নিখোঁজ ঠিকানা

“আসসালাতু খায়রুন মিনান নাওম” অর্থাৎ “ঘুম থেকে নামায উত্তম” মুয়াজ্জিনের আযানের সময় এই বাক্যটি যখন উচ্চারিত হয়েছিল ঠিক তখনই আমার ঘুম ভাঙে। কোন দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাংগেনি আশে-পাশের শোরগোল শুনে ঘুম ভেঙেছে। শোরগোলের কারণ জানার জন্য আমি ঘর থেকে বের হলাম। বাইরে প্রচন্ড শীতে আমি জমে যাচ্ছিলাম। এখনো মাঘ মাস আসেনি তাও এত শীত যে পা জমে যাচ্ছিল। সব উপেক্ষা করে আমি ঘর থেকে বের হলাম। আমাদের গ্রামটার নাম হাসানপুর। এই গ্রামে এতদিন পর আনন্দ উল্লাস। আনন্দের কারণ ঢাকা থেকে খবর এসেছে গতকাল পাকিস্তানিরা আত্নসমর্পন করেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। মা নামাযের প্রস্তুতি নিতে নিতে আমাকে বললেন, ‘কি হয়েছে রে বাবা?’
আমি বললাম, ‘মা দেশ স্বাধীন হয়েছে’।

মা ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলে, নামায শুরু করলেন। যেন দেশ স্বাধীন হবে এটা মা আগে থেকে জানতেন। আমি জানি মা, এখন নফল নামায পড়বেন।

সালাম ফিরিয়ে মা আমাকে বললেন, ‘যা তোর বাবাকে ডেকে তোল, বাজারে যেতে হবে। আনিস কতদিন পর আসবে। জানি না এতদিন কি না কি খেয়েছিল।’

আমি বাবাকে ডাকতে চলে গেলাম। সবাই যখন খুশি আমি তখন খুশি না। একটা গোপন কথা আমার গলায় মাছের কাঁটার মত বিঁধে আছে। গোপন কথাটা হচ্ছে আমার ভাই আনিস যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। মা-বাবা থেকে এতদিন কথাটা লুকিয়ে রেখে আজ নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। আমি নিরাশাবাদী মানুষ, ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হবে না। এক সময় আমরাও মারা পড়ব। মাঝে মাঝে বাবা-মাকে সন্তান হারা শোক দিতে চাইনি। বাবা-মার মত আমিও চাইছি ভাইয়া আজ ফিরে আসুক মাকে আবদার করে বলুক ‘মা ছোট মাছ আর গরম ভাত খাব’, ‘একটা ডিম ও ভেজে দাও তো মা’।

জানি মা অনেকদিন হয়ত খাবার সাজিয়ে ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করবে। বাবাও বাজারে যাবে। আর রাতে সবাই উপোস থেকে ঘুমোতে যাব। হয়ত একদিন আমি এই সব সহ্য করতে না পেরে মা-বাবাকে অপ্রিয় সত্যটা বলে দেব। পরিবারের সব অপ্রিয় কাজগুলো পরিবারের ছোট ছেলেদেরই করতে হয়।

গল্পকার: সোলায়মান সোহেল | অলংকরণ: লিমা

Notice