সাংস্কৃতিক প্রণোদনা এবং অথবা ভিক্ষাবৃত্তিঃ একটি আত্মপর্যালোচনা

সালটা ১৯৯৪/৯৫ হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোন একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমাদের বাসার লাগোয়া বন্দর রিপাবলিক ক্লাবে এসেছেন। খুব সম্ভবতঃ মহিলা দল বা এমন কোন কর্মকাণ্ডে এসেছেন। কেননা, আমাদের বাড়িওয়ালী আন্টি সেখানে তৎপর। তিনি সে অনুষ্ঠানে বক্তব্যও রেখেছেন!

এত কাছাকাছি কোন প্রধানমন্ত্রীকে প্রথম দেখা। ছাদে ওঠা বারণ, জানালা খোলা-ও। কারণ, বেলালদের বাসার জানালা খুললেই বন্দর রিপাবলিক ক্লাব সরাসরি দেখা যায়। আমরা জানালার কপাটের ফাঁকে চোখ রেখে দেখছি। আর কান পেতে শুনছি। আব্বা বন্দরের চাকুরি থেকে অবসরে গেছেন। আমরা নিমতলা খাল পাড়ে সেলিম ভাইদের ভাড়া বাসায় থাকি। এর আগে প্রায় ছবছর পাশের হাইস্কুল কলোনীতে বেলালদের পাশের বাসায় ছিলাম।

এর আগেও একবার এ এলাকায় বন্দর স্টেডিয়ামে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এসেছেন। বন্দরের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে। কিন্তু তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কেননা, আমরা স্কুলের সব ছেলেমেয়েরা তাঁকে বিনোদিত করার দায়িত্ব পালন করেছি— কর্ণফুলীর ঢেউ হয়ে, নেচে-গেয়ে। কস্টিউমস নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত যে কি করলাম, কিভাবে করলাম, কেমন হলো কিছুই জানি না! সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখা চাট্টিখানি কথা!?

শুধু প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখাটাই এ ঘটনা মনে থাকার একমাত্র কারণ নয়। ঘটনা মনে থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্য রাখার সময় আমাদের বাড়িওয়ালীকে বকা দিয়েছেন। কারণ, বাড়িওয়ালী আন্টি তাঁর বক্তব্যে অসংখ্যবার ‘দুঃস্থ নারী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, খালেদা জিয়া বলছেন, আমরাই যদি নারীকে অবলা, দুঃস্থ বানিয়ে বসে থাকি তাহলে চলবে?! নারীকে তার যথাযথ মর্যাদায় আসীন করতে আমরা যারা নারী তাদেরকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। নারীকে আমরা যতদিন দুঃস্থ মনে করবো ততদিন নারীরা সত্যি সত্যি দুঃস্থ থেকে যাবে, এগিয়ে আসতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এ কথাগুলো বুকে গেঁথে গেছে অজান্তেই। ‘দুঃস্থ’ শব্দটিও।

তখন বিটিভিই একমাত্র চ্যানেল। ঘুরেফিরে বিটিভিতে মৃত্যুপথযাত্রী কোন শিল্পী সাহিত্যিকের নাম উচ্চারণ করার সময় প্রায়শই ‘দুঃস্থ’ শব্দটিও ঘোষক বলছেন এটা নজরে আসছে। এমনকি তখনকার জনপ্রিয় ‘ইত্যাদি’তেও দেদারসে ‘দুঃস্থ’ শব্দটির ব্যবহার করা হচ্ছে! এদিকে আমিতো প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবক নিয়ে ফেলেছি, যত্রতত্র ‘দুঃস্থ’ বলা যাবে না।

ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মোজাম্মেল হক আর ক্যাম্পাসের বন্ধু আবদুল আউয়াল মামুনের সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। চলচ্চিত্রগুলোর একটা বড় অংশ ছিলো ইরানের। কেবলমাত্র ইরানি দূতাবাসের লোকজন ফ্রিতে সিনেমা দেয়। তাছাড়া তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রক্ষণশীল ক্যাম্পাসে ইরানী সিনেমাগুলো সহজেই দেখানো যায়, আপত্তি ছাড়া। সাথে বাংলাদেশের কালজয়ী সিনেমা যেসবের কপিরাইট ইস্যু নেই। বড়ভাইয়ের সুবাদে নিজেদের ঘরেই চার-পাঁচবছর যাবত কম্পিউটার আছে। ফলে ভিসিআরের ক্যাসেট থেকে সিডি করে কম্পিউটারে কপি করার কাজ আমার ঘাড়েই বর্তালো। এবং সবগুলো সিনেমা দেখার সুযোগে ইরানি সিনেমার প্রেমে পড়ে গেলাম। মাজিদ মাজিদির নির্মাণকে ভালোবেসে ফেললাম। শুরু হলো ইরানি সিনেমার সিডি জোগাড় করা। সাথে বেছে বেছে ভালো ভালো সিনেমার কালেকশন করা। কেননা, টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে যা কেনা যায়। বইয়ের জায়গায় সিনেমার সিডি বুকসেলফের জায়গা দখল করে নিতে লাগলো।

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐ ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর ২০০৩ সালে যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম বিসিএস কিংবা অন্য কোনো চাকরি করবো না, ব্যবসা করবো, চলচ্চিত্র বানাবো। তখন প্রথম এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়লো, চলচ্চিত্র বানাতে গিয়ে শেষমেশ যেন দুঃস্থ উপাধি নিয়ে মরতে না হয়। মেরুদণ্ড সোজা করার ব্যবস্থা করতে হবে সবার আগে। মিশন ১৫ বছর। প্রথম ৫ বছর পাড়া-মহল্লায় প্রদর্শনী আয়োজন, অল্পস্বল্প সিনেমার জ্ঞান অর্জন। পরের ৫ বছর শহরজুড়ে ফলাও করে উৎসব আয়োজন, পত্রপত্রিকার খবরে আসা এবং ছোটোখাটো নির্মাণকাজে মনোনিবেশ করা। শেষের ৫ বছর হবে কাছ থেকে বড় নির্মাণ দেখা ও করায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, সিনেমার সম্যকজ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা। সমান্তরালে চলতে থাকবে নিজেদের ব্যাকবোন বা মেরুদণ্ড সোজা করার কাজ— কোনভাবেই যেন ‘দুঃস্থতা’ নাগাল না পায়।

পরিবারের কাছের মানুষের দুঃখ চাক্ষুষ করার কারণে আরেকটি বিষয় কঠোরভাবে মানার পাশাপাশি প্রমোট করতে লাগলাম, ‘বিদেশে গিয়ে ডিসি (ডিশ/ড্রেন ক্লিনার), ওসি (ওনিয়ন কাটার) হওয়ার চেয়ে নিজের দেশে নিজেদের সব কাজ নিজেরাই করবো এবং কোন কাজকেই অসম্মানের মনে করবো না। কিন্তু, চাকুরি নিয়ে বিদেশ যাবো না। রাস্তা সাফ করতে হলে নিজেদেরটাই সাফ করবো। ফলশ্রুতিতে আমাদের বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘নকশা’য় যখনই কেউ যোগদানের ইচ্ছে পোষণ করেছেন তাঁকে প্রথমেই অফিস ঝাড়ু দিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছে, তাঁর পদবি যা-ই হোক না কেন। যাঁরা এ পাগলামি(!) মেনে নিয়েছেন তাঁরা টিকেছেন, যাঁদের ভালো লাগেনি কিংবা অহমে লেগেছে তাঁরা থাকতে পারেননি।

শিল্পী-সাহিত্যিকদের নামের পাশে যে পরিমাণ ‘দুঃস্থ’ বসে তেমনটি কিন্তু অন্যপেশার লোকেদের মাঝে পাওয়া যায় কম। মাঝেমধ্যে। অথচ, দূর থেকে দেখা ‘হিট’ সময়ে তাঁদের আয় যে কারও চেয়ে চোখে লাগার মতো বেশি। এক একজন ৪শ ৫শ সিনেমায় অভিনয়ের পরেও মৃত্যুকালে তাঁদের ‘দুঃস্থ’ হিসেবেই মারা যাওয়ার বিষয় আমার ভালো লাগেনি কখনোই। এখনো কষ্ট লাগে। এভাবে চলতে দেয়া যায় না।

‘দুঃস্থ’ হবার কারণ অনুসন্ধানে পেলাম—

এক. বিশৃঙ্খল জীবনাচার ও মাদকাসক্তি। দুটোর একটা আরেকটার সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সুতরাং, দুঃস্থ না হতে চাইলে মাদকদ্রব্য ছাড়তে হবে। আমাদের ছোট্ট প্রোডাকশন হাউসে প্রথমেই বলে দেয়া হয়— ন্যূনতম পর্যায়ের মাদকসেবিও আমাদের ইউনিটে আসতে পারবেন না। প্রোডাকশন চলাকালীন সময়ে তো না-ই।

দুই. প্রোডাকশন একথা ওকথা বলে সম্মানীর টাকা হাতিয়ে নেয়, মেরে খায়। সুতরাং, ‘সম্মানী ছাড়া কোন কাজ নয়’— হোকনা তা ন্যূনতম ৫০ টাকা। বাজেট কম থাকতে পারে। কিন্তু, ‘জিরো বাজেট’ বলে কোন শব্দ আমাদের অভিধানে থাকবেনা। কলাকুশলীদের পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে সাথে সাথেই।

তিন. সরকারি সহায়তার পরিমান আশানুরূপ নয়। যে পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা অথবা সহায়তা শিল্পী-সাহিত্যিক-কলাকুশলীদের পাশাপাশি প্রযোজক-পরিচালকদের দেয়া উচিত তা পাওয়া যায় না এটা সত্য। তবে, যা-ই পাওয়া যায় তা-ও যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায় না। অব্যবস্থাপনা-নৈরাজ্য-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিই সব শেষ করে দেয়। এক্ষেত্রে আমার-আপনার চেয়ে ‘মুরুব্বি’দের দায় ও দায়িত্ব বেশি। কারণ, এসব বিলি বন্টন করা লাগে তাঁদেরই। সিস্টেম ঠিক করতে হলে তাঁদেরকে সবার আগে লাইনে আসতে হবে, নৈরাজ্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

চার. প্রকৃতি বা অদৃষ্টের প্রতিশোধ। যে শিল্পী-পরিচালক-প্রযোজক-কুশলী অর্থ, সময় ও সুযোগের অপব্যবহার করেন তার দায় তারই। প্রকৃতি বরাবরই তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নেবে— এটা অভিজ্ঞতা থেকে দেখা ও শেখা। এক্ষেত্রে আমরা যা করতে পারি তা হলো, ‘নিজকে গড়ো’। নিজেরা যার যার অবস্থানে নৈতিক অবস্থানে থাকলে, প্রফেশনাল হতে পারলে বোধকরি এ সমস্যা ধীরে ধীরে কেটে যাবে। আশার বিষয় হলো, তরুণ নির্মাতা-কলাকুশলীরা আগের তুলনায় অনেক সচেতন এবং এ বিষয়ে অনেক বেশি প্রফেশনাল।

সবশেষের কথা হলো, যথাযথ নিয়মনীতি নেই। যৎসামান্য যা আছে তা-ও যথাযথভাবে পালন করা হয় না। এক্ষেত্রে, সরকারি সিস্টেমের দায় পুরোপুরি। যার যার দায়িত্ব পালনে সিস্টেম কঠোর হলে, মামা-চাচা বা ‘দলের’ পাওয়ারে না টললে পরিস্থিতি বদলাবে। বদলাতে বাধ্য। তাহলে শিল্পী-কলাকুশলীর যথাযথ সম্মানী ও রয়্যালটি নিশ্চিত হবার পাশাপাশি প্রযোজক পরিচালকদের জবাবদিহিতা, লগ্নিকৃত অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা এবং যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত হবে। জীবনসায়াহ্নে এসে ‘দুঃস্থ’ উপাধি নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হবে না একজনকেও— যদি সবাই মিলে চাই, প্রচেষ্টা চালাই, যথাযথ উদ্যোগ নিই।