বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র: অগ্রগতি ও সম্ভাবনা

উপনিবেশিক শাসনের ফলশ্রুতিতে জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে কিছুটা মিশ্রণ থাকলেও বায়ান্ন পরবর্তী সময়ের ইতিহাস কেবলই আমাদের। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও ৯ মাসের তীব্র সংগ্রাম শেষে বিজয় অর্জন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।56701aade82c9.jpgবিরল এক্ষেত্রে যে, এ যুদ্ধে ধণী গরিব, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে করেছে। অন্যায় অবিচার আর শোষণের মাত্রা যখন সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার উৎস ছিল একজন ব্যক্তি, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানmain-qimg-d8da4208c5f648922ab8197bf3fb6f44-c-e1534334861861.jpgতখনকার সময়ে তার বিভিন্ন ভাষণের রেকর্ড শুনে আজো আমরা সাহস পাই, শীরদাঁড়ায় বয়ে চলে বীরের রক্ত। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর ৪৭ বছরে এ মহান ব্যক্তিত্বের স্মরণে আমরা একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাতে পারি নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা কিংবা দৈন্যতা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো এই, বঙ্গবন্ধু নিজেই বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ইপিএফডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পারেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। অথচ এই প্রতিষ্ঠান থেকে আজও পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনী ভিত্তিক কোনো ছবি নির্মিত হয়নি।bfdc.jpgভারতের মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে নানা ভাষায় সিনেমা তৈরি হয়েছে, সুভাষ চন্দ্র বোসকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামকে নিয়েও সিনেমা বানিয়েছেন ভারতীয় পরিচালকেরা। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন কে নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ, সেখানে লিঙ্কনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডেনিয়েল ডে লুইসের মতো খ্যাতিমান অভিনেতা। গান্ধী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বেন কিংসলে। রূপালী পর্দায় নেলসন ম্যান্ডেলা হয়ে এসেছেন ড্যাঞ্জেল ওয়াশিংটন। অথচ বঙ্গবন্ধুর মতো এমন বৈচিত্র ও সংগ্রামী জীবনধারী মহান নেতার জীবন নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত না হওয়ার ব্যর্থতার ভারও আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন দেশীয় নির্মাতারা। বেশ কয়েক বছর আগে কবি ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সিনেমাটির নাম স্থির হয়েছিল, ‘দ্য পোয়েট অব পলিটিক্স’। বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করবেন এমনটিও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সিনেমাটি নির্মিত হয়নি। বাংলাদেশে জীবণীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত না হওয়ার সমস্যা চিহ্নিত করে চিত্রনাট্যকার শাহজাহান শামীম লিখেছেন, “নানা কারণে আমাদের দেশে এই ধরনের জীবনীভিত্তিক সিনেমা নির্মিত হয় না।

১. জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে প্রথমে দরকার হয় গবেষণার। আমাদের দেশে এই গবেষণা কাজের দারুণ অভাব। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে গবেষণা করার প্রচেষ্টা আছে। কিন্তু কাহিনীচিত্রে এই গবেষণা করার অভ্যাস নেই নির্মাতাদের।

২. যার জীবনী নিয়ে সিনেমা নির্মিত হবে তার অথবা তার পরিবারের আপত্তি থাকতে পারে। এই আপত্তিও অনেক সময় জীবনী অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণের বাধা।

৩. জীবনী নির্ভর চলচ্চিত্রকে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লোকজন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে করেন না। এ কারণে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে লগ্নি করার মতো প্রযোজক পাওয়া যায় না।

৪. জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে একটা বিশেষ সময় তুলে ধরতে হয়। এই সময়টা যত আগের হয়, তত বেশি বাজেট বাড়তে থাকে। ধরুন, আজকে থেকে ৩০০ বছর আগে জন্ম নেয়া কোন ব্যক্তির জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে হবে। ফলে পুরো পর্দায় যা কিছু দেখাতে হবে সবই হবে ৩০০ বছর আগের। পর্দায় ৩০০ বছর ফুটিয়ে তুলতে হলে শিল্প নির্দেশককে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ঘরের ভেতরে ব্যবহার্য সামগ্রী সবই হয়তো নতুন করে তৈরি করতে হবে। ফলে বেড়ে যাবে খরচ। এই বাড়তি খরচের জন্য অনেক সময় জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হননা নির্মাতারা।

৫. জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি করে। নির্মাণ করার পর প্রায়ই অভিযোগ ওঠে সিনেমায় যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। বিশেষত ঐ ব্যক্তির জীবনের ব্যক্তিগত ঘটনাগুলোর মধ্যে কোন নেতিবাচক ঘটনা থাকলে তা নিয়ে আপত্তি করে তার উত্তরাধিকারীগণ। এই আপত্তি অনেক সময় মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়ায়। এই ধরনের বিতর্ক এড়িয়ে থাকার জন্য নির্মাতারা জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র এড়িয়ে চলেন।

৬. একটা মানুষের জীবন মানে অনেক বড় সময়। চলচ্চিত্রের পরিধি সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিনঘণ্টার। এ কারণে ব্যক্তি জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ দিতে হয়। কেউ না কেউ এই বাদ দেয়া ঘটনাগুলো কেন বাদ দেয়া হল এই প্রশ্ন তুলতে পারেন। এই ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক নির্মাতার জন্য বিব্রতকর। এ কারণেও অনেক নির্মাতা এই ধরনের জীবনী এড়িয়ে চলেন।”



কিন্তু অপেক্ষার পালা বোধহয় শেষ হয়ে এলো, বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাজ এ বছরই শুরু হচ্ছে বলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানিয়েছেন। এ চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রায় দুই বছর আগে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও কাজ খুব বেশি অগ্রসর হয়নি, আলোচনার পর্যায়েই ছিল। সম্প্রতি এ বিষয়ে ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তারানা হালিম বলেন, “দ্রুত আমরা একটা টিম করে ভারতে পাঠাব, ভারতের একটি টিম বাংলাদেশে আসবে। তারা বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে এখানে গবেষণা করবে, এখানে তাদের বড় বড় চলচ্চিত্রকাররা আসবেন। বঙ্গবন্ধু ঘরে বাইরে কেমন ছিলেন তা নিয়ে গবেষণা করবেন।” বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে তিনজন্য খ্যাতিনাম নির্মাতার নামও প্রস্তাব করা হয়েছে- শ্যাম বেনেগাল, গৌতম ঘোষ এবং কৌশিক গাঙ্গুলী

বঙ্গবন্ধুকে সেলুলারে নিয়ে আসা একটি চ্যালেঞ্জ হবে এবং চলচ্চিত্রটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের, এরজন্য ব্যাপক গবেষণার কোন বিকল্প নেই।

এদিকে জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক আশরাফ শিশির এবার নির্মাণ করতে চলেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “৫৭০”। গত ৮ আগষ্ট বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে নিবন্ধনের মাধ্যমে ছবিটির কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী বছর ১৫ আগষ্ট দেশে ও দেশের বাইরে মুক্তি পাবে ছবিটি।13095811_10154815118535410_5666142537317400161_n.jpgএ বিষয়ে আশরাফ শিশির বলেন, “কোন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা থেকে এই ছবি নির্মাণের উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী এই মানুষটিকে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সেই শোক আমার শিশুমনে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। সেই শৈশবে আমাদের মফস্বল শহরে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক ১৫ আগষ্টে ছবি আঁকা আর ফটোকপি করে পত্রিকা বের করা ছিল তাঁরই বহিঃপ্রকাশ। তাই এই ছবির গল্প নির্মিত হয়েছে দিনের পর দিন, ভেতরে ভেতরে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এটাই হবে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ।” ছবিটির গল্প গড়ে উঠেছে মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টকে ঘিরে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় আসলে কি ঘটেছিল, তা সেলুলয়েডে তুলে আনার চেষ্টা করবেন নির্মাতা।

যাঁর দ্বারা কিংবা যেখান থেকেই নির্মিত হোক না কেন, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা অবশ্যই চাইবো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত ছবিটি হবে যেকোন প্রশ্নের উর্ধ্বে সেখানে থাকবেনা কোন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য, থাকবে না কোনো তথ্যের ঘাটতি। বঙ্গবন্ধু যেমন সব শ্রেণী নির্বিশেষে জনসাধারণের নেতা ছিলেন, তাঁর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রও সেই মানদন্ডে গণমানুষের চলচ্চিত্র হবে এটাই প্রত্যাশা। এমন একজন অভিনেতা তাঁর চরিত্রে অভিনয় করতে হবে, যিনি ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিজের ভেতর ধারণ করতে পারবেন, তার চালচলন-কথাবার্তা যথাসম্ভব রপ্ত করতে পারবেন, তাহলে দর্শক আদতে একজন বঙ্গবন্ধুকে সজীব পর্দায় দেখতে পাবে এবং ছবিটি যথেষ্ট সফল হবে বলেই বিশ্বাস।

চিত্রনাট্যকার শাহজাহান শামীম বলেন, “আমাদের দেশে সৃজনশীল মানুষেরা ব্যবসা করতে চান না। অন্য দিকে ব্যবসায়ীরা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির মতো সৃজনশীল পেশায় বিনিয়োগ করতে চান না। এ কারণে কারো জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ এখনও অনেক কঠিন বিষয় আমাদের জন্য।”

ব্যাপারটি যখন আর্থিক লাভ-লোকসানে আটকে যায় এমন সময়ে সরকারের এ ধরণের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। প্রত্যাশা একটাই, বঙ্গবন্ধুর পর এদেশের জাতীয় নেতাদের জীবন নিয়েও চলচ্চিত্র হতে থাকবে যা যুগের পর যুগ তরুণ প্রজন্মকে শেকড় চেনাবে আর মাথা উঁচু করে চলার সাহস ও শক্তি যোগাবে।

তথ্যসূত্র: আই-সিনে ম্যাগাজিন, এগিয়েচলো.কম, দি ডেইলি স্টার