নকল সিনেমা, কপিরাইট আইন ও বাংলাদেশের সৃজনশীল পেশাজীবি

২০১৯ সালের সাম্প্রতিক সময়ে নকল সিনেমা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষিতে চিত্রনাট্যকার পরিচালক শাহজাহান শামীম নকল সিনেমা রোধকল্পে করণীয়গুলো নিয়ে এক ফেসবুক পোস্টে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত করেন।

নকল সিনেমা পৃথিবীর সব দেশেই হয়। কপিরাইট আইন অনুসারে এটা অবৈধ। কোন মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার গল্প থেকে নতুন সিনেমা বানাতে হলে চিত্রনাট্যকার বা প্রযোজকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে কপিরাইট কিনে আনতে হয়। কপিরাইট কিনে সিনেমা বানানোটাকে বলে ‘রিমেক’। ‘রিমেক’ বৈধ। কিন্তু কপিরাইট না কিনে সিনেমা বানালে ওটাকে নকল সিনেমা বলে।

আইন অনুসারে নকল সিনেমা অবৈধ। এটা পৃথিবীর সব দেশেই অবৈধ। বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে প্রণীত সেন্সরশিপ অব ফিল্ম রুলস-এর ১৩নং ধারা অনুসারে নকল সিনেমাকে সেন্সর সার্টিফিকেট দেয়াটাকে নিষিদ্ধ করা আছে। কিন্তু আমাদের সেন্সর বোর্ড এই সব নীতিমালা খুব একটা মানে না।

আমেরিকাতে কোন সৃজনশীল কাজ নকল করা কোনভাবেই সম্ভব না। ইউটিউব আমেরিকান কোম্পানি গুগলের মালিকানায় বলে ইউটিউবে অন্য আরেকটা ভিডিও নকল করে ভিডিও বানানো অবৈধ। ধরা পড়লে সেই ইউটিউব চ্যানেল ব্যানড করে দেয়া হয়। ধরা না পড়ার জন্য নকলবাজটা অনেক কৌশল করে ভিডিও বানায় ।

সৃজনশীল কাজগুলো যেন কেউ কপি করে নিতে না পারে তার জন্য আমেরিকাতে কপিরাইট আইন আছে। সেই আইন কঠিন বলেই মাইক্রোসফট কোম্পানির সফটওয়্যার অন্য কেউ কপি করে বেচতে পারে না।

কিন্তু বাংলাদেশে কপিরাইট আইন থাকলেও কেউ মানে না। কারো কোন শাস্তিও হয় না। এ কারণে বাংলাদেশে সৃজনশীল কাজের মূল্য পাওয়া যায় না। এখানে যে কেউ যে কারো লেখা চুরি করতে পারে। যে কেউ যে কারো গান চুরি করতে পারে। যে কেউ যে কারো চিত্রনাট্য চুরি করতে পারে। যে কেউ অন্য কারো সফটওয়্যার চুরি করে বিক্রি করতে পারে। সৃজনশীল কাজ চুরি করাটাকে আমরা কোন অন্যায় মনে করি না।

বিল গেটস-এর জন্ম বাংলাদেশে হলে সে ঢাকা শহরে ভিক্ষা করে বেড়াত। বাংলাদেশে যারা সৃজনশীল কাজ করেন, তারা শেষ বয়সে ভিক্ষা করেন কেন জানেন ? কারণ তার সকল সৃজনশীল কাজ অন্য কেউ চুরি করে নিয়ে যায়। আমাদের দেশে গীতিকার, সুরকার ও গায়কদের অবস্থা দেখেন । তাদের গান নিয়ে অন্যরা ব্যবসা করলেও তারা রয়ালিটি পাচ্ছে না। এফএম রেডিওতে তাদের গান বাজানো হলেও তারা কোন টাকা পায় না। তাদের গান টিভিতে দেখানো হলেও তারা রয়ালিটি পায় না। তাদের গান কপি করে লোকজন নিয়ে গেলেও তার কোন টাকা পায় না। ফলে তাদের উপরে অন্য লোকজন ব্যবসা করে গেলেও তারা ফকিরই থেকে যায়। মাইকেল জ্যাকসনের জন্ম বাংলাদেশে হলে সেও পল্টনের মোড়ে ভিক্ষা করত।

আমাদের দেশে নকল সিনেমা বানানোটাকে কোন অপরাধ মনে করা হয় না। বিদেশী সিনেমা থেকে কপি করা হয় বলে আইনের ফাঁক দিয়ে পার পাওয়া যায়। যার সিনেমা থেকে কপি করা হচ্ছে সে জানে না বলে কোন ব্যবস্থাও নিতে পারে না। আমাদের সেন্সর বোর্ডও এটাকে অপরাধ হিসেবে আমলে নেয় না। ফলে আমাদের দেশে কারো চিত্রনাট্য বা গল্প মেরে দিয়ে সিনেমা বানানোকে কোন অপরাধ হিসেবে গণ্য করি না আমরা।

সমস্যাটা তৈরি করেছে ইন্টারনেট। আগে নকল সিনেমা হলে দর্শক ধরতে পারত না। কারণ আসল সিনেমাটা দেখার সুযোগ তাদের ছিল না। কিন্তু এখন ? এখন দর্শক ইন্টারনেটে সারা দুনিয়ার সিনেমা দেখে ফেলছে। স্যাটেলাইট চ্যানেলে সারা দুনিয়ার সিনেমা ঘরে ঘরে চলছে। ইউটিউবে ভুরি ভুরি সিনেমা। এর বাইরে টরেন্ট ডাউনলোড করে যে কোন সিনেমা দেখা যাচ্ছে। স্মার্ট টেলিভিশনে সরাসরি অনলাইন থেকে সিনেমা দেখা যাচ্ছে।

আসল সিনেমা দেখার পর সেই গল্পে বানানো নকল সিনেমা দেখার কোন মানে হয় না। এ কারণেই নকল সিনেমা দিয়ে ব্যবসা করার যুগ শেষ হয়ে আসছে। সামনের দুনিয়ায় আসল গল্প বা চিত্রনাট্য দিয়ে সিনেমা না বানাতে পারলে আর ভাত নাই। আমেরিকা আন্তর্জাতিক একটা কপিরাইট আইন করার চেষ্টা করছে। ওটা যদি তারা করে ফেলতে পারে, তাহলে যারা গল্প, গান, কবিতা ও সফটওয়্যার চুরি করবে, তাদের জেলের ভাত খেতে হবে। নকলের দিন শেষ হয়ে যাবে একেবারে।

আমরা প্রায়ই শ্লোগান দিই – জয় হোক বাংলা সিনেমার। সত্যি সত্যি যদি আমরা বাংলা সিনেমা জয় দেখতে চাই, তাহলে অবশ্যই দেশীয় মৌলিক গল্পের দিকে মনোযোগ দিতেই হবে। কোটি টাকার সিনেমায় চিত্রনাট্যের জন্য এক লাখ টাকাও বাজেট থাকে না। এইভাবে হবে না। চিত্রনাট্য বা গল্পের জন্য খরচ করতে হবে। যেই চিত্রনাট্যের উপর ভিত্তি করে সিনেমাটা হবে সেটা ফ্রি পাওয়ার চিন্তা অবশ্যই অপেশাদার। অপেশাদার চিন্তা দিয়ে আন্তর্জাতিকমানের সিনেমা কিভাবে হবে ?

যখন চিত্রনাট্য লিখে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা যাবে, তখন অনেকেই এটাকে পেশা হিসেবে নেবে এবং প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। নতুন নতুন মেধাবী চিত্রনাট্যকার তৈরি হবে। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র ১৭ জন মেধাবী চিত্রনাট্যকার তৈরি করতে পারলে আমাদের নকল গল্পে সিনেমা বানাতে হবে না। আমি কঠিনভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দেশে প্রচুর মেধাবী লেখক আছেন, যাদের টাকা দিলে মৌলিক গল্প লিখে ফাটিয়ে দিতে পারবেন।

আরেকটা কথা, মেধাবীদের টাকা না দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না এলে আমাদের সিনেমার জয় কোন দিনও হবে না। চিত্রনাট্যের পেছনে টাকা ঢালেন, অবশ্যই বাংলা সিনেমার জয় হবে।

জয় হোক বাংলা সিনেমার।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইনের লিংক দিলাম। উৎসাহী হলে পড়ে দেখতে পারেন –

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন