মেধাবী মানুষ সাইদুল আনাম টুটুল জন্মেছিলেন এমন দেশে, যেই দেশটি সিনেমা-বান্ধব নয়

আমাদের দেশ থেকে অনেকেই চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়তে গেছেন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। চলচ্চিত্র পরিচালনা বা সম্পাদনার মতো বিষয় পড়ে এসেছেন। তারপর দেশে এসে তারা কিছুই করতে পারেন নাই। সিনেমা না বানাতে পেরে কেউ কেউ বিজ্ঞাপন নির্মাতা হয়ে গেছেন। কেউ অন্য কোন পেশায় ব্যস্ত হয়েছেন। জীবন ধারণ করার জন্য সবাইকেই টাকা কামাতে হয়।

অথচ এই রকম হওয়ার কথা ছিল না। সিনেমায় পড়াশোনা করা লোকের উপরই টাকা বিনিয়োগ করা স্বাভাবিক ছিল। বাস্তব কথা হল, আমাদের দেশে যারা সিনেমায় বিনিয়োগ করেন, তারা শিক্ষিত লোকদের এড়িয়ে চলেন। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে তারা কাজ না জানা লোকদের উপর নির্ভর করেন। কিন্তু সিনেমায় পড়াশোনা করে আসা লোকদের দুই পয়সা দিয়েও মূল্যায়ন করেন না।

এ কারণেই আমাদের সিনেমা জগতকে একটা লম্বা সময় ‘অশ্লীল যুগ’ পার করতে হয়েছে। ইউটিউবে ‘বাংলা সিনেমা’ লিখে সার্চ দিলে যে সব ভিডিও আসে, তা দেখে আমাদের দেশ ও সিনেমা সম্পর্কে যে কোন বিদেশী জঘন্য ধারণা পোষণ করতে পারেন।

এই একই কারণে আমাদের অনেক মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মাত্র ২ বা ৪টি সিনেমা বানিয়েই জীবন পার করে দিতে হয়েছে। কেউ কেউ সেই সুযোগও পান নি। চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান না থাকলে অনেকে হয়তো কোন দিনও একটা সিনেমাও বানাতে পারতেন না।

আমাদের দেশে যারা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়, তাদের কেউ গণনায় ধরে না। জাতীয় পুরস্কার পেলে কোন প্রযোজক বলে না, আসেন, আপনার পরবর্তী সিনেমায় আমি বিনিয়োগ করব। বরং এমন শুনেছি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলে তার কপাল পোড়ে। তার কপালে আর প্রযোজক জোটে না।

অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। সিনেমায় পড়াশোনা করে আসা মেধাবী নির্মাতার উপর বিনিয়োগ করা উচিত ছিল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতা পরিচালকের বাড়িতে প্রযোজকের লাইন লাগা উচিত ছিল। হয় নাই, হবেও না। এ কারণেই আমাদের সিনেমা শিল্পে মেধাহীন মানুষের দৌরাত্ম থেকেই যাবে।

এত কথা কেন বলছি?

আজকে একজন মেধাবী পরিচালক সাইদুল আনাম টুটুল না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে চলচ্চিত্র সম্পাদনার উপর পড়াশোনা করে এসেছিলেন। তার সম্পাদনার তালিকায় দেশের সেরা সিনেমাগুলো। তারপরও সারা জীবনে তিনি মাত্র একটা সিনেমা বানাতে পেরেছেন। সরকারি অনুদান না পেলে সেটাও বানাতে পারতেন না।

আরেকটা সরকারি অনুদান পেয়েছিলেন। সিনেমার কাজও ৯০% শেষ করেছেন। কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

কী নিদারুণ এক মাস এটা! আনোয়ার ভাইয়ের স্মরণসভায় আনোয়ার ভাইকে স্মরণ করলেন ৫ ডিসেম্বর… আজ ১৮ ডিসেম্বর চলে গেলেন চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্র সম্পাদক, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল আনাম টুটুল।

ছবি ও ক্যাপশন: বেলায়াত হোসাইন মামুন, চলচ্চিত্রকর্মী ও সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ

সাইদুল আনাম টুটুলের জন্ম ১৯৫০ সালের ১ এপ্রিল পুরান ঢাকায়। সরকারি মুসলিম স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৭১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে যুক্ত হন।

১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিও তাতে যোগ দেন। ৬ নম্বর সেক্টরের আওতায় খুলনা অঞ্চলে সম্মুখ সমরে অংশ নেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ; কিন্তু তার ঝোঁক ছিল চলচ্চিত্রেই।

১৯৭৪ সালে ভারতের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান পুনের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। সেখানে চলচ্চিত্র সম্পাদনার উপর পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

১৯৭৯ সালে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রে কাজ করে শ্রেষ্ঠ চিত্র সম্পাদক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ‘ঘুড্ডি’, ‘দহন’, ‘দীপু নাম্বার টু’ ও ‘দুখাই’র মতো চলচ্চিত্র সম্পাদনাও করেন তিনি। গড়ে তোলেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আকর’।

সরকারি অনুদানে নির্মিত সাইদুল আনাম টুটুলের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আধিয়ার’ মুক্তি পায় ২০০৩ সালে।

কালবেলা নামে নিজের নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি অনুদান পান তিনি। তার কাজই করছিলেন।

নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিষয় শিক্ষকের কাজও করতেন টুটুল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স ও চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি চলচ্চিত্র ভাষা ও চলচ্চিত্র সম্পাদনা বিষয়ে পাঠদান করতেন।

তিনি টেলিভিশনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অনেক নাটক তৈরি করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নাল পিরান, বখাটে, সেকু সেকান্দর, ৫২ গলির এক গলি, আপন পর, গোবর চোর, হেলিকপ্টার, নিশিকাব্য, অপরাজিতা।

তিনি বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের ধারায়ও প্রভূত পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি প্রায় চার শতাধিক বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছেন।

সাইদুল আনাম টুটুল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। কিন্তু তিনি এমন দেশে জন্মেছিলেন, যেই দেশটি সিনেমা-বান্ধব নয়। এই দেশে গুণী ও মেধাবী মানুষের কোন মূল্য নাই।

আপনার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা, স্যার।

—-

ফেসবুকে প্রকাশিত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার শাহজাহান শামীম এর শোকবার্তা