৪র্থ চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

বিকল্পধারার চলচ্চিত্রপাড়ায় একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, চলচ্চিত্র হলো নিজের জন্যে। শিল্পী যেমন নিজের শিল্পকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, চলচ্চিত্রকারেরাও হবেন সেই মতো। কয়জন ফিল্মটা দেখলো, কয়জন ভালো বললো এসব ভাবিতব্য বিষয় নয়। কিন্তু এই কথায় হাজারো যুক্তি এনে দাঁড় করালেও, নিজের চলচ্চিত্র শেষে হলভর্তি মানুষের করতালির শব্দ যিনি শুনেছেন, তিনিই কেবল বলতে পারেন অনুভূতিটা কেমন। পেশাদারি চলচ্চিত্রকারদের কাছে অবশ্য এই জিনিসটা খুব নিয়মিত হলেও নবীন চলচ্চিত্রকারদের কাছে এই অনুভূতি পরম আরাধ্যের। এমন একটি অভিজ্ঞতা এতটাই অনুপ্রেরণাদায়ক যে, তা বদলে দিতে পারে একজন চলচ্চিত্রকারের জীবনের মোড়, ঠিক করে দিতে পারে ভবিষ্যৎ! আর শুধু বাংলাদেশ না, সারা বিশ্বজুড়েই যুগে যুগে নবীন, তরুণ চলচ্চিত্রকারদের ছবি বড় পর্দায় তুলে আনার কাজটা করে আসছে বিভিন্ন দেশের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো। ঠিক তেমনি, বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্রকারদের অনুপ্রেরণা দানের অংশ হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে ‘মানবতার জন্যে চলচ্চিত্র’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করে আসছে চলচ্চিত্রকারদের সংগঠন ‘চিটাগং শর্ট’। আচ্ছা, প্রথমেই একটা কনফিউশন ক্লিয়ার করে নিই। এটা ‘চিটাগং শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ না, এটা হলো ‘চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’।

‘ভালোবাসা’ শব্দটা চিটাগং শর্টে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে। ভালোবাসাই এই সংগঠনের মূল চাবিকাঠি, ভালোবাসাই এর শক্তি।

তাহলে কি সংগঠনের নামই চিটাগং শর্ট? জি, ঠিক ধরেছেন। প্রথম প্রথম প্রচুর মানুষ জিজ্ঞেস করতো, ভাই, নামের সাথে শর্ট কেনো? আপনারা কি শুধু শর্টফিল্মেই সীমাবদ্ধ থাকবেন? নামের মধ্যেই শর্ট, আপনাদের চিন্তাচেতনা বড় করবেন কিভাবে? তখন অবশ্য হাসিমুখে যে কোন একটা জবাব দিয়ে দিতাম আমরা। কি দরকার এত ব্যাখ্যার? কাজটা ঠিক ঠাক করে যাই, তাহলেই চলবে। পুরনো কথা অল্প একটু চিন্তা করলেই একসাথে ঝুপ করে একগাদা স্মৃতি মাথায় এসে ভর করে। চার বছর হয়ে গেলো? অথচ মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। চলচ্চিত্রের টানে একঝাঁক তরুণপ্রাণ সমবেত হয়েছিল একসাথে কাজ করবে বলে। জানেনা কিছুই, বোঝেনা কিছুই – কেবল চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসার টানেই একত্রিত হয়েছে সবাই। ‘ভালোবাসা’ শব্দটা চিটাগং শর্টে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে। ভালোবাসাই এই সংগঠনের মূল চাবিকাঠি, ভালোবাসাই এর শক্তি।

#csffbd2016.jpg

প্রথম ফেস্টিভ্যাল– ভেবেছিলাম কেমনই বা সাড়া পড়বে! কিন্তু অবাক হতে হলো। জয়দীপ মজুমদার, খন্দকার আব্দুল গণি, হিমাদ্রি হিমুসহ চট্টগ্রামের এমন সব মানুষের সাথে পরিচয় হলো, যারা আসলেই চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছে, স্বপ্ন দেখছে আকাশ ছোঁয়ার। এরাই মূলত বীজ বুনে দিয়েছিল স্বপ্নগুলো বড় করার। প্রথম ফেস্টিভ্যালে ‘শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ এই একটি ক্যাটাগরিতেই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছিল নাসের আহম্মেদ পরিচালিত ফিল্ম ‘খুন্নাস’। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আবেগপ্রবণ নাসের আহম্মেদ যখন নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিলেন, তখন থেকেই চিটাগং শর্টের সবার মাথায় একটা ব্যাপারই ঘুরতে থাকে, পরবর্তী বছর থেকে এর পরিধি অবশ্যই বাড়াতে হবে, ছড়িয়ে দিতে হবে দেশজুড়ে। ২০১৭, ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় আসর। গত আসরের ভুলত্রুটিগুলো মুছে আরো নিখুঁতভাবে আয়োজনের চেষ্টা। চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো পৃথিবীজুড়ে। ফলাফল – অভাবনীয়। পঁচিশটিরও বেশী দেশ থেকে চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল সেবার। জমা পড়া চলচ্চিত্র থেকে প্রদর্শনীর জন্যে বাছাই করা হলো ১৫ টি চলচ্চিত্র। পরিধির সাথে সাথে বাড়ানো হলো পুরস্কারের সংখ্যাও। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হলো আসিফ খানের ‘পোস্টার’, শ্রেষ্ঠ পরিচালক নির্বাচিত হলেন ‘পথ’ চলচ্চিত্রের পরিচালক আবিদ মল্লিক, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার পেলেন ইহতিশাম আহমেদ টিংকু, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পুরস্কার পেলেন প্রিয়াঙ্কা বোস কান্তা এবং শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার পেলো ভারতের পরিচালক ধীরাজ জিন্দাল নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য স্কুল ব্যাগ’। দ্বিতীয় আসরের অনুভূতিটা আসলেই অন্যরকম ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চলচ্চিত্রকারেরা সমবেত হয়ে যখন পুরো আয়োজন নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করছিলেন, তখন মনে হলো চিটাগং শর্ট ঠিক পথেই আছে। তাদের অনুপ্রেরণা থেকেই চিটাগং শর্ট নিজেদের আরেকটি অধ্যায় – ঢাকা শো আয়োজন করার শক্তি পেয়েছিল। ঢাকা শো-তে চিটাগং শর্ট পাশে পেয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় জাদুঘরকে। যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ৫ দিন ব্যাপী ঢাকা শো-কে চিটাগং শর্টের এই ছোট্ট পথচলার অন্যতম ‘মোড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। একদিকে প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনীতে হলভর্তি দর্শক চিটাগং শর্টকে দিয়েছে সাহস এবং অনুপ্রেরণা, অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন চলচ্চিত্রকারদের পরামর্শ ও নির্দেশনা সহায়তা করেছে চিটাগং শর্টের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে।

#csffbd2016-1.jpg

চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের তৃতীয় আসর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গোছানো ও পরিকল্পিত আয়োজন। সেবার সাড়া পড়লো আরো বেশি। ত্রিশ টিরও বেশি দেশের শতাধিক চলচ্চিত্র থেকে প্রদর্শনীর জন্যে বাছাই করা হলো ২০ টি চলচ্চিত্র। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হলো এনামুল হক খানের চলচ্চিত্র ‘বাঁকা হাওয়া’, শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে পুরস্কৃত হলেন ‘কন্টেমপ্টেশন’ চলচ্চিত্রের পরিচালক নাহিদা পারভীন, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং অভিনেত্রীর পুরস্কার পান যথাক্রমে ‘কাম ফ্রম বিদেশ’ চলচ্চিত্রের ফাহিম আরিয়ান এবং ‘এ লেটার টু গড’ চলচ্চিত্রের ‘উনি প্রু মারমা’। শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার পায় ফ্যাব্রিস বারাখ পরিচালিত ‘এ হোল ওয়ার্ল্ড ফর এ লিটল ওয়ার্ল্ড’। তৃতীয় আসরে একটা জিনিস বেশ উল্লেখযোগ্য, সেটা হলো সংবাদ সম্মেলন, মাস্টারক্লাস, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, পুরস্কার বিতরণী – এত এত কাজ কখন যে কীভাবে ধাপে ধাপে শেষ হয়ে গেল, তা ঠিক বোঝাই গেলো না। চিটাগং শর্টের মেম্বাররা যার যার কাজ বুঝে নিয়ে সেড়ে ফেলছে ঠিকঠাক। ব্যাপারটা এমন যে, জাহাজের নবীন নাবিকেরা যার যার যায়গা বুঝে গিয়েছে, এখন দীর্ঘ যাত্রার জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত এ জাহাজ।

চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটা দেখলে যাত্রাটা যতোটা সহজ মনে হচ্ছে, এতটা মসৃণ ছিল না তা কখনোই।

চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটা দেখলে যাত্রাটা যতোটা সহজ মনে হচ্ছে, এতটা মসৃণ ছিল না তা কখনোই। এই ছোট্ট যাত্রায়ই অনেক ঝড়-ঝঞ্জার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, পাড়ি দিতে হয়েছে বহু বন্ধুর পথ। কিন্তু প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘ভালোবাসা’ শব্দটা চিটাগং শর্টে আষ্টেপৃষ্ঠ মিশে আছে। এ যাত্রায় চিটাগং শর্ট পাশে পেয়েছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন গুণী নির্মাতা, চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রশিক্ষক এবং সংগঠকদের, যাদের উপদেশ, আত্মত্যাগ এবং ভালোবাসায় চিটাগং শর্ট আজকের অবস্থানে। এসব গুণী মানুষদের ছোট্ট ছোট্ট উপদেশ কিংবা সতর্কবাণী চিটাগং শর্টের অভিজ্ঞতার ঝুলিকে করেছে ভারি, সেই সাথে চিটাগং শর্টের সদস্যদের আত্মত্যাগ এবং ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র মানসিকতা একে দিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। আচ্ছা, এই যে এত মানুষের ভালোবাসা, এর রহস্যটা কি? অনেকে অনেক কিছু বলতেই পারে, কিন্তু খুব সম্ভবত এর মূল এবং একমাত্র কারণ – চিটাগ��� শর্ট এর নীতি, তরুণ চলচ্চিত্রকারদের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার নীতি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চিটাগং শর্ট যে কাজই করুক না কেন, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য একটাই ছিল, তা হলো দেশের তরুণ চলচ্চিত্রকারদের উন্নতি। অন্যান্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতার মতো চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও একটা চলচ্চিত্র বিচারে প্রোডাকশন মূল্যমান, চলচ্চিত্র ব্যাকরণ, পারফরম্যান্স ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় আনার পাশাপাশি চিটাগং শর্ট আরেকটি অনন্য বিষয় বিবেচনায় আনে, তা হলো চলচ্চিত্রকারের উদ্দেশ্য বা আল্টিমেট গোল। নবীন বা কাঁচা হাতের অনেক নির্মাতাই হয়তোবা মাথায় যা আছে, তা সঠিক নির্মাণযন্ত্রের অভাবে সিনেমায় পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারেন না। কিন্তু একটা নবীন চলচ্চিত্রকারের শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার চেষ্টাকে বিবেচনায় আনে চিটাগং শর্ট। দেখতে দেখতে চলে এল আরেকটি আসর। প্রতিবন্ধকতারাও ডালপালা মেলেছে, কিন্তু এত শত মানুষের ভালোবাসা আর আত্মত্যাগ যে যাত্রার সাথে মিশে আছে, সে যাত্রা রুখবে, সে সাধ্য কার!

গ্রন্থনাঃ কাজী আশরাফ এলাহী