রূপবৈচিত্র্যের পারিল

সময়ের পরিক্রমায় দর্শকের চাহিদায় ভিন্নতা এসেছে; সেই সাথে মিডিয়াপাড়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে নবীন নির্মাতার আগমন। কিন্তু তারপরেও মান সম্মত নির্মাণের অভাব যেন কাটছেই না। প্রি-প্রোডাকশন, প্রোডাকশন, পোস্ট প্রোডাকশনসহ বেশ কয়েকটি ধাপের যথোপযুক্ত সমন্বয় মানসম্মত নির্মাণের পূর্বশর্ত। আর প্রি-প্রোডাকশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লোকেশন রেকি।
পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এবারের আউটিং এর গন্তব্য পারিল। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের এক নিভৃত পল্লী পারিল। গাবতলি বাসস্ট্যান্ড থেকে সিংগাইর এর লোকাল সিএনজি চেপে পারিল যেতে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা খরচ হবে; সব মিলিয়ে সময় লাগবে মোটামুটি এক থেকে দেড় ঘণ্টা।

৯ নভেম্বর, ২০১৮ শুক্রবার। অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে প্রথমবারের মত পারিল এর উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম। সাথে প্রিয় ক্যামেরা। ঘড়ির কাঁটা বলছে তখন প্রায় ৮টা। পূবের আকাশ আচ্ছাদিত কুয়াশার চাদরে। রাজধানীর বাংলামোটর থেকে বাসে করে যখন গাবতলি পৌঁছাই তখনো কুয়াশা পুরোপুরিভাবে কাটেনি। প্রাতরাশ সেরে গন্তব্যের দিকে যাত্রা করার পালা। এরমধ্যেই কুয়াশার চাদর সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে সূয্যিমামা। লোকমুখে পারিল এর অপরূপ শোভার কথা শুনেছি; হয়েছি মুগ্ধ। মাঝেমধ্যেই কল্পনার ফ্রেমে ধরা পড়তো। কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি ছবির মত সুন্দর এ গ্রামটিতে।
গাবতলি থেকে জনপ্রতি ৮০/- করে লোকাল সিএনজিতে করে সিংগাইর এর দিকে রওনা হলাম।
মানিকগঞ্জ পৌঁছে সিংগাইর এর দিকে ঢুকতেই গ্রামীণ একটি আবহ যেন জড়িয়ে ধরে। যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে যতদূর দৃষ্টি যায় নান্দনিক সব গ্রামীণ চিত্র ফুটে ওঠে; এ যেন শিল্পীর রং তুলিতে আঁকা জীবন্ত সব চিত্র। যেতে যেতেই চটজলদি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ফ্রেম ধরে কয়েকটা ক্লিক। সিংগাইর বাজার পৌঁছাতেই ব্যস্ত হাটুরেদের আনাগোনা চোখে পড়ার মত। এখানে সেখানে নেমে আর সময় নষ্ট না করে বলধারার দিকে এগুলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বলধারানা করে বলধারার দিকে এগুলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বলধারা ইউনিয়নে এসে পৌঁছালাম। এবার তিন রাস্তার মোড়ে এসে পাইলট সাহেব কনফিউজড, সিএনজি চালক স্থানীয় হওয়া সত্তে¡ও গ্রামে ঢুকার সঠিক রাস্তা চিনতে কষ্ট হয়। স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিয়ে চলতে শুরু করি গন্তব্যের দিকে। যাত্রা শেষ করে যখন পারিল পৌঁছাই ততক্ষণে কুয়াশা কেটে গিয়ে শীতের আগমনি বার্তা নিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে হেমন্তের মিষ্টি রোদ। ঘাসের বুকে তখনো লেগে আছে নবীন শিশির বিন্দু। পাড়াগাঁয়ের মাটির গন্ধ নাকে লাগছে। মনে হচ্ছে চারদিকের সবুজের সজীবতা নিজের মধ্যেই সঞ্চারণশীল।
রূপবৈচিত্র্যের প্রিয় বাংলায় প্রতিটি ঋতু আপন বৈশিষ্ট্যের সৌন্দর্য্য মায়ায় প্রেমিক হতে বাধ্য করে যে কাউকে। জীবন ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের নান্দ্যনিক সব চিত্র যেন ধরা পড়ে বাংলাদেশের পল্লী জনপদে। প্রথমবারের মত পারিল পৌঁছে নিজেকে প্রকৃতির নান্দ্যনিক শোভার মাঝে আবিষ্কার করলাম। সৌন্দর্য্য সম্ভোগের মোক্ষ্যম মুহুর্তে ক্যামেরা নিয়ে যথারীতি আপন কাজে মনোনিবেশ করলাম। ক্লিক করতে করতেই এগুতে থাকলাম গ্রামের আরো গভীরে। বাজারের দু’পাশ দিয়ে দুটো রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের একদম ভেতরে। মজার ব্যাপার হলো যেকোনো একটি রাস্তা দিয়ে ঢুকে গ্রামের রূপরেখা অবলোকন করে অন্য একটি রাস্তা দিয়ে আবার বাজারেই ফিরে আসা যায়। খানিকদূর এগুতেই একটি কালভার্ট চোখে পড়ে; যার উপর দাঁড়িয়ে দৃষ্টি অবনমিত করলেই ছোট্ট খালের হাঁটু পানিতে মাছ ধরা, খালের পাড়েই বাঁধা খেয়াতরী; সরুপথ ধরে গাঁয়ের ভেতরেই আপন গতিতে বয়ে চলার শৈল্পিক চিত্র ধরা পড়ে। কালভার্ট থেকে নেমে আঁকাবাঁকা পথে চলতে চলতে চোখে পড়ে ছোট্ট ছেলে মেয়েদের দস্যিপনা। ক্যামেরা দেখেই সবকয়টা একসাথে হুড়মুড়িয়ে পড়ে। তাদের দুষ্টুমি ধরা পড়ে আমার ক্যামেরায়। এটা বুঝে ফেলায় একজন ছাড়া বাকি সব দৌঁড়ে পালায়। অন্য ছেলেটির কাছে গিয়ে ছবি দেখালে সে অন্যদেরও ইশারা দেয়। সব দস্যি একযোগে তাদের দস্যিপনা দেখে বেজায় খুশি। দস্যিদল থেকে বিদায় নিয়ে আরেকটু এগুতেই গাঁয়ের শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রামী জীবন কথাচিত্র ভেসে ওঠে। পথের বাঁকে বাঁকে ফুটে থাকা বুনোফুল হাত বুলিয়ে খানিক ভেতরে এগুতেই হেমন্তের নতুন ধান মাড়ানোর গন্ধ নাকে এসে আলতো করে ছুঁয়ে যায়। মোহমুগ্ধে আগ্রহী হয়ে কাছে যেতেই দেখা যায় পল্লী রমণীর কর্মব্যস্ততা। মমতাময়ী মায়ের সান্নিধ্য ছাড়ে না খোকা। তাই তো তার সবচেয়ে প্রিয় বাইসাইকেল চালিয়ে মায়ের আশেপাশেই ঘুরঘুর করে। মা ছেলের মায়ার বাঁধন অমোচনীয় স্মৃতির ফ্রেমে ধরে রাখতে তীর্থের কাক হয়ে প্রায় ২৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রতীক্ষার প্রহর পার করেও প্রতীক্ষিত বন্ধনচিত্র না পেয়ে মন খারাপ; পরক্ষণেই খোকার কাছে গিয়ে স্বল্প আলাপচারিতায় মনটা ভালো হয়ে যায়। খোকার কাছে জানতে চাই, ‘বড় হয়ে কি হতে চাও?’ জবাবে খোকা বলে, ‘আমার মায়েরে সবচেয়ে বেশি সুখী করতে চাই।’ তৎক্ষণাত নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয় এই ভেবে; পৃথিবীর সেরা মায়ের সন্তানের সাথে পরিচয় হয়েছে। আরও বেশি ভালো লাগে কিছুটা হলেও তাদের মমতার বন্ধনের চিত্র ধারণ করা সম্ভব হলো বলে।
খোকা থেকে সেদিনের মত বিদায় নিয়ে মেঠো পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফসলী জমির ধার ঘেঁসে এগুতে গিয়ে দেখি জমিতে খুব ব্যস্ত সময় পার করছে চাষীরা। কেউ পাকা ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে; কেউবা আবার নতুন করে জমি প্রস্তুত করে নিচ্ছে। কিছুদূর এগিয়ে গ্রামের আরও গহীনে গেলে প্রকান্ড এক বটগাছ চোখে পড়ে। শতবর্ষী অতিকায় এ উদ্ভিদ বহুকালব্যাপী এই পারিলেরই নানাকিছুর সাক্ষী হয়ে আছে; যেন আপন রাজত্বে রাজ করে চলেছে। গ্রামের লোকের কাছে শোনা যায়, প্রাচীন এ গাছকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে নানা আসর জমে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনেক লোকের সমাগম হয় সেখানে। গানের আসর, মেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানকে ঘিরে গ্রামের মানুষদের মধ্যে উৎসবের ছোঁয়া লাগে। তাদের সহজ-সরল জীবনযাত্রায় বাড়তি মাত্রা যোগ করে এই উদ্ভিদরাজ।

অপরূপ শোভায় শোভিত পারিল গ্রাম এর উপাদানগুলো সৃষ্টিকর্তা যেন নিজের হাতে বসিয়ে দিয়েছে। রূপবৈচিত্র্যে অনন্য এ গাঁয়ের মানুষগুলোও সহজ-সরল, নিষ্কলুষ ও দারুণ অতিথিপরায়ণ। কারও সাথে পূর্বপরিচয় না থাকলেও প্রথম আলাপে কত আপন করে নেয়!
বিকেলের দিকে জমে ওঠে পারিল এর বাজার; যে বাজার এর পাশের রাস্তা দিয়ে শুরু করেছিলাম তার কথাই বলছি। আলমের ১নং পঁচা চা, করিম শেখ এর পিঁয়াজু আর স্থানীয় মিষ্টির আয়োজন তো আছেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পূর্বে বাজার যেন স্থানীয় সংসদে রূপ নেয়। একেক জন একেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে চলে অবিরাম। কখনো আবার লাগামহীন যুক্তিতর্কে দোকানগুলো সরগরম হয়ে ওঠে।
ভাষা শহীদ রফিক এর স্মৃতিবিজড়িত; আলোকচিত্রীদের তীর্থস্থান খ্যাত গ্রাম বাংলার প্রতিনিধিত্বকারী ‘পারিল’ কে একদিনে চেনা সম্ভব নয়; কেননা ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে এ যে নতুনত্ব নিয়ে বারবার উত্থিত হয়। পারিলে আসতে চাই পরের গ্রীষ্মে কিংবা বর্ষায়। সম্ভব হলে সব ঋতুতে একবার করে।

——-

ইহতিয়াজ ত্বকী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগঠক