হলিউড: জাতীয় নিরাপত্তার নামে আতঙ্ক ও সম্মতি উৎপাদন

হলিউডের রাজনীতি নিষ্কৃতিহীনভাবে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, আর জাতীয় নিরাপত্তার নামে মস্তিষ্কে অবিরাম ফেলে যাচ্ছে দুই ধরনের বোমা– আতঙ্ক বোমা ও অন্য দেশে হামলা চালানোর ব্যাপারে সম্মতি আদায়ের বোমাÑবিশেষ ধরনের চলচ্চিত্রগুলো দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও হলিউড বিষয়ক গবেষক ফরাসি বংশোদ্ভুত জঁ-মিশেল ভ্যালানতাঁ এই কথার পক্ষেই ওকালতি করেছেন তাঁর ‘হলিউড, দ্য পেন্টাগন অ্যান্ড ওয়াশিংটন’ বইটিতে।
ভ্যালানতাঁ বলছেন, মার্কিন চালচ্চৈত্রিক ঐতিহ্যের ভেতরেই প্রোথিত আছে জাতীয়তাবাদী বিষয়আশয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। যেমন ধরুন ওয়েস্টার্ন ছবি, যেখানে দেখানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গদের শেকড় বিস্তারের ইতিহাস, আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের খলনায়ক বানিয়ে সেসব ছবিতে নির্মাণ করা হয় সফেদ আমেরিকার জাতীয় পরিচয়। আরেক ধরনের চলচ্চিত্র হয়, যাকে ভ্যালানতাঁ বেশ যুৎসই নাম দিয়েছেন, সেটা হলো: জাতীয় নিরাপত্তা সিনেমা (National security cinema), এই চরিত্রের সিনেমায়– গোয়েন্দা কাহিনী, যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি, কল্পবিজ্ঞান বা ফ্যান্টাসি– যাই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এগুলো প্রচার করে যুক্তরাষ্টের জাতীয় নিরাপত্তা ভীষণ হুমকির মুখে, যে কোন মুহূর্তে বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত ও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মার্কিন মুলুক, তাই এখনই হোক বা ভবিষ্যতে, অপরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও শক্তি ব্যবহার করার ব্যাপারটি বৈধ ও যুক্তিযুক্ত।

গোটা দেশটিই যেন একটি জুজুর ভয়ে তাড়িত সর্বক্ষণ, অন্তত ‘জাতীয় নিরাপত্তা চলচ্চিত্র’ দেখলে আপনার তাই মনে হবে– কখনো বা রেড ইন্ডিয়ান, কখনো বা সোভিয়েত সমাজতন্ত্র, কখনো উত্তর কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, কখনো আবার ভিনদেশের সন্ত্রাসী বা ভিনগ্রহের এলিয়েন– একটা ‘হুমকি’ যেন ঘাড়ের ওপর সারাক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের। এমনটাই প্রমাণে উঠেপড়ে লেগে থাকে জাতীয় নিরাপত্তা সিনেমা কারখানা ও মার্কিন সরকার। এটার পেছনে একটা কারণ ব্যবসায়িক হলেও, মূল বিষয়টি আদতে রাজনৈতিক। এধরনের ষড়যন্ত্রবিরোধী, বীরত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের বাজার কাটতি আছে, সেটা থাকার পেছনেও রয়েছে মার্কিন রাজনীতি। কারণ তারা প্রত্যেক আমলেই কোন না কোন জুজু তৈরি করে ফেলে এবং দেশটির জনগণ সেই জুজুকে বিশ্বাসও করে। জুজুর চাষাবাদকে পোক্ত করতে মার্কিন সরকার সবধরনের সহায়তা করে হলিউডকে। পেন্টাগনের দ্বারা ওয়াশিংটন ও হলিউডের এই দোস্তি বেশ পুরনো এবং ভালো রকমভাবেই কার্যকর। আর এই চর্চার ভেতর দিয়েই মার্কিনীদের সংস্কৃতি ফুটে ওঠে প্রকটভাবে। তারা যুদ্ধপ্রিয় জাতি। নিজের নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র তাদের রাখা চাই-ই চাই, অন্যের বন্দুকের গুলিতে নিজের সন্তান মারা গেলেও তারা অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে নারাজ। এর কারণ তারা সবসময় একটা আতঙ্কের ভেতর থাকে। এই বুঝি কেউ হামলে পড়লো তাদের ওপর।

এই মনোভাব তো আছেই, দেশটির সরকারও যেন জনগণকে একটা ‘ভয়ে’র ভেতর রাখতে চায়। তারা চায় মানুষের আতঙ্ককে পুঁজি করে মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ায় যে নানা ধরনের জোরজবরদস্তিমূলক কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে, সেটার একটা নৈতিক সমর্থন নিজের সমাজ থেকে আদায় করে নিতে। এই সমর্থন তো আর বলেকয়ে হবে না, তাই চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয়, দ্বারস্থ হতে হয় হলিউডের। শুকনো কথায় যেমন চিড়ে ভেজে না, তেমনি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে সমর্থন তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই চিড়ে ভেজাতে প্রয়োজন পরিমাণ মতো আবেগ ও কৌশল। এই চিড়ে ভেজানো রস সরবরাহ করে হলিউড। এতে মার্কিন সরকার ও হলিউড উভয়েরই লাভ, কারণ এই লাভজনক করমর্দনে তেল আছে, কড়ি তো আছেই।

বাস্তবের দুনিয়ায় ও চলচ্চিত্রে তৈরিকৃত বাস্তবতায় কল্পিত জুজুর প্রভাবকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস, পেন্টাগন ও হলিউডের যে ভূমিকা সেটা স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ দেশটির কোন বৈরি প্রতিবেশী নেই (যেমন ভারতের আছে পাকিস্তান), প্রশান্ত ও অতলান্তিক দিয়ে পরিবেষ্টিত যুক্তরাষ্ট্রকে বলা যায় গোটা পৃথিবী থেকে একটু বিচ্ছিন্নই, আর কোন বহির্শক্তিই দেশটিকে কখনো দখল করেনি। কাজেই বাস্তবে নানা সময়ে লেনিন, স্তালিন, সাদ্দাম হোসেন, ওসামা বিন লাদেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইদি আমিন নামগুলোকে ‘জুজু’ আকারে যেভাবে মার্কিন সরকার হাজির করেছে জনগণের সামনে, হলিউড সেটারই প্রতিধ্বনি করেছে দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। এমন কল্পিত হুমকির ভেতর দিয়েই কয়েক যুগ ধরে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভাবনা চিন্তার গঠন ও পুনর্গঠন। এর বাতাবরণেই তৈরি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনৈতিক পরিচিতি।

2.jpg

সকলেই জানে ক্ষণে ক্ষণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, সেগুলোর অনেকগুলোর পেছনেই রয়েছে স্যাম চাচার আশীর্বাদ। আমরা সকলেই তালেবান, আলকায়েদা বা আইএসের মতো জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ও সমর্থনের ইতিহাস জানি। তো মোড়লগিরি, অস্ত্র বিক্রি ও খনিজ সম্পদ পাওয়ার লোভে যুক্তরাষ্ট্র যুগের পর যুগ ‘আতঙ্ক ও হুমকি’ উৎপাদন করে চলেছে, নিজের দেশে তো বটেই, বিদেশেও, সেখানে মোটামুটি সার্বক্ষণিকের সাথী হয়ে রয়েছে হলিউড।
গবেষক ভ্যালানতাঁ আলাপে আলাপে দেখাচ্ছেন পঞ্চাশের দশকে হলিউড সোভিয়েত বা সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত হুমকি তৈরি করেছে দুটি ধাপে: বহিরাগতরা উচ্ছেদ করছে আমেরিকার ছোট শহরের নাগরিকদের, অথবা অদ্ভুত দর্শন সব জন্তু ভীষণ শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর, ‘দ্য ইনভেশন অব দ্য বডিস্ন্যাচার্স’ (১৯৫৬) ছবিতে যেমনটা দেখানো হয়েছে। এই ধরনের ছবিগুলোতে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন রূপক আকারেই হাজির থাকতো, তবে এখন শত্রু বদলেছে, তাই ছবির কাহিনী প্রায় একই রকম থাকলেও ‘খলনায়ক’ হচ্ছে অন্য কেউ। বর্তমানের ছবিগুলোতে দেখা যায় একদল সন্ত্রাসী হয় তো হামলা করে বসছে সিআইএ পরিচালকের ওপর, ফিলিপ নয়েসের ‘প্যাট্রিয়ট গেমস’ (১৯৯২) ছবিতে যেমন, অথবা এক মিডিয়া মুগল চায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাক, এতে তার ব্যবসা ফুলেফেপে উঠবে, এটা রজার স্পটিসউড পরিচালিত বন্ড ছবি ‘টুমরো নেভার ডাইজ’ (১৯৯৭)-এর কাহিনী। এই ছবিতে বন্ড চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পিয়ার্স ব্রসন্যান।
শুদ্ধ দেশের বাইরে থেকে নয়, হুমকি সৃষ্টি হতে পারে দেশের মাটিতেও, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো, যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ত্রুটিযুক্ত হয় এবং ক্ষমতাধারীর কোন সমান বিরোধী শক্তি থাকে না, তখন রাষ্ট্র স্বয়ং হয়ে ওঠে নিজের সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ, এক্ষেত্রে বলা যায় জেমস ক্যামেরনের ‘টার্মিনেটর’ (১৯৮৪) ছবিটির কথা। আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার অভিনীত এই ছবিতে দেখা যায় মানুষেরই সৃষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে এক পারমানিক যুদ্ধের ছক আঁকছে রাশিয়ার সঙ্গে, যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করা হবে খোদ মানবজাতিকেই। যন্ত্রমানবদের এই চিন্তায় বাধ সাধবে মানবজাতির একজন। তার জন্ম ঠেকাতে তার মাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা আঁটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরকার। সেজন্য তারা ২০২৯ সাল থেকে একটি রোবটকে পাঠায় ১৯৮৪ সালের পৃথিবীতে। এটাই এই ছবির কাহিনী। এখানেও দেখবেন ভবিষ্যতের মারনাস্ত্রের প্রদর্শনী ও আতঙ্কের উৎপাদন। যদিও যন্ত্রমানবদের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রেই দেখানো হয়েছে, তারপরও তো তারা মানুষের ‘পরকিয়া’ অর্থাৎ এলিয়েন। এই পরভীতিকে যেন ধ্রুবতারা করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ওরফে হলিউড।

আতঙ্ক উৎপাদনের পাশাপাশি নিজেদের সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি ও শৌর্যবীর্য দেখানোর জন্য বা বলা যায় বিনা বল প্রয়োগে সম্মতি আদায় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চলচ্চিত্রের চেয়ে আর কোন ভালো বিকল্প মাধ্যম এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। চলচ্চিত্র মানুষের অচেতনে ঢুকে সুচারুভাবে তার চিন্তাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। শিল্পমাধ্যমটির এই অপরিসীম ক্ষমতার কথা দুই নম্বর বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই আন্দাজ করতে পারে মার্কিন সরকার। তাই ১৯৪২ সালে হোয়াইট হাউজে তৎকালের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দাওয়াত করেন জন ফোর্ড, ফ্র্যাঙ্ক কাপরার মতো হলিউডের বড় তারকা পরিচালকদের। উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মনে এটা ঢুকিয়ে দেয়া যেÑ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে কোন সময়ে অস্ত্র তুলে নিতে হবে, রাষ্ট্র হুমকির মুখে। এই দাওয়াতি কার্যক্রমের পরপরই মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয় হলিউডে একটি অংশীদারিত্বমূলক কার্যালয় খুলে বসে। রাশিয়ার সঙ্গে ঠান্ডাযুদ্ধের সুযোগে ১৯৪৭ সালে এই কার্যালয়টি পাকাপাকিভাবে বসে যায় হলিউডে। এদের তখন প্রধান কাজ ছিল ছবির মাধ্যমে সোভিয়েত হুমকি ও তাকে পরাজিত করার বার্তা প্রচার করা এবং এর মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাকে সুসংহত করা।
চলচ্চিত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তাজনিত যে ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে, সেটির কারণে সেসময় ও পরে দেশটির সাধারণ জনগণের মতামতকে সরকার ও সামরিক হর্তকর্তারা ইচ্ছামাফিক পরিচালিত করতে পেরেছিলেন, করতে পেরেছিলেন প্রভাবিত। এই প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে।
জেমস ক্যামেরন, জন মিলিউস, জন ম্যাকটিয়েরনান, রিচার্ড ডোনার, টনি স্কট, এডোয়ার্ড জুইক, অলিভার স্টোন ও ফিলিপ নয়েসের মতো পরিচালকেরা আশি ও নব্বইয়ের দশকে আলোচিত জঁরের ছবি অর্থাৎ ‘জাতীয় নিরাপত্তা চলচ্চিত্র’ বানিয়ে মার্কিন সরকারের প্রচারযন্ত্র রূপে কাজ করেছেন। তাঁদের নির্মিত ছবিগুলো কমবেশি সকলেরই দেখা, যেমন: র‌্যাম্বো-২ (১৯৮৫) ও র‌্যাম্বো-৩ (১৯৮৮), এলিয়েন্স (১৯৮৬), টপ গান (১৯৮৬), প্রেডেটর (১৯৮৭), ডাই হার্ড (১৯৮৮), গ্লোরি (১৯৯০), দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর (১৯৯০) ইত্যাদি। এসব ছবিতে ‘একাই একশ’ ধরনের নায়কেরা উদয় হন জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। সিলভেস্টার স্ট্যালন, আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, চাক নরিস, স্টিভ সিগাল, ব্রুস উইলিস, মেল গিবসন, সিগর্নি উইভার, ডেনজেল ওয়াশিংটন, মর্গান ফ্রিম্যান, বেন অ্যাফ্লেক সহ কে নেই যে এই ধরনের ‘দেশপ্রেমিক’ নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেননি? তাঁদের তারকা ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে শুধু যে যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার নানাদিক নিশ্চিত ও অস্ত্র ব্যবসার পথ সুগম করেছে তা কিন্তু নয়, অনেক সময় সেনা সংগ্রহের মতো কাজও করেছে।
আশির দশকে মার্কিন নৌবাহিনী যখন সেনা সংকটে পড়ে, তখন তারা চলচ্চিত্রের সহায়তা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। টনি স্কটের ‘টপ গান’ (১৯৮৬) ছবির ওপর নাজেল হয় তারা এবং তাদের যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ, বিমান ও চালক সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেয়। এর বদলে তারা চায় ছবিতে তাদের মাহাত্মকে প্রচার করতে, যেন তরুণরা নৌবাহিনীতে যোগ দিতে আকৃষ্টবোধ করে। চলচ্চিত্র সেভাবেই বানানো হয় এবং পর সমাচার এই যে নৌবাহিনীর মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়েছিল।
নৌবাহিনীকে কেন শুধু রূপালি পর্দায় উজ্জ্বল দেখা যাবে, এই প্রচারের দৌঁড়ে তখন সামিল হয় অন্য বাহিনীগুলোও, মানে পদাতিক ও বিমান বাহিনী। তারাও নিজেদের শক্তিমত্তা ও বীরত্ব প্রচার করতে চায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। রোলান্ড এমেরিক পরিচালিত ‘ইন্ডেপেন্ডেন্স ডে’ (১৯৯৬) ছবিতে আমরা দেখেছি মার্কিন বিমান বাহিনীর কারিশমা। জান বাজি রেখে তারা দুনিয়াকে রক্ষা করে পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা বহির্শত্রুদের হাত থেকে। এই ছবিতে নায়কের চরিত্রে আমরা দেখি উইল স্মিথকে।
নিজের নাম প্রচার নিয়ে কাঙালপনার আরেকটি উদাহরণ দেয়া যায় মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড এল রবের ‘অপারেশন হলিউড’ বইটি থেকে। সেখানে রব শোনাচ্ছেন ‘জুরাসিক পার্ক ৩’ ছবির নেপথ্যের কাহিনী। ছবিটির প্রাথমিক চিত্রনাট্য অনুযায়ী শেষ দৃশ্যে একটি হেলিকপ্টার পাঠানো হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে, ডাইনোসরদের দ্বীপ থেকে ছবির চরিত্রদের উদ্ধারের জন্য। তবে শেষের এই দৃশ্যটি সাদামাটা লাগলো প্রযোজকের কাছে। তাই তিনি ঠিক করলেন এখানে নৌবাহিনী ও মেরিন সেনাদের দিয়ে মারকুটে একটা দৃশ্য করবেন। ভাবনা অনুযায়ী সহায়তা চাওয়া হলো লস এঞ্জেলেসে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর চলচ্চিত্র বিষয়ক মূল অধিদপ্তরে।
পেন্টাগন দুটি এসএইচ সিহক হেলিকপ্টারসহ লোকলস্কর, চারটি উভচর গাড়ি ও আশিজন মেরিন সেনাকে সাতদিনের জন্য শুটিং করার অনুমতি দিলো, কিন্তু এর পরিবর্তে তারা চিত্রনাট্যে একটি সংলাপও জুড়ে দিতে বললো, তাতে যেন মেরিন সেনাদের কথা থাকে। শুধু তাই নয়, ছবিতে যেন স্পষ্ট করে মেরিনদের লোগোটাও দেখা যায়, এমন অনুরোধও থাকলো। ঠিক অনুরোধ না বলে, বলা ভালো পেন্টাগন চাপ দিলো। কাজেই ছবির শেষে দেখা গেলো ছবির চরিত্রদের উদ্ধারে যখন মার্কিন মেরিন সেনারা হাজির হয়, তখন এরিক নামের চরিত্রটি ডক্টর গ্র্যান্টকে বলছে, ‘আপনার এখন উনাকে (লরা ডার্ন) ধন্যবাদ দিতেই হবে। তিনিই নেভি আর মেরিন পাঠিয়েছেন।’ ছবির শেষে যখন হেলিকপ্টার উড়ে চলে যাচ্ছে তখন জ্বলজ্বল করতে থাকে মেরিন বাহিনীর লোগো।
মেরিন বাহিনী নিয়ে আরো একটি ‘নিজের ঢোল পেটানো’ ধরনের ছবি হলো ‘টিয়ার্স অব দ্য সান’ (২০০৩)। জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল এই ছবিতে আমরা দেখি নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে যায় মেরিন সেনারা। তারা শুধু একজন চিকিৎসককেই উদ্ধার করেনা, সঙ্গে সদ্য নিহত রাষ্ট্রপতির ছেলেকেও নিরাপদে প্রতিবেশী দেশে পৌঁছে দেয়। সাধারণ মানুষের মনে আবার আশার সঞ্চার হয়। এই ছবিতে অভিনয় করেন ব্রুস উইলিস ও মনিকা বেলুচি। অন্য দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় গুটি কয়েক মেরিন সেনার অবদানকে এখানে মহিমান্বিত করা হয়।
‘অ্যাক্ট অব ভ্যালর’ (২০১২) ছবিতেও একই কৌশল অবলম্বন করে মেরিনকে দেখানো হয় ত্রাতা হিসেবে। ছবির কাহিনীতে বলা হয় ভয়াবহ নীল নকশা সাজানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর জন্য। মার্কিন নেভি সিলের সদস্যরা এই চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। এরকম আরো হাজারো উদাহরণ দেয়া যাবে। যার সবই মার্কিন সেনাবাহিনীর মাহাত্ম প্রচারের ছবি, প্রযোজকদের সামরিক নানা ‘খেলনাপাতি’ ধার দিয়ে রূপালি পর্দায় নিজেদের উপস্থিতির জানান দিতে চাওয়ার গল্প।
এই যে হলিউডে সেনা, গুপ্তচর, গোয়েন্দা, পুলিশ ইত্যাদি সরকারি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সহযোগিতা করে এবং পরিবর্তে উল্টো সুবিধা গ্রহণ করে তা নিয়ে সাংবাদিক রব চমৎকার একটি কথা বলেছেনÑ চলচ্চিত্রে যখন কোন কোম্পানি অর্থ দেয় তাদের কোন পণ্য প্রদর্শনের জন্য, তখন তাকে বলে ‘প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট’। আর যখন ছবিতে সামরিক বাহিনীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য প্রযোজককে প্রণোদনা দেয় সরকার, তখন তাকে বলে ‘প্রোপাগান্ডা’।
প্রোপাগান্ডা বা প্রচারের ঢোল বাজানোর পেছনের কারণ সেই কয়েকটাই, অন্যদের মনের ভেতর আতঙ্কের বীজ বুনে সেখানে জল ঢালা, আর বিশ্ব দরবারে নিজেদের ক্ষমতাধর হিসেবে জাহির করা। নিজেদের বীর হিসেবে হাজির করার চেষ্টা যে সবসময় নিষ্কণ্টক হয়, তা কিন্তু নয়। যেমন ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ (২০০১) ছবিটির কথাই ধরা যাক। ছবিতে দেখা যায়, মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ দল সোমালিয়া যায়, সেখানকার ‘অমানবিক’ সরকারকে হারিয়ে দিয়ে তারা রবিন হুডের মতো খাবার চুরি করে ক্ষুধার্তদের মাঝে বিলি করে। সত্যি কাহিনী অবলম্বনে লিখিত একটি উপন্যাস থেকে তৈরি হয়েছে এই চলচ্চিত্র। কিন্তু বীরত্ব প্রচারের আগে একটু হোচটই খেতে হয়েছে ছবিওয়ালাদের। ঘটনাটি শোনাচ্ছেন রব।

মার্কিন সেনাবাহিনীতে জন স্টেবিন ছিলেন তারকা সেনাকর্মকর্তা, রেঞ্জার স্পেশালিস্ট এই সেনা পেয়েছিলেন সিলভার স্টার, যা সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ মর্যাদা বহন করে। ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার মোগাদিসুতে বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্যই তাঁকে সেই সম্মান জানানো হয়। তাঁর জীবনী নিয়ে পরে বই লিখলেন মার্ক বোডেন, নাম দিলেন ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’। বইটি বেরুলো ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালে ছবিটি নির্মাণে হাত দেয়ার আগে ঘটলো এক বিপত্তি। তারকা স্টেবিন লুটিয়ে পড়লেন ধুলোয়। বারো বছরের এক কিশোরকে বলাৎকারের অভিযোগে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হলো এবং সামরিক কারাগারেই ত্রিশ বছর কাটাবার শাস্তি দেয়া হলো তাঁকে। এখন এমন একজনকে নিয়ে কি ছবি বানানো যায়? বেকায়দায় পড়ল ছবিওয়ালারা।
মার্কিন সেনাবাহিনী চায় একজন সিলভার স্টার জেতা সেনার কাহিনী সবাই জানুক, কিন্তু একজন বালক-ধর্ষককে তারা সামনে আনতে চায় না। কাজেই পেন্টাগন প্রযোজকদের বলল, প্রধান চরিত্রের নাম যেন স্টেবিন না হয়। প্রযোজকরাও নাম পাল্টে দিলেন, কারণ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার তাহলে কে দেবে? শুধু মূল চরিত্রের নাম নয়, বাস্তবের অনেক আসল নামই ছবি থেকে হটিয়ে দেয়া হয়েছিল শুধু পেন্টাগনের নির্দেশে।
কেবল এসব ছবিতে নয়, বন্ড ছবিতেও এমন সব ছোটখাটো অস্ত্রপচার করে থাকে পেন্টাগন। এমনিতেই বন্ড ছবির খলনায়ক বেশ বেছে বেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শত্রুদেরই বানানো হয়। যাহোক, ‘টুমরো নেভার ডাইজ’ ছবিতে কয়েকটি জাহাজ ও হেলিকপ্টার দেয়ার বদলে একটি সংলাপে কাঁচি চালাতে বলেন পেন্টাগন ফিল্ম লিয়াজোঁ অফিসের প্রধান ফিল স্ট্রাব। সংলাপটি তেমন কিছুই নয় একটি একলাইনের কৌতুক মাত্র। বন্ড সিরিজের এই ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ব্রুস ফিয়েরস্টেইন। চিত্রনাট্যে ছিল বন্ড (পিয়ার্স ব্রসন্যান) প্যারাসুট দিয়ে ভিয়েতনামের মাটিতে নামবে। তখন এক দুষ্টু সিআইএ এজেন্ট (জো ডন ব্যাকার) বন্ডকে বলবে, ‘এবার জানো কি হবে? যুদ্ধ হবে। আর এবার মনে হয় আমরা জিতবো।’
ব্যাস এতটুকুই। এ কথাটি পেন্টাগনের অহমে আঘাত করেছে, যেহেতু তারা ভিয়েতনামের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ছবির প্রযোজককে তারা বললো, এই সংলাপটি ভিয়েতনাম ভুলভাবে নিতে পারে অর্থাৎ ভিয়েতনাম ভাবতে পারে ছবির মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া সপ্তাখানেক হলো কয়েক দশক পর ভিয়েতনামে প্রথমবারের মতো মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ হয়েছে, এখন যদি এই ছবিতে এমন সংলাপ থাকে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। পেন্টাগনের চলচ্চিত্র বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রধান স্ট্রাবের এসব যুক্তি ফেলার কোন অবকাশ প্রযোজকের ছিল না, কারণ যুদ্ধ জাহাজ ও যুদ্ধ বিমান তার দরকার। কাজেই সেই সংলাপ কর্তন করা হলো। যুক্তরাষ্ট্রের দর্শক ছবিটি মুক্তির পর জানতেই পারলো না বন্ড ছবিটির সংলাপ পরিবর্তন করে দিয়েছিল পেন্টাগন, রাজনৈতিক কারণে। পরে অবশ্য এসব নথি প্রকাশ হয়েছে।
এর আগে ১৯৯৪ সালে ‘গোল্ডেনআই’ ছবির চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন ফিয়ারস্টেইন। সেসময়ও একই রকম ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সেই চিত্রনাট্যে ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর একজন এডমিরালকে ব্যবহার করে একজন রুশ মাফিয়া বাগিয়ে নেবে আইডেন্টিফিকেশন ব্যাজ, যা দিয়ে অতিগোপনীয় মহাকাশ অস্ত্র ‘গোল্ডেনআই’ কবজা করা যাবে। এখন পেন্টাগন এই ছবিতে তিনটি হেলিকপ্টার, পঞ্চাশজন মেরিন সেনা দিচ্ছে, তাদের নিয়ে প্রযোজক দুই-তিন দিন পুয়ের্তো রিকোতে শুটিং করতে পারবে, তবে তারা চাচ্ছে না ছবিতে দেখানো হোক একজন মার্কিন এডমিরাল এভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে রুশ মাফিয়ার দ্বারা।
ভাড়া করা হেলিকপ্টার আর অন্য লোকদের দিয়ে হয় তো সামরিক অভিযানের দৃশ্যটি শুট করা যেত, কিন্তু তাতে খরচ অনেক পড়তো, আর বিষয়টি মেকি মেকি লাগার শঙ্কা তো থাকতোই। বাধ্য হয়েই, যেহেতু পেন্টাগনের সাহায্য নিতে হচ্ছে, তাই প্রযোজক ঠিক করলেন এডমিরাল হয়ে যাবেন ফ্রান্সের নাগরিক। এবার বেঁকে বসলো ফ্রান্সের সেনাবাহিনী। ছবিতে যে তাদেরও সহযোগিতা দরকার প্রযোজকের। শেষমেষ ঠিক হলো এই এডমিরাল যুক্তরাষ্ট্রের হবে না, ফ্রান্সেরও হবে না, হবে কানাডার নাগরিক। কানাডার কাছ থেকে কোন সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন হয়নি প্রযোজকের। কাজেই বোকা এডমিরালের চরিত্রটি হয়ে গেল কানাডার। দর্শক এই ছবিতে এডমিরালের দৃশ্যটি যখন দেখবেন, লক্ষ্য করবেন তার পোশাকে রয়েছে কানাডার মেপল লিফ।
এভাবে নানা সময়ে, নানা রকম বশ্যতা মেনে, প্রচ্ছন্ন প্রোপাগান্ডামূলক এই ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা চলচ্চিত্র তৈরি করে চলেছে হলিউড। সাম্প্রতিক সময়ের ছবিতেও তাই দেখা যায় সেই একই কাসুন্দি। হয় বিদেশের মাটিতে গিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করছে মার্কিন সেনাবাহিনী, নয় তো অন্য দেশের বিশাল ভয়ঙ্কর কোন সন্ত্রাসী বড় ধরনের হুমকি হয়ে হাজির হচ্ছে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার সামনে। আক্রান্ত হচ্ছে খোদ তাদের প্রেসিডেন্ট। হলিউড বক্সঅফিসে এসব ‘প্রেসিডেন্ট আক্রান্ত’ মার্কা ছবি কিন্তু বেশ সফল হয়। আমরা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ (১৯৯৭), ‘হোয়াইট হাউজ ডাউন’ (২০১৩), ‘অলিম্পাস হ্যাজ ফলেন’ (২০১৩), ‘লন্ডন হ্যাজ ফলেন’ (২০১৬) ইত্যাদি ছবির নাম জানি। এসব ছবির একটি অভিন্ন প্লট থাকে, তা হলো– বিদেশী সন্ত্রাসী দল ঠিক করে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জিম্মি করে আদায় করে নেবে অনৈতিক সুবিধা। বিপদগ্রস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট রক্ষা করবে, আর তার সঙ্গে যোগ দেবে গোটা সেনাবাহিনী।
এসব ছবি দিয়ে বোঝানো হয়– দেখো হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত নিরাপদ নয়। আমরা যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাইনি শিকারের মতো করে কখনো সাদ্দাম, কখনো গাদ্দাফিকে শিকার করি, সেটা তো এই হোয়াইট হাউজ ও যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার জন্যই। সিরিয়ায় বাশারকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি, সেটাতো রাশিয়া ও ইরানের জন্য। সবই আমরা করি আমাদের ও বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য। কাজেই আমাদের কর্মকা-ের ‘অনুমোদন’ দাও, আমরা অন্য দেশে নাক গলাতে চাই, এতে তাদের ও আমাদের উভয়ের জন্যই মঙ্গল। নয় তো আমরা সকলে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবো। আমাদের সমর্থন করো– এই ধরনের সম্মতি আদায়ের পথে চলচ্চিত্র এক অবারিত দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে পেন্টাগনের সামনে।
তবে এটা মনে করার কারণ নেই হলিউডে হরেদরে সকলেই পেন্টাগনের সহবত কবুল করেছে। কেউ কেউ এই দুর্বৃত্তায়নকে বুড়ো আঙুলও দেখিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেতা ও প্রযোজক কেভিন কস্টনার, তিনি ‘থারটিন ডেইজ’ (২০০০) ছবিতে পেন্টাগনের খবরদারি মেনে নেননি। অভিনেতা ও পরিচালক ক্লিন্ট ইস্টউড, হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি ‘হার্টব্রেক রিজ’ (১৯৮৬) ছবির চিত্রনাট্য পুনঃলিখন করেননি। ‘প্লাটুন’ (১৯৮৬), ‘বোর্ন অন দ্য ফোর্থ অব জুলাই’ (১৯৮৯) ও ‘হেভেন অ্যান্ড আর্থ’ (১৯৯৩) ছবিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে অটুট রেখেছেন পরিচালক অলিভার স্টোন। তিনি নিজেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের একজন সৈনিক। পরিচালক রবার্ট অলরিজ ‘অ্যাটাক’ (১৯৫৬) ছবি বানাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু যা স্বাভাবিক, বদলে চিত্রনাট্যে পরিবর্তন চাইলো পেন্টাগন। অলরিজ তো পেন্টাগনের কথা শুনলোই না, উল্টো সকলের সামনে রাষ্ট্র করে দিলেন পেন্টাগনের আবদারের কথা। তো এমন অনেকেই আছেন হলিউডে, যারা পেন্টাগনের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নেননি বা প্রতিবাদ করেছেন।
কোন দেশের শিল্পীই আসলে চাননা তাদের শিল্পকর্মটি অন্য কেউ এসে হস্তক্ষেপ করুক, বিশেষ করে আবার সামরিক বাহিনী। হলিউডেই বোধহয় একমাত্র যেখানে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভেতর দিয়ে সামরিক উপদেশ মেনে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এটার একটা বড় কারণ, প্রযোজকের দৃষ্টিকোন থেকে, খরচ কমানো ও বাস্তবতার ছোঁয়া রাখতে চাওয়া। মার্কিন দেশেরই সাংবাদিক রব এই সম্পর্কের সমালোচনা করে বলছেন, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই যে একটি দৃষ্টিকটু সম্পর্ক বজায় রেখে চলা হচ্ছে, তাতে হয় তো মার্কিন সেনাবাহিনীর নতুন নতুন সদস্য পেতে খুব সুবিধা হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন জনগণের মনোজগতে এর প্রভাব কি কখনো ভেবে দেখা হয়েছে?
শক্তিধর শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রের মাধ্যমে খুব সূক্ষ্মভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব যে গড়ে তোলা হয়েছে গত অর্ধশতাধিক বছর ধরে, এতে যা হয়েছে তার একটি অতি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান দেন রব। তিনি বলেন, ১৯৪০ সালে মার্কিনীরা নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নারাজ ছিলো, অথচ সেই মার্কিনীরাই ধীরে ধীরে সব সহ্য করে নিয়েছে। এর কারণ চল্লিশের দশকেই প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট বুঝেছিলেন যুক্তরাষ্টের জনগণের কাছ থেকে যুদ্ধের প্রতি সম্মতি আদায় সহজ হবে না। তাই তো ১৯৪২ সালে হলিউডের নামিদামী পরিচালকদের দাওয়াত দিয়ে ‘ঢিশুম ঢিশুম’ ছবি বানাবার প্রস্তাব দেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। শুদ্ধ তাই নয়, সরকারি সহায়তারও অঙ্গীকার করেন তিনি। এর ফলে পরবর্তী সময়ে আমরা কি দেখলাম?
ষাটের দশকে ভিয়েতনামের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলো এটা বলে যে– মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের ওপর হামলা করেছে ভিয়েতনামি এক গানবোট, পরে জানা যায় পুরোটাই ছিল ধাপ্পা। মিথ্যার ওপর ভর করে যুদ্ধ শুরু হলেও হলিউড কিন্তু ঠিকঠিকই যুদ্বের পক্ষে ‘র‌্যাম্বো’র মতো ছবি বানিয়ে ফেলে। এমন মিথ্যাচার করে, ঠুনকো ছুতোয় অন্য দেশে হামলা ও সেগুলোকে ঢাকতে হলিউডের ত্রাতার ভূমিকার কথা সকলেরই জানা। আশির দশকে জার্মানির এক ডিসকো ক্লাবে হামলা চালায় এক সন্ত্রাসী, সন্দেহভাজন সেই লোক লিবিয়ার, তাই সেসময় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা করে বসে লিবিয়ায়। মার্কিনীরা সেখানে অন্যায় কিছু দেখেনি। নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালো ইরাকে, কারণ ইরাক কুয়েত দখল করে নিয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আবারো হামলে পড়লো ইরাকের ওপর, এবার অভিযোগ এলো ইরাক নাকি গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে। পরে জানা গেলো মিথ্যা বলেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এতসব ধাপ্পাবাজি ও চাতুরি করে অন্য দেশে হামলার ঘটনাগুলো কিন্তু অনেক মার্কিনীই সমর্থন করেছে। এটা সম্ভব হয়েছে কিছুটা রাজনীতি, কিছুটা কূটনীতি, কিছুটা গণমাধ্যম এবং অবশ্যই চলচ্চিত্রের কল্যাণে।
প্রতিনিয়তই মার্কিন জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও মগজ এমনভাবে যুদ্ধের সপক্ষে ধোলাই করা হয় যে জর্জ বুশ যখন ঘোষণা করলেন, তাদের বহুদিনের পুরনো নীতিÑ কোন যুদ্ধে তারা প্রথম পরমানু অস্ত্র ব্যবহার করবে নাÑ পরিহার করা হচ্ছে, তখন দেশটির জনগণ রা পর্যন্ত করলো না। প্রকারান্তরে তারা বিষয়টিকে সমর্থনই করলো। এই সমর্থন কিন্তু এমনি এমনি আদায় হয়নি। সেজন্য যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে হোয়াইট হাউজকে। সেই প্রক্রিয়ার একাংশ হলো হলিউড। অবশ্য এই কাঠখড়ের জ্বালানি আবার এসেছে জনগণের পকেট থেকেই।
পেন্টাগন যে হলিউডের ছবিতে প্রণোদনা দেয়,বলা ভালো ‘ঘুষ’ দেয়, তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য, সেই অর্থ আসে দেশটির জনগণের করের অর্থ থেকেই। তাই এই মর্যাদাহানিকর সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান সাংবাদিক রব। তিনি মনে করেন দেশটির জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ কংগ্রেস, রাইটার্স গিল্ড অব আমেরিকার মতো সংস্থা ও সর্বোপরী জনগণের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন শিল্পসৃষ্টিতে পেন্টাগনের নাক গলানো প্রসঙ্গে। শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়ার এধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তাছাড়া এই হস্তক্ষেপের সুদূর প্রসারী প্রভাবও মন্দ বৈ ভালো কিছু নয়। তাই যতই আমাদের হলিউডের অ্যাকশন ঘরানার ছবি দেখে ভালো লাগুক না কেন, আমাদের মনের ভেতর সর্বদা সজাগ প্রহরী বসিয়ে রাখতে হবে, যেন মনের দরজা দিয়ে প্রোপাগান্ডা না ঢুকে যায়। অবশ্য সেজন্য প্রহরীকেও অনেক চর্চা করতে হবে, চৌকশ হতে হবে।

পুঁজি

  1. Jean-Michel Valantin, Hollywood, The Pentagon and Washington: The Movies and National Security from World War 2 to the Present Day, Anthem Press (2005), London.
  2. David L. Robb, Operation Hollywood: How the Pentagon Shapes and Censors the Movies, Prometheus Books (2004), New York.

লেখক: বিধান রিবেরু, চলচ্চিত্র সমালোচক ও নির্মাতা