রহস্যের ভাঁজে মোড়ানো অসাধারণ Ordeal By Innocence (2018)

আগাথা ক্রিস্টি, নামটাই যথেষ্ট। রহস্যপ্রেমী যে কোন পাঠক বলুন কিংবা দর্শক, এই নামটা সাথে আছে মানেই একটু নড়েচড়ে বসা। ক্রিস্টি যেন রেশমি সুতোয় বোনা ভাঁজে ভাঁজে বিছানো এক মায়াজাল, যার প্রতিটি পরতেই রয়েছে চমক। ধীরে ধীরে জালের গেরো খুলবে, দর্শক-পাঠকদের কাছে উন্মোচিত হতে থাকবে রহস্যের একেকটি করে অধ্যায়। তবে মূল চমকটা থাকবে একদম সবার শেষে- ‘পারফেক্ট স্যাটিসফায়িং এন্ডিং’। বিবিসি প্রোডাকশন মিনি সিরিজ ‘অর্ডিয়াল বাই ইনোসেন্স’(২০১৮) ও নজরে এসেছে ঠিক এই নামটারই কারণে, আগাথা ক্রিস্টি

Ordeal_by_Innocence_Poster_(2018)মূল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে ধনাঢ্য সমাজসেবী র‌্যাচেল আর্গাইল, তার স্বামী লিও এবং ৫ দত্তক সন্তানকে ঘিরে। নিজ বাড়িতে মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে খুন করা হয়েছে র‌্যাচেল আর্গাইলকে। সন্দেহের তীর পলাতক সন্তান জ্যাকের উপর। জ্যাককে দ্রুতই গ্রেফতার করা হয় কিন্তু জ্যাক বরাবরের মতোই অস্বীকার করে তার উপর আনা এই অভিযোগ। জ্যাক জানায় ঘটনার দিন রাতে খুনের আগেই বাড়ি থেকে সে বের হয়ে যায় এমনকি সে যে গাড়িতে ‘লিফট’ নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল, সে গাড়ির ড্রাইভারের বর্ণণাও সে দিতে থাকে। কিন্তু তার এই বক্তব্য ধোপে টিকে নি। বরং তার বিরুদ্ধে রয়েছে শক্ত প্রমাণ- র‌্যাচেল আর্গাইলের রক্তে জ্যাকের আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে জেলে থাকা অবস্থাতেই অন্য এক কয়েদীর সাথে মারামারি করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটে জ্যাকের।

গল্পটা শুরু হয়েছে র‌্যাচেলের মৃত্যুর ১৮ মাস পর থেকে। র‌্যাচেলের স্বামী লিও আবার বিয়ে করছেন তারই সেক্রেটারি গুয়েন্ডা ভনকে। ব্যাপারটা বাকি চার সৎ ভাইবোনদের মধ্যে মিশ্র পতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কেউ ভাবছেন খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে আবার কেউ ভাবছেন ঠিকই আছে। তবে যা-ই হোক- বিয়েটা হচ্ছেই। ঘটনা তখনই জমে যায়, যখন বিয়ের ঠিক দুদিন আগে বাড়িতে হাজির হয় অদ্ভূত এক লোক, ডক্টর ক্যালেগ্রি। সবার সামনে সে ঘোষণা দেয় সে-ই জ্যাকের ‘এলিবাই’, তার গাড়িতে করেই সেদিন রাতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল জ্যাক। আচমকা এমন একটি ঘটনায় অস্বস্থিতে পড়ে যায় পরিবারের সবাই। ডক্টর ক্যালেগ্রি যা বলছে সব কি ঠিক নাকি সে ধাপ্পা মারছে? যদি ঠিক হয়, যদি জ্যাক খুন না করে থাকে, তাহলে খুন করেছে কে?

MV5BOWZiZTBiZWYtN2YzMy00MDZmLTkzZjktOWY4NzJiMTk4ZDFlXkEyXkFqcGdeQXVyMjExMjk0ODk@._V1_SX1777_CR0,0,1777,491_AL_মডার্ন লাইফে ‘খুন’ ব্যাপারটা অনেক বেশীই সহজ হয়ে গিয়েছে মানুষের কাছে। দৈনন্দিন খবরে, সিনেমাগুলোতে, বইগুলোতেও এত বেশী ‘খুন’ যে, খুন মানে যে একটা মানুষের মৃত্যু সেটাই ভুলে যেতে বসি অনেক সময়। একজন মানুষ যখন বেঁচে থাকে, তার আশে পাশের মানুষদের সাথে একেকজনের সাথে একেক ধরণের সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। সেই মানুষের মৃত্যু মানে সেই সম্পর্কগুলোরও সমাপ্তি ঘটা। যার প্রভাব তাদের উপর পড়তে পারে বিভিন্নভাবে। আর তাইতো মৃত্যু ব্যাপারটাকে ‘ইজি’ বানিয়ে ফেলাতে আমার তাই ঘোরতর আপত্তি। মারমার কাটকাট ব্যাপারে না যেয়ে, একটা মৃত্যুকে ঘিরেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠা রহস্য কাহিনীই তাই আমার বেশী পছন্দ। আর আমার মতোন যারা আছেন, তাদের জন্য আদর্শ এক সিরিজ ‘অর্ডিয়াল বাই ইসনাসেন্স’।

obo 3১৯৫৮ সালে প্রকাশিত আগাথা ক্রিস্টির উপন্যাস ‘অর্ডিয়াল বাই ইনোসেন্স’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ৩ পর্বের এই মিনি সিরিজ। দুর্দান্ত স্ক্রিপ্টের সাথে অসাধারণ মেকিং যা দর্শকদের টেনে নিয়ে যাবে একদম শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। দৈর্ঘে্য অতো বড় না হওয়ায় অভিনয়ে কারোরই অতো একটা কিছু দেখানোর সুযোগ ছিলো না, সবার অভিনয়ই বেশ সাবলীল। তবে বরাবরের মতোই বিবিসির প্রোডাকশনে যে দুইটা জিনিস অসাধারণ হয়- এডিটিং এবং সিনেমাটোগ্রাফি, এখানেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক থাকলে ব্যাপারটা আরো জমতো নিঃসন্দেহে। এটা মিস করার মতোই একটা ব্যাপার ছিলো।

Obo 2সিরিজটা দেখার আগে একটা ব্যাপার বলে রাখি, এই সিরিজটার নাম যারা প্রথম শুনেছেন, তারা আইএমডিবিতে রেটিং দেখে হতাশ হবেন না। এই অকাজটা আগাথা ক্রিস্টির ফ্যানরাই করেছে। অবশ্য তাদের খুব একটা দোষও দেওয়া যাবে না। তারা তো আগাথা ক্রিস্টির উপন্যাসের ‘এডাপটেশন’ দেখবে বলেই আশা করেছিল কিন্তু সিরিজটার এন্ডিং যখন বইয়ের সাথে কোন মিলই রাখলো না, সব ক্ষোভ তারা এভাবেই ঝাড়লেন। অবশ্য আপনি যদি উপন্যাসটি না পড়ে থাকেন, এসব ব্যাপার আপনাকে ভাবাবে না কোনভাবেই। স্ক্রিপ্টরাইটার সারাহ ফেলপস যে ‘সমাপ্তি’ টেনেছেন, খারাপ লাগার প্রশ্ন তো আসেই না, বরং কিছুক্ষেত্রে তূলনামূলকভাবে ভালোও লাগতে পারে। সে যা-ই হোক, উপন্যাসটি পড়ে থাকুন কিংবা না থাকুন, রহস্যের ভাঁজে মোড়া ‘অর্ডিয়াল বাই ইনোসেন্স’(২০১৮) কোনভাবেই মিস করতে চাইবেননা রহস্যপ্রেমীরা।

লেখা: আশরাফ আবির, চলচ্চিত্রকার

ছবি সংগ্রহ: BBC