তরুণ নির্মাতা নাদিম হোসেন

নাদিম হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র ছিলেন। ভিন্ন কিছু করার চেষ্টাতেই সিনেমা জগতে পা বাড়ান। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে মঞ্চে নিয়মিত কাজ করতেন। দর্শন আর সিনেমা একে অন্যের পরিপূরক। এটা আবিষ্কারের পর থেকেই সিদ্ধান্ত নেন সিনেমা তৈরীতেই জীবনকে চালাবেন। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি হাউজের সাথে কাজ করেছেন। অনেকগুলো ছোট ছোট সিনেমা তৈরী করেন এর মধ্যে। শর্টফিল্ম, ফিকসন ফিল্ম, মিউজিক্যাল ফিল্ম, ডকুমেন্টারি সবক্ষেত্রেই কাজ করেছেন তিনি। ‘ঘুণপোকা’, ‘স্বাধীনতা’, ‘এ ড্রপ অব লাইফ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে নির্মিত ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ সিনেমাতে সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।


Nadim.jpg

শুরুটা মঞ্চে অভিনয় দিয়ে। ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত কাজ করি মঞ্চে। তারপর ঢাকায় একটি নাটকে ডাক পাই। তখন কাছ থেকে নির্মাণ ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো দেখার সুযোগ হয়। এরপরেও অন্য একটি টিভি নাটকে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন থেকে আসলে ক্যামেরার পেছনে কাজ করার ইচ্ছ জাগে। কেনো জানি মনে হতো অভিনয়ের চেয়ে নির্দেশনায় ভালো করবো। কারণ আমার সবসময় গল্প বলার প্রতি একটা আকর্ষণ কাজ করতো। তখন চট্টগ্রামে কয়েকজন ভাই-ব্রাদার কাজ করতো, আমিও তাদের সাথে যুক্ত হই এবং ছোট পরিসরে ফিল্ম চর্চা শুরু করি।

কারো কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া বলতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের নাম চলে আসে। এছাড়াও তুর্কী এবং ইরানী ফিল্মমেকারদের কাজ দেখেও অনেক কিছু শিখি এবং চিন্তা করার সুযোগটা পাই।
আমার মতে চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং মেধায় ভরপুর একটা জায়গা। কিন্তু এখানে সিনেমা নিয়ে কাজ করার মত পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নাই। তারপরেও এই অঞ্চলে যারা কাজ করছেন তাদের ইচ্ছাশক্তি প্রবল এবং তারা পরিশ্রমী। এটা একটা পজিটিভ দিক। আর নেগেটিভ দিক বলতে গেলে সংলাপ কিংবা আরো বেশ কিছু ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রভাব ও স্বল্প সময়ে অনেক কিছু করার প্রবণতাটা বেশি বলে আমি মনে করি।

1.jpg

সাধারণত একজন ফিল্মমেকার এর স্বপ্নই থাকে সে ফিল্ম করবে এবং করেই যাবে। আমিও এর বাইরে না। দশ বছর কিংবা একটা নির্দিষ্ট সময় পর আমি নিজেকে এমন একটা জায়গায় দেখতে চাই যে আমার জীবনদর্শন কিংবা আমি যা বলতে চাই সমাজকে তা আমি আমার ফিল্মের মাধ্যমে বলবো। এদেশের মানুষ আমার ফিল্ম দেখবে এবং জানবে যে, নাদিম মানে একজন ফিল্মমেকার। স্বপ্ন শুধু এটাই।
একজন ফিল্মমেকার এর জীবনটা তো আসলে চ্যালেঞ্জে ভরা। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে চট্টগ্রামে প্রযোজকের ঘাটতিটা খুবই মারাত্মক। মূলত একজন প্রযোজকই একজন ফিল্মমেকারকে ব্রেক দিয়ে থাকেন। এখানে ব্রেক দেয়ারও কেউ নেই। এটা আসলে দোষের না, আমরাও হয়তো তাদের কাছে সেভাবে পৌঁছাতে পারিনি। চট্টগ্রাম যদিও ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র কিন্তু এর অধিকাংশ কার্যক্রমই ঢাকা কেন্দ্রিক। এবং সিনেমা নির্মাণের ব্যবসাটা চট্টগ্রামে তেমন জনপ্রিয়ও না। আরেকটি বিষয় থেকেই যায়, একজন প্রযোজক টাকা দিবে তখন যখন সে তার লগ্নীকৃত টাকা লাভসহ ফেরত পাবে। আমরা যেহেতু এখনো শর্টফিল্ম বানাচ্ছি তাই প্রযোজক পাওয়া আরো কষ্টকর, কারণ শর্টফিল্মের এখনোÑ তেমন একটা কোনো বাণিজ্যিক চাহিদা তৈরী হয়নি। চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কে দেখে আসছি বিগত সময়ে শর্ট ফিল্ম নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে, আশা করি এ উৎসবের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রযোজকও এগিয়ে আসবেন যারা চট্টগ্রামের মেধাবী নির্মাতা যারা আছে তাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা ভাবনা করতে পারেন।
সবাই পরিচালক হতে চাওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষণীয়, কিন্তু আমাদের এটা বোঝা দরকার যে একটা ফিল্ম শুধুমাত্র একজন পরিচালক দিয়ে হয় না। অন্যান্য অনেক জায়গা আছে যেখানে দক্ষ জনশক্তির অভাব। আমি বলছিনা পরিচালক হতে চাওয়াটা অন্যায়, কিন্তু আমাদেরকে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমাকে দিয়ে কোন কাজটা সবচেয়ে বেশি ভালো হবে, আমি শুধু সেটাই করবো, সে বিষয়ে এক্সপার্ট হয়ে উঠবো। তাহলে ধীরে ধীরে এখানে একটি শক্তিশালী টেকনিক্যাল টীম তৈরী হবে।

একজন নবীন নির্মাতাকে উৎসাহ উদ্দীপনা ও সঠিক পথ দেখানোর জন্য আমি মনে করি সিনে ম্যাগাজিন ‘আই’ একটি যুগোপযোগী সংযোজন। এটি অভিজ্ঞ ও শিক্ষানবীশ এর মধ্যকার একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। যার দ্বারা চট্টগ্রামে শত প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তরুণ নির্মাতারা তাদের সুন্দর সুন্দর কাজ গুলো সারা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরবে এবং ফিল্মমেকার হিসেবে গর্ববোধ করবে, যেমনটা আমি সবসময় করি।