নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে

বাতাবির বয়স কত হবে? পাঁচ বা ছয়? এতটুকু মেয়ে বড়দের মত কথা বলা শিখেছে।ওর মা বলেন বাতাবি ওর বাবার মত হয়েছে।পৃথিবীতে আসার পর প্রথম সব কিছু বাবা থেকে শিখেছে।এই যে বাসার নিচে সিঁড়ি ঘরে লাগানো পোস্ট বক্সেটা কি এটা বাতাবি জানে।এখানে বাড়ির সবার চিঠি আসে।আবার এখানে “পাঠানোর জন্য” রাখা চিঠিগুলো জসীম চাচা ডাকঘরে দিয়ে আসেন।এই সবই বাবা বলেছেন।বাতাবি বাবাকে বলেছিল বাবা “আমাকে চিঠি লিখা শিখাবে”? বাবা বলেছিলেন” শিখাবো মা, তুমি আরেকটু বড় হও” এরপর আর বাতাবিকে ওর বাবা আনিসের চিঠি লিখা শিখানো হল না।ছমাস হল আনিস রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে।বাতাবি মাকে জিজ্ঞেস
করলে মা বলেন বাবা নাকি আকাশে চলে গেছেন।
আজ স্কুল থেকে ফিরে বাতাবি অনেক খুশি। আসার পথে মা বলেছেন আজ বাতাবিকে চিঠি লিখা শিখাবেন।বাতাবি এখন লিখতে পারে”তুমি কেমন আছো?”
অবশেষে বাতাবি একটা চিঠি লিখল, বাংলা রুল করা কাগজে চিঠি লিখল।চিঠিতে লিখা”আমার নাম বাতাবি।বাবা তুমি কেমন আছো? চিঠি নিজ হাতে বাতাবি পোস্ট বক্সে চিঠি ফেলল।একদিন যায় দুদিন যায় এভাবে সাতদিন কেটে যায় তবু বাতাবি চিঠির উত্তর পেল না।সপ্তমদিনে বাতাবির কান্নাকাটি দেখে ওর মা শায়লার খুব মন খারাপ হল।উপায় না পেয়ে আনিসের হয়ে নিজেই চিঠি লিখল “আমি ভাল আছি মা।তুই কেমন আছিস।তোর মায়ের কথা শুনিস”। এভাবে করে কেটে যায় অনেকটা সময়।

আজ বাতাবির জন্মদিন।বাবার একটা চিঠি পেয়েছে বাতাবি।বাতাবির মা শায়লা বাতাবিকে একটা চিঠি দিয়ে বলেছে এটা তোর বাবা পাঠিয়েছে। মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল মা পড়ে শোনাও।
“প্রিয় মা আমার,কেমন আছিস? আজ তোর ছয় বছর পূর্ণ হল।বড় হয়ে যাচ্ছিস রে মা।তোকে অনেক মিস করি।কতদিন তোর গায়ের গন্ধ নেই না।বাতাবি লেবুর মত মিষ্টি গন্ধ।জানি না তুই আমার কথা বুঝবি কি না! বাবা তোকে অনেক ভালবাসিরে মা।”হ্যাপি বার্থডে “।শায়লার চোখ ভিজে গেল।এভাবে মেয়ের সাথে অভিনয় করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে ও।কিন্তু এখনই মেয়েকে সব বলতে চাচ্চে না শায়লা।
বাতাবি বলল,”কি ব্যাপার কাঁদছো কেন মা? বাবা তোমার কথা কিছু লিখে নাই তাই?
শায়লা মাথা নাড়ল।

পরেরদিন বাতাবি একটি চিঠি নিয়ে মাকে বলল “মা,বাবা চিঠি পাঠিয়েছে”শায়লার মুখ হঠাৎ রক্তশুন্য হয়ে পড়ল। গলা শুকিয়ে গেল।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।কাঁপা কাঁপা হাতে শায়লা চিঠিটা খুলল।চিঠিতে লিখা “শায়লা পারভীন,তুমি কেমন আছো?
চিঠির হাতের লিখা দেখে শায়লা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।শায়লার চোখের জলে বাতাবির হাতে লিখা চিঠিটা ভিজে গেল।এত লক্ষী আর বুদ্ধিমতী মেয়ে মাকে এভাবে সাত্ত্বনা দিচ্ছে।শায়লা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল।মা-মেয়ে দুজনেই কাঁদছে।ওদের কান্নায় একটা পরিচিত সুর বেজে উঠল।” নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে,রয়েছো নয়নে নয়নে।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.