পথের গল্প

একটা সময় চিঠি সংগ্রহ করতাম। করগেটেড কাগজের বাক্সে সযত্নে জমিয়ে রাখতাম। এখন আর করি টরি না। চিঠি লেখার চল উঠে গেছে, তাই আসেও না, সংগ্রহও করা হয় না। অনেকদিন পর ফাইল দস্তাবেজ ঘাঁটতে গিয়ে একটা পুরনো চিঠি পেলাম। চিঠিটা খুলে দেখি কাঁচা হাতে তিনটে মাত্র লাইন লেখা।
কাকু,
কেমন আছো? এতো তাড়াতাড়ি আমাদের ভুলে গেলে! আগামী কাল থেকে আমার পিএসসি পরীক্ষা শুরু। দুয়া (দোয়া) করো আমি যেন ভালো ফলাফল করি। চিঠি দিও।
মিলি,
জানালার ভাঙা কাচ দিয়ে একটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে যেন ঝাপ্টা দিল আমাকে। সঙ্গে বৃষ্টির ছাট। দুলে উঠি বাসের ঝাঁকুনিতে। একবার ইচ্ছে হলো কন্ডাক্টারকে ডেকে এনে আচ্ছাসে ধমক লাগাই। আবার মনে হলো, থাক। এই মায়ামাখা বাতাসের ঝাপ্টাটা উপভোগ করি না কেন। বাসের দুলুনি আর ঠাণ্ডা বাতাসে ঘুম ঘুম একটা আবেশ চলে আসে। কিন্তু ঘুমাবার জো নেই। আড্ডা খুব জমে উঠেছে। বিশ্বকাপের উত্তাপে বাসের ভেতরটা বলক দিচ্ছে। ব্রাজিল আর্জেন্টিনা দুটো শিবিরে বিভক্ত তার্কিকগণ। একদল একটা কিছু বললে আরেক দল উত্তর দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
– হ্যাঁ হ্যাঁ আপনারা তো আর পা দিয়ে গোল দিতে পারেন না, হাতই আপনাদের ভরসা।
– ফুটবল সম্পর্কে যদি ন্যুনতম কোন জ্ঞান থাকত তাহলে এ কথা আপনি মুখ ফুটে বলার সাহস পেতেন না।
– ফুটবলের কোন বইতে হাত দিয়ে গোল দেয়ার কথা লিখা আছে আমাকে একবার দেখাতে পারবেন। 
বয়স্ক মানুষের ছেলেমানুষি দেখে হাসি পায়। কোথাকার কোন দুটো অচেনা দেশের জন্য কী আবেগ না মানুষজনের। ইশ, এদের দেশটাই যদি খেলত বিশ্বকাপে, কী রকম হতো তাদের আবেগের স্ফূরণ! যাত্রীদের মধ্যে যাদের ফুটবল নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই তারা তারিয়ে তারিয়ে মজা লুটছে। কথার পিঠে কথা সাজানোর খেলা দেখছে তারা। মানুষগুলোর উচ্ছল মুখ দেখি। হতাশা বা ক্লান্তির কোন ছাপ নেই সেখানে। অনেক দিন হয় এদের সঙ্গে যাওয়া আসা করি। সবার সঙ্গে কমবেশি ঘনিষ্টতা হয়েছে। সবারই কিছু না কিছু গল্প আমার জানা। সবার বুকের ভেতরে হতাশার একটা কুণ্ডুলী পাকানো সরীসৃপ আছে। অনুকূল পরিবেশ পেলেই ফোঁস করে ওঠে। কিন্তু এই ঘন্টা খানেকের বাসযাত্রায় এর বহি:প্রকাশই ঘটে না কারো মধ্যে।
আসলে গাড়িটা বটেশ্বর ছেড়ে এলেই জীবন অন্যরকম। এ যেন অন্য ভূবনের ডাক। তৈল চিক্কন শরীরের মতো মসৃণ রাস্তার দু’পাশে থৈ থৈ জল, উপরে কষ্টি পাথরের মতো জমাট কালো আকাশ, বৃষ্টির ছাটে ঝাপসা চারিধার, মাঝে মাঝে দূরে উঁকি দেয় মেঘের বুদবুদ ছড়ানো খাসিয়া পাহাড়ের সারি, আর বাসের ভেতরে জম্পেশ আড্ডা। দেখে মনে হবে এ যেন জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো কিছু সুখী মানুষের স্বতন্ত্র আয়োজন। অথচ জীবনের দায়েই পথে নেমেছে এরা। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সকালে অন্যরা যখন সুখনিদ্রায় বিভোর এরা তখন ছুটছে জীবিকার সন্ধানে।
এদের বেশির ভাগই স্কুল কলেজের শিক্ষক। শহর থেকে গিয়ে গ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ায়। আসা যাওয়ার পথেই এদের জীবনের গল্প চলতে থাকে। চলার গতিতেই এদের জীবনের গতি ধরা পড়ে। যেমন হরিপুর স্কুলের কেমেস্ট্রির টিচার লোকনাথ এখন আর আসেন না। তাঁর চাকরি হয়ে গেছে ফুডে। আবার কানাইঘাট প্রাইমারির মাধবীর না আসার কারণ চাকরি ছেড়ে দেয়া নয়, নতুন বিয়ে হয়েছে গোয়াইন ঘাটে। এখন সে সেখান থেকেই আসা যাওয়া করবে। দরবসের একটু পরেই ডিগ্রি কলেজ। এখানে নামেন কিবরিয়া, নিতাই, কামরুলসহ আরো কয়েকজন টিচার। এদের মধ্যে নিতাই এখন আর ন’টার বাসে ওঠে না। সে আটটার বাসে গিয়ে প্রথম দিককার ক্লাসগুলো করে দ্রুত শহরে ফিরে আসে। কারণ শেয়ারের বাজার জমে উঠেছে। এই সুযোগে বাড়তি কিছু পয়সা যদি কামিয়ে নেয়া যায়। এরকম অনেক অনেক ছোট ছোট গল্পের সমীকরণ নিয়েই তৈরি হত আমাদের প্রতিদিনের পথের গল্প। এই গল্পের একটা বিশেষ চরিত্র ছিল মিলি। বহুদিন পর কুড়িয়ে পাওয়া তার চিঠিটা সেই সুখার্দ্র দিনগুলোতে আমাকে ফিরিয়ে নিল।
মিলির সঙ্গে প্রথম কবে দেখা হয়েছিল সেটা বলা মুশকিল। তবে স্থানটা যে এই চার চাকার উপরিতলের জমিন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিলির মা জুলেখা আপা সারিঘাট প্রাইমারি স্কুলের এসিস্টেন্ট টিচার। থাকেন রায়নগর আম্বিয়া ভিলায়। শিবগঞ্জ পেট্রল পাম্পের কাছে এলে আমাদের বাসটা ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। গীতালি, নীহারিকাদের সঙ্গে জুলেখা আপাও উঠেন এখান থেকে। এর মধ্যে একদিন আবিস্কৃত হলো জুলেখা আপার স্ফীত উদরে কারো অস্তিত্ব। তার পর বাসে উঠতে নামতে আমরাই তাকে সাহায্য করি। কিছু দিন পর তিনি চলে গেলেন মেটারনিটি লিভে। দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এলেন চাঁদের মতো ফুটফুটে একটা মেয়েকে কোলে নিয়ে। সবাই মিলে ওর নাম রাখা শুরু হলো। আমি নাম দিয়েছিলাম শ্বাশতী। শেষমেশ মেয়ের নাম স্থির হলো মিলি। মায়ের ডাক নাম ময়নার ম নিয়ে মিলি। প্রতিদিন ঘরের কাজ সেরে মিলিকে নিয়ে উঠে পড়েন বাসে। বিকেল পর্যন্ত ছাত্র পড়িয়ে আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসেন বাসায়। এই আসা যাওয়ার মধ্য দিয়ে এক রত্তি মেয়েটা বড়ো হতে লাগল। আধো আধো বোল ফুটল মুখে। আমাদের আনন্দযাত্রার সেও এক সভ্য হয়ে উঠল।
বছর চারেক হতে মিলিকে ভর্তি করে দেয়া হলো তার মায়ের স্কুলে। সঙ্গে প্রায় তার বয়সী কাজের মেয়েটি। মাঝে মাঝে কথার ছলে ওকে ছড়া বলতে বলি। হাত পা নাচিয়ে মিলি ছড়া বলে। এটা ওটার ইংলিশ বলে চমকে দেয় সবাইকে। সেটেলমেন্ট অফিসার বক্কর সাহেব বাড়ি থেকে ফেরার সময় তালের পিঠা নিয়ে আসেন মিলির জন্য। জুলেখা আপা না না করলেও মিলি অধিকার মনে করেই তা গ্রহণ করে। ডিগ্রি কলেজের কিবরিয়া ভাই মিলিকে কোলে নিলে অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। এর পেছনে কি কাহিনী তা আমাদের কারো জানা নেই। মোট কথা আমাদের আনন্দযাত্রায় মিলি এক অপরিহার্য উপদান হয়ে ওঠে। অনেকটা র‌্যামব্রান্টের নাইটগার্ড ছবির ফুটফুটে মেয়েটার মতো। ছবির পুরো আলো যেন ঢলে পড়েছে খুকিটির ওপর।
একবার হরিপুরের বিলের মাঝে এসে বাস উল্টে গেলো। ড্রাইভার যাত্রীদের কথা না ভেবে প্রথমেই বেরিয়ে গেলো জানালা দিয়ে। লোকজন চিৎকার করে ড্রাইভারের বাপান্ত করা শুরু করল। চিৎকার যখন থামল তখন শোনা গেলো জুলেখা আপার আর্তি, মিলি কই? সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে খুঁজে মিলিকে। পরে দেখা যায় ড্রাইভারের কোলে মিলি। মুহূর্তে সবার আক্রোশ জল হয়ে গেলো ড্রাইভারের উপর থেকে। এভাবে আমাদের স্নেহে পথে পথেই মিলি বড়ো হতে থাকে। স্কুলে লম্বা বন্ধ হলে আমরা মিলিকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে ওঠি।
জুলেখা আপা আমাদের কাণ্ড দেখে হাসে, বয়স তো চলে যাচ্ছে- এবার স্যার একটা বিয়ে শাদী করেন।
কিবরিয়া ভাই হাসতে হাসতে ভেঙে পড়েন। স্মৃতিকণার দিকে ইশারা করে বলেন, স্যার তো বিয়ে করতেই চায়, একটা পাত্রী দেখে দেন না।
না না ভাই, চাকরিজীবী মেয়ে বিয়ে করবেন না। বাচ্চা কাচ্চাদের খুব সাফারিংস হয়।
কী মজা মামার বিয়ে খাবো… মিলি তালি দিয়ে দিয়ে ছড়া কাটে।
স্মৃতিকণা বনেটের পাশের মহিলা সিটে বসে ড্যাব ড্যাব করে তাকায়।
নীহারিকা, গীতালি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুখ টিপে হাসে।
তারপর থেকে স্মৃতিকণা ও আমাকে নিয়ে বাসে গল্প তৈরি হতে শুরু করে। অস্বীকার করব না সে আমার মনে একটা আলোড়ন তুলেছিল। শুনতাম সেও নাকি না এলে আমার খোঁজ নিত। কিন্তু সাহস হলো না এগুতে। স্মৃতিকণা খাসিয়া সম্প্রদায়ের মেয়ে। এরকম একটা অসম অবস্থানের সম্পর্ক পরে কি পরিণতি নিয়ে আসবে এই শংকায় আর গল্প এগুলো না।
বাসে নতুন নতুন মানুষ আসে; পুরনো মানুষগুলো চলে যায়। এই নিয়মে স্মৃতিকণাও একদিন হারিয়ে যায়। তার সেই ভাসা ভাসা চোখ দুটো ভুলতে আমার সময় লেগেছিল। পরে একবার সায়েদাবাদে দেখা হয়েছিল। অভিমানী চোখ করে তাকালো আমার দিকে। যেন সব অপরাধ আমারই! তার পর কিছুদিনের জন্য এলেন বুড়ো সাব রেজিস্টার। মুজিবনগর কোটায় শেষ বয়সে একটু গদিওলা চেয়ারে বসার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সারা যাত্রাপথ মজার মজার গল্পে উপভোগ্য করে তুলতেন। তবে সমস্যা একটা ছিল, বাস থামিয়ে তাকে মাঝে মাঝে জলবিয়োগের সুযোগ করে দিতে হতো। এতে যাত্রীরা বেশ বিরক্ত হতো।
এতো কিছুর মাঝেও জীবনকে নিয়ে ভাবলে হাঁপিয়ে উঠি। হিসেব মেলে না। ভার্সিটি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এই অজোপাড়া গায়ে পঁচে মরার অর্থ কী? আমার সাথের কলিগরা জেলা সদরের স্কুলে পড়িয়ে বাড়ি গাড়ি করে ফেলছে, আর আমি আমার ক্যারিয়ারটা মেঘ পাহাড় দেখে নষ্ট করে ফেলছি। পায়ের নিচে মাটি নেই মনে হয় মাঝে মাঝে। বদলির জন্য ডিডি অফিসে ঘুর ঘুর করি। ক্ষমতাবান কাউকে পেলে নিবেদন জানাই। এতেই একদিন কাজ হলো। দূর শহরের একটা ভালো স্কুলে বদলি হয়ে গেলাম। সেই সহযাত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটল। প্রয়োজনে এর ওর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। নইলে অনেকের নামই ভুলে গেছি দীর্ঘ যোগাযোগহীনতার কারণে। শুধু মিলিই রয়ে গেলো একটা জ্বলন্ত স্মৃতি হয়ে। কারণ অন্য অনেকের সঙ্গে জীবনচক্রের কোন একটা পর্যায় এসে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মিলির সঙ্গে যে সেটা হবে না তা নিশ্চিত।
চিঠিটার প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। চিঠি পেয়ে মিলির জন্য দুটো বই আর কিছু রঙিন পেন্সিল পাঠিয়েছিলাম কুরিয়ারে। পার্সেলটা পাঠাতে দেরি হয়েছিল, না তা পেতে- হলফ করে বলতে পারব না। তবে একদিন হঠাৎ জুলেখা আপার ফোন এলো। ভাই দোয়া করবেন, কাল মিলির রেজাল্ট দেবে।
পরের দিন আমার প্রতীক্ষা ছিল মিলির রেজাল্টের জন্য। স্কুল থেকে ফিরে খেতে খেতে দুপুরের খবর দেখা আমার অভ্যাস। টিভির স্ক্রলে জৈন্তাপুর শব্দটি দেখে চমকে গেলাম। সামনে গিয়ে পড়লাম খবরটি। সিলেটের জৈন্তাপুরে পাথর বোঝাই ট্রাক ব্রেক ফেল করে যাত্রীবাহী বাসের উপর উঠে পড়ায় পিএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৫ শিক্ষিকা নিহত। ছাত্রীটি এবার পিএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো।
——
জয়দীপ দে, অধ্যাপক-গল্পকার | অলংকরণ: লিমা
Notice