চলচ্চিত্রের বিতর্কিত সরকারি অনুদান নিয়ে হাইকোর্টের রুল

স্বল্প ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের করা সরকারি অনুদানের তালিকা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবেনা, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে নীতিমালা অনুযায়ী ওই অনুদানের নতুন তালিকা করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবেনা রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।

জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বুধবার (৩১ জুলাই) বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে রিট আবেদনকারীগণের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

এর আগে গত ১৬ জুলাই ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চলচ্চিত্রে প্রদত্ত সরকারি অনুদান স্থগিত ও পুনঃ নীরিক্ষণের জন্য হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন চার নির্মাতা। তারা হলেন— এ অর্থবছরে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদানের জন্য আবেদনকারী চলচ্চিত্র গবেষক ও লেখক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদানের জন্য আবেদনকারী চলচ্চিত্র নির্মাতা অদ্রি হৃদয়েশ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সুপিন বর্মন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা খন্দকার সুমন। জনস্বার্থে দায়ের করা রিটে তারা অনুদানের ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও অসচ্ছতার অভিযোগ এনেছেন।
রিটে অনুদান নীতিমালা লঙ্ঘন করে ৩টি প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে মোট ১৪টি চলচ্চিত্রের অনুদানের ঘোষণা স্থগিত ও জমাকৃত সকল চলচ্চিত্র নির্মাণ প্যাকেজ প্রস্তাব পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন জানানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ২৮ এপ্রিল চলতি অর্থ বছরে চলচ্চিত্রের জন্য সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু গড় মিল হয়েছে বলে উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন চূড়ান্ত অনুদান কমিটির চার সদস্য- মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মোরশেদুল ইসলাম ও ড. মতিন রহমান। যদিও পরবর্তীতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের ভিত্তিতে তারা পুনরায় যোগ দেন।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র, দুটি প্রামাণ্যচিত্র ও সাধারণ শাখায় ছয়টি চলচ্চিত্রকে অনুদান প্রদান করা হয়। শিশুতোষ শাখায় অনুদান পেয়েছে আবু রায়হান মো. জুয়েলের ‘নসু ডাকাত কুপোকাত’। প্রামাণ্যচিত্র শাখায় অনুদান পেয়েছে হুমায়রা বিলকিসের ‘বিলকিস এবং বিলকিস’ এবং পুরবী মতিনের ‘খেলাঘর’।

সাধারণ শাখায় কবরীর ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছাড়াও অনুদান পেয়েছে মীর সাব্বিরের ‘রাত জাগা ফুল’, আকরাম খানের ‘বিধবাদের কথা’, কাজী মাসুদের প্রযোজনা ও হোসনে মোবারক রুমির ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’, লাকী ইনামের প্রযোজনায় হৃদি হকের পরিচালনায় ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ এবং শমী কায়সারের প্রযোজনায় ‘স্বপ্ন মৃত্যু ভালোবাসা’।

আদালতের রুলে চলচ্চিত্রকর্মী ও নির্মাতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত প্রামান্য চলচ্চিত্র ‘বক্তাবলীর কান্না’র চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক শাহজাহান শামীম বলেন, “বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনা অনুদান নীতিমালায় এবং চর্চায় একটা বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছি।”

মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ও চলচ্চিত্র লেখক-সংগঠক বেলায়াত হোসাইন মামুন এ প্রসঙ্গে বলেন, “খবরটি দুঃখজনক। চলচ্চিত্র কর্মীদের আদালত পর্যন্ত যেতে হচ্ছে, এমনটা না হলেই ভালো হত। তবে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য আদালতে যেতে হলেও যাওয়া সাহসী তৎপরতা।” তিনি আরও বলেন, “লড়াইকে স্বাগত জানাই। এই লড়াইয়ের লড়াকু চলচ্চিত্রকর্মী ৪ জনকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুদ্ধতার জন্য এই লড়াই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রতিবছরই অনুদান নিয়ে নানা অনিয়ম ও অসচ্ছতার অভিযোগ এলেও চলতিবছর এর মাত্রা ছাড়িয়েছে উল্লেখ করে আবেদনকারী খন্দকার সুমন বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদানে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ সকল সীমা ছাড়িয়েছে। আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে অনুদান প্রদানের প্রক্রিয়ায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান প্রদান নীতিমালা এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান প্রদান নীতিমালার বহু নিয়ম লঙ্ঘন করে এ বছর ৩টি প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে মোট ১৪টি চলচ্চিত্রকে অনুদান প্রদান করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই যথার্থ নয় বলে আমরা মনে করি।” তিনি আরও বলেন, “আমরা আদালতে আমাদের যাবতীয় তথ্য-বিশ্লেষণ ও গণমাধ্যমের নানা প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছি। আশা করছি আদালত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিবেন।”