চলচ্চিত্রে আমজাদ হোসেন একজনই ছিলেন

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনয়শিল্পী ও লেখক আমজাদ হোসেন মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ৫৭ মিনিটে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৪ আগস্ট ১৯৪২ এ জন্ম নেয়া আমজাদ হোসেনের বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত।

img_3425১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া তিনি আরও ১৪ বার জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার।

পরিচালক আমজাদ হোসেনের জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’, ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ইত্যাদি।

 

গোলাপী এখন ট্রেনে চলচ্চিত্রের নায়িকা ববিতা বলেন, আমি শুনে খুবই মর্মাহত। আমজাদ ভাইয়ের বেশির ভাগ ছবি করেছিলাম আমি, যেগুলো ছিল মাইলস্টোন। আমজাদ ভাইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তাঁর ছবি যেমন পুরস্কৃত হতো, তেমনি বাণিজ্যিকভাবেও আয় করত। মৃণাল সেন পর্যন্ত তাঁর ছবির সাংঘাতিক প্রশংসা করেছেন। চলচ্চিত্রে আমজাদ হোসেন একজনই ছিলেন।

img_3418

গীতিকার আমজাদ হোসেন
আমজাদ হোসেন অনেক বিখ্যাত গানের গীতিকার। ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘আমি আছি থাকব ভালোবেসে মরব’, ‘হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ’, ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিলো না’, ‘চুল ধইরো না খোঁপা খুলে যাবে গো’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘বাবা বলে গেলো আর কোনো দিন গান করো না’, ‘এমন তো প্রেম হয়’সহ বহু গান তিনি লিখেছেন।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনেক চলচ্চিত্রের জন্য বিখ্যাত হয়েছেন তিনি। নির্মাণের বাইরে বেশ কিছু চলচ্চিত্রে গানও লিখেছেন। কালজয়ী সেসব গানের মধ্যে রয়েছে- ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো/আমার নয়ন দুটি জলে ভাসতো আর ভালোবাসতো’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ ছবির এই গানের সুরকার আলাউদ্দিন আলী। কণ্ঠ দিয়েছেন সৈয়দ আবদুল হাদী ও সামিনা চৌধুরী। ‘দুই পয়সার আলতা’ চলচ্চিত্রের একটি গান ‘আমি হবো পর যেদিন আসবে রে তোর বর/ আমার এ ঘর শূন্য করে যাবি অন্য ঘর’- আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। ‘বাবা বলে গেল আর কোনো দিন গান করো না’ শীর্ষক ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ ছবির গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দিবা। সুরকার আলাউদ্দিন আলী। ‘কেউ কোনো দিন আমারে তো কথা দিল না’- আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘সুন্দরী’ ছবির এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। এমন আরো অনেক গান আছে যেগুলো শ্রোতারা অসংখ্যবার শুনেছেন।

আমজাদ হোসেনের লিখা জনপ্রিয় গানগুলোর শিল্পী সামিনা চৌধুরী ফেসবুকে দেয়া এক শোকবার্তায় বলেন, আমার ফিল্মের সঙ্গীত জীবনের শুরু যাঁর লিখা যাঁর ভালবাসায়- ‘একবার যদি কেউ ভালো বাসতো’ কিংবা ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’- প্রিয় আমজাদ চাচা। আল্লাহ্ ওঁনাকে ভালো জায়গায় রাখুন। আমিন।

তিনি একজন বহুমুখী প্রতিভার চলচ্চিত্রকার ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্রে গল্প লিখতেন, গান লিখতেন, অভিনয় করতেন, পরিচালনা করতেন। তাঁর চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের গান এখনো মানুষের মুখে মুখে। বাংলাদেশের গুণধর চলচ্চিত্রকার হিসেবে জহির রায়হান, খান আতাউর রহমানের পরেই তাঁর নামটি বলা যায়। আমজাদ হোসেন আমাদের চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেও সময় পেলে বিএফডিসিতে চলে আসতেন। সবার সঙ্গে বসে আড্ডা দিতেন। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন।


উল্লেখ্য, তার পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিটি ৪ দশক ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের রেকর্ড ধরে রেখেছিল। এর পর ‘ভাত দে’ ছবিটি ৯টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তার লেখক সত্তাও সমানভাবে সক্রিয়। লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, জীবনী, ইতিহাসসহ বিভিন্ন গ্রন্থ। এর মধ্যে উপন্যাস ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’, ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা’, ‘আমি এবং কয়েকটি পোস্টার’, ‘রক্তের ডালপালা’, ‘ফুল বাতাসী’, ‘রাম রহিম’; মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস-‘যুদ্ধে যাবো’, ‘উত্তরকাল’, ‘যুদ্ধযাত্রার রাত্রি’, জীবনীগ্রন্থ- ‘মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি’, ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবন ও রাজনীতি’, কিশোর উপন্যাস-‘জন্মদিনের ক্যামেরা’, ‘যাদুর পায়রা’, ‘ভূতের রাণী হিমানী’, ‘সাত ভূতের রাজনীতি’, গল্পগ্রন্থ- ‘পরী নামা জোছনায় বৃষ্টি’, ‘কৃষ্ণলীলা’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও তিনি ছোটদের জন্য ছড়া ও গল্প লিখেছেন। শুধু চলচ্চিত্রই নয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন গুণী নাট্যনির্মাতা ও অভিনেতা হিসেবেও ছিল তার সুনাম। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের নাটক বলতে ছিল আমজাদ হোসেনের লেখা, পরিচালনা ও অভিনয়ে ‘জব্বার আলী’ নাটকটি; যা সেই সময়ে বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন জব্বার আলী চরিত্রে। নাট্যকার হিসেবে টেলিভিশনের প্রথম রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও পায় এই নাটক।


কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার, অভিনয়শিল্পী এবং লেখক আমজাদ হোসেন মৃত্যুকালে স্ত্রী, চার ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় গত ১৮ নভেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আমজাদ হোসেনকে। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শুরু থেকেই তাঁকে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বাংলাদেশের বরেণ্য এই নির্মাতার শারীরিক অসুস্থতার খবর শুনে হাসপাতালে ভর্তির তিন দিনের মাথায় তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমজাদ হোসেনের উন্নত চিকিৎসার খরচ বাবদ ২০ লাখ টাকা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাবদ ২২ লাখ টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেন তিনি।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় আমজাদ হোসেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক নেওয়া হয়। ২৭ নভেম্বর মধ্যরাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানে তিনি প্রখ্যাত নিউরোসার্জন টিরা ট্যাংভিরিয়াপাইবুনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

তথ্যসূত্র: প্রথমআলো, মানবজমিন, উইকিপিডিয়া