২০১৭ ও ২০১৮ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেলেন এটিএম শামসুজ্জামান, সুজাতা, আলমগীর ও প্রবীর মিত্র

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ চলচ্চিত্র শিল্পীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। চলচ্চিত্র শিল্পে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৭ ও ২০১৮’ প্রদান করা হয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকাল ৪টায় বিজয়ীদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাংলাদেশি চলচ্চিত্র শিল্পীদের জন্য সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। এর আগে ৫ নভেম্বর, ২০১৭ ও ২০১৮ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ২৭ ও ২৮ ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ব্যক্তিবিশেষকে এবং শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করে থাকে। ১৯৭৫ সাল থেকে, “জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার” একটি বড় ইভেন্ট যা বর্ণাঢ্য কর্মসূচি, নৃত্য ও সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতি বছর আয়োজন করা হয়।

১৯৮১ সালে কোন পুরস্কার দেয়া হয়নি কারণ জুরি বোর্ড কোন চলচ্চিত্রকে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য মনে করেনি। এছাড়া ২০০৮ সালে সরকার একসাথে ৪ বছরের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করে (২০০৪, ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭)।

পুরস্কার হিসেবে আঠার ক্যারেট মানের পনের গ্রাম স্বর্ণের একটি পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, একটি সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়। আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্তকে এক লাখ টাকা দেয়া হয়। শ্রেষ্ঠ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজককে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। এছাড়া শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রযোজক, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালককে ৫০ হাজার টাকা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ত্রিশ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।

শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ২০১৭

ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননা পেলেন চলচ্চিত্রাঙ্গনের দুই গুণী অভিনয় শিল্পী। এরা হলেন- অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান ও অভিনেত্রী সালমা বেগম সুজাতা। আর ২০১৮ সালে আজীবন সম্মাননা পেলেন চিত্রনায়ক ও প্রযোজক এম এ আলমগীর ও অভিনেতা প্রবীর মিত্র।

২০১৭ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ঢাকা অ্যাটাক’, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র বাংলাদেশ  টেলিভিশনের ‘বিশ্ব আঙ্গিনায় অমর একুশে’, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক ‘গহীন বালুচর’ ছবির নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ, যৌথভাবে ‘সত্তা’ সিনেমার জন্য শাকিব খান ও ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার জন্য আরেফিন শুভ পেয়েছেন সেরা চলচ্চিত্র অভিনেতার পুরস্কার এবং সেরা অভিনেত্রী প্রধান চরিত্রে ‘হালদা’ সিনেমার জন্য নুসরাত ইমরোজ তিশা।

শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ২০১৮

২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘পুত্র’, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ফরিদুর রেজা সাগরের ‘রাজাধিরাজ রাজ্জাক’, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গল্প সংপে’ (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট), শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক ‘জান্নাত’ সিনেমার জন্য মোস্তাফিজুর রহমান মানিক, যৌথভাবে ‘পুত্র’ সিনেমার জন্য ফেরদৌস আহমেদ ও ‘জান্নাত’ সিনেমার জন্য সাইমন সাদিক পেলেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার এবং ‘দেবী’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন জয়া আহসান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ মুরাদ হাসান ও তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু। স্বাগত বক্তব্য রাখেন তথ্য সচিব আব্দুল মালেক।

‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার না নেওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছেন মোশাররফ করিম।

২০১৮ সালের ‘কমলা রকেট’ ছবির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন মোশাররফ করিম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার না নেওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছেন মোশাররফ করিম

তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের পুরস্কারের তালিকা প্রকাশের পর ফেসবুক স্ট্যাটাসে মোশাররফ করিম বলেন, ‘কমলা রকেট’ ছবিতে কৌতুক চরিত্র ছিল না তার। সেটি প্রধান চরিত্রগুলোর একটি। তিনি জুরিবোর্ডকে অনুরোধ করেছেন শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা থেকে তার নামটি প্রত্যাহার করে নিতে। এই পুরস্কার তার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। মোশাররফ করিম ‘শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা’ পুরস্কার থেকে তার নাম প্রত্যাহার চেয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তার আবেদন মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে। বিষয়টি নিয়ে মোশাররফ করিম বলেন, “পুরস্কার প্রত্যাহারের বিষয়টি আমি আগেই বিস্তারিত বলেছি। আমি সিদ্ধান্তে অটল আছি। পুরস্কার প্রত্যাহারের একটি আবেদন তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে ছিলাম। সেটা মন্ত্রণালয়ে গৃহীত হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন করে আর কিছু বলার নেই আমার।”

উল্লেখ্য, “জননী” ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য শাবানাকে নির্বাচন করা হলেও তিনি সে পুরস্কার গ্রহণ করেননি। ১৯৮২ সালে ‘বড়ো ভালো লোক ছিল’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার পেলেও তা গ্রহণ করেননি সৈয়দ শামসুল হক। সুবর্ণা মুস্তাফা ১৯৮৩ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য পুরস্কার পেয়েও তা নেননি। ‘নতুন বউ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯০ সালে গোলাম মুস্তফাকে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার জন্য পুরস্কার দেওয়া হলেও তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

একনজরে ২০১৭ ও ২০১৮ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা:

২০১৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন:
আজীবন সম্মাননা: এটিএম শামসুজ্জামান ও সালমা বেগম সুজাতা
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র: ঢাকা অ্যাটাক (কায়সার আহমেদ ও সানী সানোয়ার)
শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র: বিশ্ব আঙিনায় অমর একুশে (বাংলাদেশ টেলিভিশন)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক: বদরুল আনাম সৌদ (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রধান চরিত্র: শাকিব খান (সত্তা) ও আরিফিন শুভ (ঢাকা অ্যাটাক)
শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী প্রধান চরিত্র: নুসরাত ইমরোজ তিশা (হালদা)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্ব-চরিত্র: মো. শাহাদাৎ হোসেন (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্ব-চরিত্র: সুবর্ণা মুস্তাফা (গহীন বালুচর) ও রুনা খান (হালদা)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খল-চরিত্র: জাহিদ হাসান (হালদা)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্র: এম ফজলুর রহমান বাবু (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী: নাইমুর রহমান আপন (ছিটকিনি)
শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার: অনন্য সামায়েল (আঁখি ও তার বন্ধুরা)
শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক: এম ফরিদ আহমেদ হাজরা (তুমি রবে নীরবে)
শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক: ইভান শাহরিয়ার সোহাগ, (ধ্যাততেরিকি)
শ্রেষ্ঠ গায়ক: মাহফুজ আনাম জেমস (তোর প্রেমেতে অন্ধ, চলচ্চিত্র: সত্তা)
শ্রেষ্ঠ গায়িকা: মমতাজ বেগম (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র: সত্তা)
শ্রেষ্ঠ গীতিকার: সেজুল হোসেন (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র: সত্তা)
শ্রেষ্ঠ সুরকার: শুভাশীষ মজুমদার বাপ্পা (গান: না জানি কোন অপরাধে, চলচ্চিত্র: সত্তা)
শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার: আজাদ বুলবুল (হালদা)
শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার: তৌকীর আহমেদ (হালদা)
শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা: বদরুল আনাম সৌদ (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক: উত্তম কুমার গুহ (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক: কমল চন্দ্র দাস (গহীন বালুচর)
শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক: রিপন নাথ (ঢাকা অ্যাটাক)
শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা: রিটা হোসেন (তুমি রবে নীরবে)
শ্রেষ্ঠ মেকআপ আর্টিস্ট: মো. জাভেদ মিয়া (ঢাকা অ্যাটাক)


২০১৮ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা
আজীবন সম্মাননা: অভিনেতা প্রবীর মিত্র ও এমএ আলমগীর
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র: পুত্র (চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর)
শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: গল্প সংক্ষেপ (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক: মোস্তাফিজুর রহমান মানিক
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রধান চরিত্র: ফেরদৌস আহমেদ (পুত্র) ও সাদিক মো. সাইমন (জান্নাত)
শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী প্রধান চরিত্র: জয়া আহসান (দেবী)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্ব-চরিত্র: আলীরাজ (জান্নাত)
শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্ব-চরিত্র: সুচরিতা (মেঘকন্যা)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খল চরিত্র: সাদেক বাচ্চু (একটি সিনেমার গল্প)
শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্র: মোশাররফ করিম (কমলা রকেট) ও আফজাল শরিফ (পবিত্র ভালোবাসা)
শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী: ফাহিম মুহতাসিম লাজিম (পুত্র)
শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার: মাহমুদুর রহমান (মাটির প্রজার দেশে)
শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক: ইমন সাহা (জান্নাত)
শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক: মাসুম বাবুল (একটি সিনেমার গল্প)
শ্রেষ্ঠ গায়ক: নাইমুল ইসলাম রাতুল (গান: যদি দুঃখ ছুঁয়ে, চলচ্চিত্র: পুত্র)
শ্রেষ্ঠ গায়িকা: সাবিনা ইয়াসমিন (গান: ভুলে মান অভিমান, চলচ্চিত্র: পুত্র) ও আঁখি আলমগীর (গান: গল্প কথার ঐ, চলচ্চিত্র: একটি সিনেমার গল্প)
শ্রেষ্ঠ গীতিকার: কবির বকুল (গান: যদি এভাবেই ভালোবাসা, চলচ্চিত্র: নায়ক) ও জুলফিকার রাসেল (গান: যদি দুঃখ ছুঁয়ে দেখো, চলচ্চিত্র: পুত্র)
শ্রেষ্ঠ সুরকার: রুনা লায়লা (গান: গল্প কথার ঐ, চলচ্চিত্র: একটি সিনেমার গল্প)
শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার: সুদীপ্ত সাঈদ খান (জান্নাত)
শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার: সাইফুল ইসলাম মান্নু (পুত্র)
শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা: এস. এম. হারুন-অর-রশীদ (পুত্র)
শ্রেষ্ঠ সম্পাদক: তারিক হোসেন বিদ্যুৎ (পুত্র)
শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক: উত্তম কুমার গুহ (একটি সিনেমার গল্প)
শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক: জেড এইচ মিন্টু (পোস্টমাস্টার ৭১)
শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক: আজম বাবু (পুত্র)
শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা: সাদিয়া শবনম শানতু (পুত্র)
শ্রেষ্ঠ মেকআপ আর্টিস্ট: ফরহাদ রেজা মিলন (দেবী)।