিলো। যা বলতাম, তাই করতো। আমি হাত তুলে ওকে বললাম, হাত তোল। আমি নিজেই ওর হাত তুলে দিলাম। এইভাবে দশজন হলো।’ ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ জহির রায়হান ঠিকই বুঝেছিলেন এই আন্দোলন সমগ্র বাঙালির আন্দোলন, ছাত্রদের কোন বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা নয়। দিনান্তেই এই মিছিল সারা শহর তথা সমগ্র দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিলো। সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণে বাঙালির ভাষার আন্দোলন সফল হয়েছিলো তা ভাষাসৈনিকের স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়। জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনের সার্বিক এই ব্যাপকতাকে চলচ্চিত্রায়িত করার প্রয়াসী হয়েছিলেন। তাঁর ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ছবিতে পূর্বোক্ত চারটি পরিবারের একটি উচ্চবিত্ত, একটি মধ্যবিত্ত, একটি শ্রমিক ও অপরটি কৃষক পরিবার হওয়ার কথা ছিলো- যারা সমাজের চারটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে। এই চারটি পরিবার ঘটনাসূত্রে একুশের ভাষা আন্দোলনের সাথে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এমন একটি জায়গায় মিলিত হয়ে যাবে যেখানে ছাত্রদের উপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে গুলির শব্দের সাথে একটি কাক অতিসত্বর পুরো ঢাকা শহরের আকাশ উড়ে বেড়াবে। ছবিটি শুরু হবে এইভাবে–

‘কচু পাতার উপরে টল টল করে ভাসছে কয়েক ফোঁটা শিশির।

ভোরের কুয়াশার নিবিড়তার মধ্যে বসে একটা মাছরাঙা পাখী। ঝিমুচ্ছে শীতের ঠান্ডায়। একটা ন্যাংটো ছেলে, বগলে একটা স্লেট। আর মাথায় একটা গোল টুপি। গায়ে চাদর, পায়ে চলা ভেজা পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে। অনেকগুলো পাখী গাছের ডালে বসে নিজেদের ভাষায় অবিরাম কথা বলে চলেছে। কতগুলো মেয়ে।

ত্রিশ কি চল্লিশ কি পঞ্চাশ হবে। একটানা কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে না। শুধু বলে যাচ্ছে।

কতগুলো মুখ।

মিছিলের মুখ।

রোদে পোড়া।

ঘামে ভেজা।

শপথের কঠিন উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভাস্কর।

এগিয়ে আসছে সামনে।

জ্বলন্ত সূর্যের প্রখর দীপ্তিকে উপেক্ষা করে।

সহসা কতগুলো মুখ।

এগিয়ে এলো মুখোমুখি।

বন্দুকের আর রাইফেলের নলগুলো রোদে চিকচিক করে উঠলো

সহসা আগুন ঠিকরে বেরুলো,

প্রচন্ড শব্দ হলো চারিদিকে।

গুলির শব্দ।

– কচু পাতার উপর থেকে শিশির ফোঁটাগুলো

  গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।

– মাছরাঙা পাখিটা ছুটে পালিয়ে গেলো ডাল থেকে।

– ন্যাংটা ছেলেটার হাত থেকে পড়ে গিয়ে স্লেটটা ভেঙ্গে গেলো।

– পাখিরা নীরব হলো।

– মেয়েগুলো সব স্তব্ধ নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো।

– একরাশ কৃষ্ণচূড়া ঝরে পড়লো গাছের ডাল থেকে। সূর্যের প্রখর দীপ্তির নীচে একটা নয়Ñ দুটো নয়। উদ্ধত সাপের ফণার মতো উড়ছে।

একুশে ফেব্রুয়ারী

সন ঊনিশ’শ বায়ান্ন’

(জহির রায়হানের খসড়া চিত্রনাট্য থেকে উদ্ধৃত)

চাষার ছেলে গফুর ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন দেখতো। আমেনার সাথে বিয়ের দিন ঠিক হলে সে শহরে এসে জড়িয়ে যায় একুশে ফেব্রুয়ারির সাথে। আর ফিরে যায় না কোনদিন। গ্রামে কলসী কাঁখে পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গফুরের বাগদত্তা প্রেয়সী আমেনা। কৃষক পরিবারের প্রাত্যহিক জীবন ও জীবন ভাবনা চিত্রায়ণের শিল্পিত প্রয়াস একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিতে লক্ষ্যণীয়।

পুলিশ অফিসার আহমদ হোসেনের ছেলে তসলিম তুখোড় ছাত্রনেতা। ছেলের রাজনীতি ও তাঁর সততার কারণে আটকে আছে প্রমোশন। তসলিমই নেতৃত্ব দেয় ভাষা আন্দোলনের এবং তার বাবা অথবা বাবার মতো কারো গুলিতেই নিহত হয় সে। এই চরিত্র ও পরিবারের মধ্য দিয়ে জহির রায়হান তৎকালে ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক পর্যায় ও পাক-সরকারের প্রশাসনিক হিংস্রতার না-জানা কাহিনী চিত্রায়ণে প্রয়াসী ছিলেন।

এক কালের কবি আনোয়ার হোসেন, যিনি এখন কলমপেষা কেরানী। কিভাবে যুক্ত হয়ে উঠেন সম্মিলিত দ্রোহের সাথে তা চিত্রায়ণ প্রয়াসের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত জীবনের নৈমিত্তিক দুঃখ কথা সাবলীলতায় মুর্খতার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

মকবুল আহমেদ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা, মিল-ইন্ড্রাস্ট্রি কোন কিছুরই কমতি নেই তার জীবনে। অনেকগুলো ব্যবসা। তেলের ব্যবসা, পানের ব্যবসা, পারমিটের ব্যবসা ইত্যাদি নানা রকম ব্যবসার কাজে সারাক্ষণ ব্যস্ত। জাগতিক দুঃখে তবুও ভারাক্রান্ত তিনি। অর্থনৈতিক ও ক্ষমতা ছোঁয়া রাজনীতির স্বরূপ উদ্ঘাটনের চমৎকার স্বপ্ন এই চরিত্রের রূপায়ণে জহির রায়হান দেখেছেন।

শ্রমিক সেলিম রিক্সা চালায়, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এই সব কিছুতেই তার কিছু যায় আসেনা। বিড়ি খায়, সিনেমা দেখা আর নিজের একটা রিক্সা কেনার স্বপ্ন দেখতে-দেখতে ক্ষয় করে জীবনীশক্তি। নিম্নবিত্ত শ্রমজীবি মানুষের জীবনসংগ্রামেও জড়িয়ে যায় রাজনীতি। হরতাল, কারফিউ হলে সে রিক্সা চালাতে পারবে না, উপোস থাকতে হবে। তবুও এসব থেকে সেও মুক্তি পায় না কোনভাবে। আশ্চর্য দৈবজালে সেও জড়িয়ে যায় সব কিছুর সাথে।

MV5BZDFmNGVlNjUtYzNiZS00MmZjLWIzN2UtMWU4ODJmNTAzOTgzXkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_এইভাবেই জহির রায়হান বাঙালির শ্রেণী সংগ্রামকে একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিতে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। রাজনীতির অন্দর-বাহির চিত্রায়ণের পাশাপাশি বাঙালির জীবনযন্ত্রণাকে সেলুলয়েডে বন্দী করতে চেয়েছিলেন জহির রায়হান এই ছবিতে। কাক, নদী, সূর্য, পাখিসহ সহস্র প্রতীক দিয়ে চিত্র-ভাষায় বাঙালির সংগ্রামী চলচ্চিত্রকাব্য রচনার প্রয়াসী হয়েছিলেন। তাঁর অনুজ ও সহকারী শাহরিয়ার কবিরের রচনা থেকে আমরা জানি চলচ্চিত্রগুরু সের্গেই আইজেনস্টাইনের অক্টোবর ও ব্যাটেলশীপ পটেমকীন চলচ্চিত্র দ্বারা দারুণভাবে প্রণোদিত জহির রায়হান একুশে ফেব্রুয়ারী ছবিটিকেও বাঙালির হাজার বছরের জীবনসংগ্রামের চিত্ররূপে চলচ্চিত্রায়িত করার স্বপ্ন দেখতেন। খসড়া চিত্রনাট্যটি অনুসারে ছবিটির সমাপ্তি এইভাবে হতে পারে–

‘সূর্য উঠছে।

সূর্য ডুবছে।

সূর্য উঠছে।

সূর্য ডুবছে।

সুতোর মতো সরু পানির লহরী বালির উপর দিয়ে ঝির ঝির করে বয়ে যাচ্ছে।

জ্বল প্রহরের আগে রাস্তায় নেমে এলো এক জোড়া খালি পা।

সুতোর মতো সরু পানি ঝরণা হয়ে বয়ে যাচ্ছে এখন।

কয়েকটি খালি পা কংক্রিটের পথ ধরে এগিয়ে আসছে সামনে।

ঝরনা এখন নদী হয়ে ছুটে চলেছে সামনের দিকে।

সামনে বিশাল সমুদ্র।

সমুদ্রের মতো জনতা।

নগ্ন পায়ে এগিয়ে চলেছে শহীদ মিনারের দিকে অসংখ্য কালো পতাকা।

পত পত করে উড়ছে।

উড়ছে আকাশে

মানুষগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ঢেউ তুলে এগিয়ে আসছে সামনে ইউক্লিপটাসের পাতা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে নিচে। মাটিতে।

ঝরে।

প্রতি বছর ঝরে।

তবুও ফুরোয় না।’

তীব্র একটা অপটিমিস্টিক সমাপ্তি। দারুণ আশায় জহির রায়হান মধ্য ষাটে জেনে গিয়েছিলেন যেন এই জাতিকে কেউ দাবাইয়া রাখতে পারবে না। বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম যেন চিরকালীন মনের মুক্তির সংগ্রামে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা এই ছবিতে জেগে উঠে। এই কথা সত্য যে, এই খসড়া চিত্রনাট্যতে একুশে ফেব্রুয়ারির অবকাঠামোগত বিষয়বস্তু আমরা অবগত হই।

তবে জহির রায়হানের শিল্পিত হাতে যদি এই ছবি নির্মিত হতো তবে এর ডিটেইলস ও প্রয়োগ ব্যঞ্জনা একে ভিন্নতর নানা মাত্রায় সমৃদ্ধ করতো। কেন না, জহির রায়হানের সহকর্মী মাত্রই অবগত আছেন জহির রায়হানের শ্যুটিং স্ক্রিপ্ট তৈরি হয় শ্যুটিং স্পটে গিয়ে। তাৎক্ষণিক সকল বিষয়াদির শিল্পিত চলচ্চিত্রায়ণে জহির রায়হান বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কুশলী। তাঁর ইম্প্রোভাইজ শিল্পসৃষ্টির ক্ষমতা জহির রায়হানের প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রকেই অনন্যতা প্রদান করেছে। তার চিত্রনাট্য রচনার ও চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল সম্পর্কে তার সহোদর শাহরিয়ার কবির লিখেছেন-“জহির রায়হানের অধিকাংশ চিত্রনাট্য খসড়ার মতো লেখা। ছবির শট বিভাজনের সময় এমনকি শ্যুটিং এর সময়ও অনেক উপাদান যোগ হতো। সে কারণে তাঁর চিত্রনাট্য পড়ে বোঝা যাবে না শেষ পর্যন্ত ছবিটি কি হবে।”

এই খসড়া চিত্রনাট্যে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ছবিটি যদি তৎকালে নির্মিত হতো জহির রায়হানের স্বপ্নের মতো হয়তো এপিক একটি ফর্ম ছবির প্রয়োজনেই ছবিটিতে যুক্ত হতো এবং রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসাবে ভিন্নধর্মী ও ভিন্ন আঙ্গিকের একটি চলচ্চিত্র আমরা পেতাম। চিত্রনাট্য মতে পরিকল্পিত চলচ্চিত্রটিতে প্রখর রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও একবারও কোন জায়গায় শ্লোগান সর্বস্ব হয়ে উঠেনি, হয়ে উঠেনি তত্ত্বের মার প্যাঁচে তথাকথিত ‘পলিটিক্যাল ফিল্ম’ জহির রায়হানের ভাবনার ম্যাচুরিটির কারণে ছবিটি অত্যন্ত মানবিক এবং রাজনৈতিক চলচ্চিত্ররূপেই চিত্রায়িত হতে পারতো। অন্ততঃ চিত্রনাট্য থেকে আমাদের এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়। বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য পরাধীন বাংলাদেশেও শাসক শ্রেণি জহির রায়হানের শিল্প সৃষ্টি ও জীবনের প্রতি খড়গ হাতে অপেক্ষমান ছিলো ফলে আমরা পাইনি মানবীয় রাজনৈতিক চলচ্চিত্র একুশে ফেব্রুয়ারী। আর স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি অপেক্ষমান থাকার ধৈর্য্যও প্রদর্শন না করে স্বাধীনতার দেড়মাসের মধ্যেই আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিলে এদেশের গণমানুষের চলচ্চিত্রকার ভাষাসৈনিক মুক্তিযোদ্ধা জহির রায়হানকে।

লেখক: নাজিমুদ্দীন শ্যামল, লেখক ও সাংবাদিক

ছবি: সংগ্রহ