আনপ্রেডিক্টেবল ‘Forgotten (2017)’ এর রিভিউ

মিস্টিরিয়িাস, থ্রিলার অথবা ডিটেকটিভ সিনেমাগুলোর অন্যতম মজার দিক হলো মাইন্ড গেম। মূলত পরিচালকই দর্শকদের সাথে এই খেলাটা খেলে থাকেন। ‘কি হতে পারে’ এটা আগে থেকে চিন্তা করা দর্শকদেরই স্বভাব। একটা খুন হলো বা একটা ঘটনা ঘটলো- পরিচালক যা দেখাচ্ছে তার পাশাপাশি দর্শক নিজের একটা ‘সমাপ্তি’ চিন্তা করে নেন। আর পরিচালকেরাও কি কম চালাক! তারাও দর্শককে যতটা পারা যায় ধোঁয়াশার মধ্যে রাখতে চান। দর্শক যত বেশী ক্ষণ ধরে ‘সমাপ্তি’ আন্দাজ করতে হিমশিম খাবে, সে সিনেমা সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশী। আর এই মাইন্ড গেমিংয়ে দক্ষিণ কোরিয়ান পরিচালকেরা যে কতটা ধুরন্ধর, তা তারা কয়েক দশক ধরেই দেখিয়ে আসছে। ওল্ড বয়, মেমোরিস অফ মার্ডার, দ্য চেজার, নো মার্সি, মন্টেজসহ অসংখ্য সিনেমায় এমন সব ‘সমাপ্তি’ দেখানো হয়েছে, যা ছিল দর্শকের চিন্তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। তেমনই ‘মাইন্ড ফ্রিক’ একটি সিনেমা, নেটফ্লিক্স প্রোডাকশন ‘ফরগটেন (২০১৮)’।

MV5BMWE2Y2FhNzQtN2NkOC00MjdjLTgyMDYtYTUwMzQ0MTIxNjcxXkEyXkFqcGdeQXVyMTMxMTY0OTQ@._V1_SY1000_CR0,0,698,1000_AL_মা বাবা এবং বড় ভাই য়ু-সিয়কের সাথে নতুন বাড়িতে উঠেছে জিন সিয়ক। অতিমাত্রায় সংবেদনশীল জিন সিয়ক ঔষধ খেয়ে মোটামোটি স্বাভাবিক জীবনযাপনই পার করছে। সে কিছুটা অসুস্থ হলেও সে তার ভাই য়ু সিয়ককে নিয়ে বেশ গর্বিত। এতটা মেধাবী, পরিশ্রমী, সফল ভাই থাকলে কে-ই বা গর্ব করবে না! নতুন বাড়িতে সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল শুধুমাত্র একটা রুমে আগের মালিকের কিছু মালপত্র রয়ে যাওয়ায় ওই রুমে প্রবেশে তার বারণ ছিল। পরিবারের সবাই এই বারণ মেনেও নিয়েছিল। একদিন বৃষ্টির রাতে বাইরে হাটতে বের হয় দুই ভাই। আচমকাই কে বা কারা বড় ভাই য়ু সিয়ককে ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যায়। পরের ক’দিন কোন খবর নেই, হাওয়া। সে ফিরে আসে পাক্কা ১৯ দিন পর। সমস্যা শুরু হয় এখান থেকেই। অপহরণের কথা মনে করতে পারে না য়ু সিয়ক। পাশাপাশি আচার আচরণে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করে জিন সিয়ক। একটা সময় মনে হতে থাকে যে ফিরে এসেছে সে আসলেই য়ু সিয়ক তো! রাতের বেলা তাকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয় জিন সিয়ক। ওদিকে ঘরের বন্ধ কক্ষ থেকে আসতে থাকে অদ্ভুত সব শব্দ।

মডার্ন থ্রিলার দর্শকেরা সরলরৈখিক গল্প উপস্থাপন পছন্দ করে না। এই সিনেমাটি প্লটের এমন একটা অবস্থায় শুরু হয়ে এগিয়ে গিয়েছে যে, আসলে দর্শকের ভবিষ্যত চিন্তুা করার অবকাশ ছিল খুবই কম। অবশ্য, চিন্তা করার মতো কিছু যে দেওয়া্ হয় নি, তা না। প্রচুর উপাদান ছিল। একটা বদ্ধ রুম ছিল, অপহরণ ছিল। কিন্তু সব উপাদানই কেমন যেন ভুল দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। যতই সময় গড়িয়েছে, কাহিনী নতুন ভাঁজ খুলেছে, ঘটনা মোড় নিয়েছে নতুন দিকে। একসময় হয়তো ভাবছি ওই বদ্ধ রুমটা অভিশপ্ত কোন রুম এখনই কিছু বেড়িয়ে আসবে কিন্তু হচ্ছে আরেকটা। অথবা ভাবছি অপহরণের পর য়ু-সিয়কের উপর কোন পরীক্ষা করা হয়নি তো? কিন্তু দেখা গেল গল্প তার আশে পাশে দিয়েও যায়নি। তার উপর পরিচালকের বড় মুন্সিয়ানা হলো, গল্পটা দুর্বোধ্য বা কঠিন মনে হয়নি কোনক্ষেত্রেই।

Forgotten-review-netflix-2017-2-1000x640

অভিনয় নিয়ে বলতে গেলে অবশ্যই আসবে ‘হ্যা-নিউল ক্যাং’এর নাম। অতিমাত্রার সংবেদনশীল জিন সিয়ক চরিত্রে অভিনয় মনে থাকবে দীর্ঘদিন। য়ু সিয়কের চরিত্রে ‘কিম মু-ইয়ুল’এর অভিনয় ছিল মোটামোটি। কোরিয়ান ‍সিনেমা অনেকক্ষেত্রেই দৃষ্টিসুখকর এর প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ঘরের আভ্যন্তরীন এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে। ‘ফরগটেন (২০১৭)’ও তার ব্যতিক্রম নয়। আলোকজ্জ্বল টোন দিয়ে সিনেমাটা শুরু করে ধীরে ধীরে কাহিনী অনুসারে ডার্ক টোনে্ এগিয়েছে। ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে।

স্ক্রিপ্ট আদতে শক্তিশালী মনে হলেও বেশ বড় একটা প্রশ্ন রয়ে গেছে সিনেমার শেষে। প্রশ্নটা এখানে উল্লেখ করলে স্পয়লার হয়ে যাবে, পুরো মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে তাই আর উল্লেখ করলাম না। দর্শক নিজেই নিজেকে করবেন সিনেমা শেষে। আরেকটা জিনিস না বললেই নয়, সিনেমা দেখার পর মনে হল পরিচালক যেন জোর করে সিনেমাকে একটা নির্দিষ্ট জেনারে বা ধরণে (জেনারের নাম উল্লেখ করলে সেটাও স্পয়লার হয়ে যাবে) নিয়ে আসতে চেয়েছেন। জোর করে নিয়ে আসলে যেটা হয়, গল্পের স্বাভাবিকতাটা নষ্ট হয়ে যায়। এখানে কিছু ক্ষেত্রে এমন মনে হয়েছে।

অবশ্য দিনশেষে একটা সিনেমা উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারছে কিনা সেটাই কথা। পরতে পরতে টুইস্ট দিয়ে এবং দর্শকের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এগিয়ে যাওয়া ‘ফরগটেন (২০১৭)’কে এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফলই বলা যায়।

লেখা: আশরাফ আবির

ছবি: নেটফ্লিক্স