কান্ডারী: দীপংকর দাশ

বাতিঘর, এক বইয়ের জগৎ। থরে থরে সাজানো বিশাল সব তাকে হাজার হাজার বই। একটু পরপরই বসার জায়গা। চাইলে কফির ব্যবস্থাও রয়েছে। কফি খেতে খেতে বই পড়–ন। ইচ্ছে হলে কিনে নিয়ে যান। এমন অসাধারণ আইডিয়াকে বাস্তবে যিনি রূপ দিয়েছেন- দীপংকর দাশ, তিনিই আমাদের এই সংখ্যার কান্ডারী।

আমি যখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে কাজ করি তখন দেখলাম আমাদের চট্টগ্রামে যারা পাঠক আছেন বা যারা আমার বন্ধু বান্ধব ছিলেন তারা আসলে যে ধরণের বই পড়তে চাইছিলেন সেসব চট্টগ্রামে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এই প্রয়োজন উপলব্ধি করার পর থেকেই মূলত কাজ শুরু করা। একটা ছোট স্পেস খুঁজছিলাম, যদিও বাতিঘর নামটা আরো আগেই চিন্তা করে রেখেছিলাম। একটু কন্সেপচুয়াল নাম এর জন্য বিভিন্ন কবিতার বইয়ে খুঁজতে লাগলাম, কারণ কবিতায় অনেক সুন্দর সুন্দর শব্দ থাকে। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি নাম পছন্দ হলো, শেষে সবাই মিলে বাতিঘর নামটা ঠিক করলাম। ২০০৫ সালের ১৭ জুন চেরাগী পাহাড় মোড়ে একটি ছোট জায়গা নিয়ে শুরু করি এবং ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে বড় পরিসরে শুরু করি বাতিঘর। এরপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বাতিঘর যাত্রা শুরু করে, এ বছর ফেব্রæয়ারীতে সিলেটে উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে।
আমার একক প্রচেষ্টা হলেও বাতিঘরের শুরু থেকেই সবকিছু আমি পাঠক কিংবা বন্ধু বান্ধবদের জানিয়ে, তাদের মতামত নিয়ে করেছি। তাই এক্ষেত্রে ‘আমরা’ বলতে বেশি পছন্দ করি আমি।
চ্যালেঞ্জ বলতে একটাই ছিলো তা হলো মানুষ ভাবতো চট্টগ্রাম ব্যবসা বাণিজ্যের জায়গা, এখানে একটু অন্যধরণের সাহিত্য বা ননফিকশন বই নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। তখন যে সকল বুকশপগুলো ছিলো তারাও বেশ কষ্টে চলছিলো। আর আমরা যখন বইপাড়া আন্দরকিল্লা থেকে বেশ দূরে শুরু করি তখনও অনেকে বলছিলো যে এটা বেশিদিন টিকবে না। আমরা নিজেরাও খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই শুরু করেছিলাম, কিন্তু মাসখানেক চলার পর মনে হলো এটা বেশ ভালোই চলছে।
সাহসটা পেয়েছি পাঠকদের কাছ থেকে। তাদের সাথে কথা বলে, আড্ডা দিয়ে। যখন থেকে সংগঠন করি আমি বাতিঘর করার আরও প্রায় দশ বছর আগে মালঞ্চ সাহিত্য গোষ্ঠী, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ইত্যাদি তখন থেকেই পাঠকদের চাহিদা বুঝতে পারি, তারা কি বই পড়তে চায় বোঝার চেষ্টা করতাম। আমার ভরসার জায়গা ছিলো পাঠকরাই।

সরাসরি সমর্থনের কথা যদি আসে তাহলে অবশ্যই প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের নাম উঠে আসবে। কারণ তাঁর সাথে যদি আমার পরিচয় না হতো, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মত বড় পরিসরের জায়গায় যেতে না পারতাম তাহলে এত বড় চিন্তা করতে পারতাম না। আর স্যার সবসময় আমাদের বলতেন, ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়। দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করো। তখন থেকেই মূলত উদ্দীপনাটা পেয়েছি।
অনেক ছোটবেলা থেকেই গ্রামের বাড়ি পটিয়ায় সাহিত্য চর্চার সাথে যুক্ত ছিলাম, মোস্তাফিজুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরী ছিলো আমাদের সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র। কুসুমকলি আসর করতাম ধলঘাটে, পরে যেটা পটিয়াতেও করেছি। তারপর আস্তে আস্তে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে পরিচয়।
১৯৯৯ সালে আমি ঢাকায় যাই, প্রায় দুবছর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথে কাজ করার পর ২০০১ সালে ফিরে আসি চট্টগ্রামে। তখন এখানে ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করলাম ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীতে যেমন অনেক ধরণের বই আছে, পাঠকরা পছন্দ করছে এর পাশাপাশি এ ধরণের বই এর একটা নির্দিষ্ট বুকশপ দরকার যেখান থেকে পাঠক পছন্দের বই নিজের সংগ্রহে রাখতে পারবে।
সাহিত্য আন্দোলনের পাশাপাশি লেখালেখিও করতাম তখন বেশ। বিশেষ করে ছোটদের জন্য ছড়া ও গল্প লিখতাম। সেই সূত্রেই অনেক প্রবীণ সাহিত্যিক ও সংগঠকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। পটিয়ায় থাকাকালীন লেখালেখির চর্চা বেশি ছিলো কিন্তু ঢাকায় গিয়ে ব্যস্ততার কারণে আর হয়ে উঠেনি। কারণ তখন ভ্রাম্যমান লাইব্রেরীটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। কিন্তু আফসোস হয়নি কখনো, কারণ আমি দেখেছি লেখালেখি করার লোক অনেক আছে, কিন্তু একটা ভিন্ন জায়গায় কাজ করে নতুন কোন কিছুকে দাঁড় করানোর জন্য লোকের সংখ্যা খুবই কম। তাই অনেকটা স্বেচ্ছায়ই লেখালেখিটা ছেড়ে দিয়ে সংগঠনের দিকে মনোনিবেশ করি।
বাতিঘরের শুরুর সময়ে আমরা অল্প অল্প ব্যাংক লোন নিয়ে শুরু করি। একটা লোন শোধ করে আরেকটা করতাম, এভাবেই আস্তে আস্তে কনফিডেন্স বাড়তে থাকে।
সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায় আমার মতে, লেগে থাকা। পৃথিবীতে অনেক রকম ভাবনা আছে, অনেক কিছু করার আছে। সবকিছু আমি করতে পারবো না। আমাকে দেখতে হবে কোন জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। সেটাই করবো, এবং সেটা করার জন্য যা যা করা লাগে আমি তাই করবো। এ ধরণের দৃঢ়সংকল্প থাকাটা জরুরী।
দশ বা বিশ বছর পর বাতিঘরকে কোথায় দেখতে চাই তা আসলে এখন বলা মুশকিল। এমন কোন টার্গেটও কিন্তু নেই। আমি এখন বেশ অনিয়মিত বাতিঘরে এটা দেখার জন্য যে আমি ছাড়া এটা ঠিকঠাক চলছে কিনা। ফলাফল পজিটিভ। আমি দেখছি যে, আমি ছাড়াই এটা চলছে, বোঝা গেল আমি ঐ পর্যায়ের কর্মী তৈরী করতে সক্ষম হয়েছি। সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারেও খুব বেশি পরিকল্পনা নাই, হলে হয়তো হবে। আমরা ‘ধীরে চলো’ নীতিতে বিশ্বাসী। চট্টগ্রাম, ঢাকা এরপর সিলেট হলো। এভাবে হয়তো একসময় সারাদেশে হবে।
বাতিঘরের মাধ্যমে নতুন পাঠক তৈরী হচ্ছে এটা ভাবতে বেশ ভালো লাগে। সংখ্যাটা শহরে অবস্থানরত নাগরিকদের তুলনায় আরো বাড়বে এই প্রত্যাশা করি।

সাক্ষাতকারঃ ইসমাইল চৌধুরী | অনুলিখনঃ শারাফাত আলী শওকত