৫ম চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালঃ মসরুর পারভেজের ‘দ্য ডগস ইল্যুশন’এর জয়জয়কার

স্বদেশী চলচ্চিত্রকারদের জন্য তুলে রাখা ৫টি পুরস্কারের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানজনক শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ মোট ৩টি পুরস্কারই অর্জন করে পরিচালক মসরুর পারভেজের ‘দ্য ডগস ইল্যুশন’। চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিগত বছরগুলোর মধ্যে এটি বিরল ঘটনা। উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরস্কার অর্জন করেন ‘দ্য ডগস ইল্যুশন’ এর অভিনেতা সোহেল রানা (মাসুদ পারভেজ) এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার অর্জন করেন ‘প্রেম পুরাণ’ চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী সামিয়া অথৈ। শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার নির্বাচিত হন ‘এ নাইট’স টেইল’ চলচ্চিত্রের মো: আবিদ মল্লিক। শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ইথিওপিয়ান চলচ্চিত্রকার গনজালো গুয়াজার্দো এর চলচ্চিত্র ‘পেপার বোটস’।

শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ইথিওপিয়ান চলচ্চিত্রকার গনজালো গুয়াজার্দো এর চলচ্চিত্র ‘পেপার বোটস

‘থিঙ্ক বিগ, ফিল্ম শর্ট’ প্রতিপাদ্য নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু হলে ১৮ জানুয়ারী ২০২০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ৫ম চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ অভিমত ব্যক্ত করেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক বরেণ্য সংবাদ ব্যক্তিত্ব এম এ মালেক।

জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনাগুলো আমরা বলতে পারি না, কিন্তু ফিল্ম সেই জিনিসটা পারে। আমাদের জীবনের গল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এর চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম আর হতে পারে না। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে আমরা বলতে পারি ছোট গল্প।

তিনি বলেন, জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা-দুর্ঘটনাগুলো আমরা বলতে পারি না, কিন্তু ফিল্ম সেই জিনিসটা পারে। আমাদের জীবনের গল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এর চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম আর হতে পারে না। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে আমরা বলতে পারি ছোট গল্প। স্বল্প সময়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো তুলে ধরতে এ মাধ্যমটির জুড়ি নেই। এক কথায় জীবনের খণ্ডিতাংশ তুলে ধরে শর্ট ফিল্ম।

খারাপ সিনেমাকে ‘ছিঃনামা’ উল্লেখ করে এম এ মালেক বলেন, ‘তরুণদের কাছে আমরা ‘ছিঃনামা’ নয় ‘সিনেমা’ চাই। বর্তমান সময়ে আমাদের সময় খুব কম। পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ চার দিনে করার চিন্তা ভাবনা চলছে। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ টি টুয়েন্টি ম্যাচ থেকে এখন টি-টেন ম্যাচ চালু হয়েছে। এর ফলে খেলোয়াড়দের শৈল্পিকতা হারিয়ে গেছে। এই শৈল্পিক দিক ঠিক রেখে যদি শর্ট ফিল্ম বানানো যায় তবে তা আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠবে। আশা করি চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে দেশের সেরা পরিচালক ও অভিনেতা অভিনেত্রীরা বেরিয়ে আসবে। চিটাগং শর্ট চট্টগ্রামকে ব্র্যান্ডিং করতে চাইছে। এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।


এবারের আয়োজনে ভারত, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, পাকিস্তান, মিশর, জার্মানি, পর্তুগাল, বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের শতাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত করা হয় ২১টি সিনেমা। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কর্ণফুলী, হালদা, সাঙ্গু শিরোনামের তিনটি প্রদর্শনীর প্রতিটিতে ৭টি করে সর্বমোট ২১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা প্রদর্শিত হয় উৎসবে।

চিটাগং শর্টের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ইসমাইল চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে উৎসবের জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান চলচ্চিত্র পরিচালক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা জ্যাঁ নেসার ওসমান। তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যের প্রতি সহমত পোষণ করে বলেন, ছিঃনামা এ দেশে অনেক হয়েছে। ধইরা ফালামু, কাইটা ফালামু, মাইরা ফালামু এমন নানা নামে এসব ছিঃনামার কারণেই দর্শক হল বিমুখী হয়েছে। আমরা বাংলাদেশে আর ছিঃনামা চাই না। আশা রাখছি পরবর্তী প্রজন্ম তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে সিনেমা তৈরি করবেন এবং দর্শকদের হলমুখী করবেন।

“ছিঃনামা এ দেশে অনেক হয়েছে। ধইরা ফালামু, কাইটা ফালামু, মাইরা ফালামু এমন নানা নামে এসব ছিঃনামার কারণেই দর্শক হল বিমুখী হয়েছে। আমরা বাংলাদেশে আর ছিঃনামা চাই না। আশা রাখছি পরবর্তী প্রজন্ম তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে সিনেমা তৈরি করবেন এবং দর্শকদের হলমুখী করবেন।”

একইদিন সকালে উদ্বোধনী পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ চলচ্চিত্রকার-শিক্ষক হায়দার রিজভী, চলচ্চিত্র পরিচালক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা জাঁ নেসার ওসমান, অধ্যক্ষ সাফিয়া গাজী রহমান, শব্দনির্দেশক নাহিদ মাসুদ, সিইউজের সভাপতি ও চলচ্চিত্র সংগঠক নাজিমুদ্দিন শ্যামল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক চলচ্চিত্রকার শৈবাল চৌধুরী, উৎসবের জুরি ও চিত্রনাট্যকার শাহজাহান শামীম এবং হালের তরুণদের কর্পোরেট আইকন তানভীর শাহরিয়ার রিমন। উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন চিটাগং শর্টের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইল চৌধুরী এবং সঞ্চালনায় ছিলেন উৎসব পরিচালক শারাফাত আলী শওকত। উদ্বোধনী পর্বে অতিথিবৃন্দ বলেন, মনের সংকীর্ণতা দূর করতে এবং মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে চলচ্চিত্র সুদূর প্রসারী ভূমিকা রয়েছে। মানুষের জীবনের কোনো ঘটনাই অর্থহীন নয়। চলচ্চিত্র সেই অর্থটাই খুঁজে বের করে।

এর আগে ১৭ জানুয়ারী ২০২০ শুক্রবার পর্দা উঠে ৫ম চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের। সকাল ৯টা থেকে আজাদী অডিটোরিয়ামে প্রখ্যাত লোকেশন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট নাহিদ মাসুদের পরিচালনায় শুরু হয় চলচ্চিত্রে সাউন্ড ডিজাইন বিষয়ক কর্মশালা। স্বল্প সময়ের গুরত্বপূর্ণ এ কর্মশালায় ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণকারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাগণ। চলচ্চিত্রে শব্দের গুরুত্ব, শব্দের মাত্রা ও ডিজাইন নিয়ে প্রায়োগিক আলোচনার পাশাপাশি প্রশিক্ষক নাহিদ মাসুদ তরুণ নির্মাতাদের শব্দের উৎস ও কম্পাঙ্ক বিষয়ে বিশদ ধারণা প্রদান করেন। বিভিন্ন বিখ্যাত চলচ্চিত্রের খন্ডাংশ প্রজেক্টরে দেখিয়ে সাউন্ড ডিজাইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রের মানোন্নয়নে যথাযথ সাউন্ড ডিজাইনের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

প্রখ্যাত লোকেশন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট নাহিদ মাসুদের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে সাউন্ড ডিজাইন বিষয়ক কর্মশালা

“একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি নিজের গরজে, আমাদের স্বাধীনতা লাগবে, দেশ লাগবে তাই জীবনের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এখন তোমরা যদি মনে করো তোমরা চলচ্চিত্রই নির্মাণ করবে তাহলে সকল বাধা বিপত্তি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে তোমাদেরই লড়তে হবে।”

প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রগ্রাহক ও চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উৎসব পরিচালক শারাফাত আলী শওকত এর সঞ্চালনায় সিনে আড্ডা

কর্মশালা শেষে তরুণ নির্মাতাদের সাথে সিনেমা নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠেন একসময়কার তুমুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা সোহেল রানা। সিনে আড্ডা শিরোনামের এই আয়োজনটি করা হয় মূলত নবীনদের সাথে প্রবীণ ও পেশাদার চলচ্চিত্র কর্মীদের যোগাযোগের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এতে তরুণ চলচ্চিত্রকারদের নানাবিধ সমস্যা ও বাধা বিপত্তি কাটিয়ে উঠার প্রেক্ষিতে সোহেল রানা বলেন, “একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি নিজের গরজে, আমাদের স্বাধীনতা লাগবে, দেশ লাগবে তাই জীবনের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এখন তোমরা যদি মনে করো তোমরা চলচ্চিত্রই নির্মাণ করবে তাহলে সকল বাধা বিপত্তি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে তোমাদেরই লড়তে হবে।”

তরুণ নির্মাতাদের সাথে সিনেমা নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠেন একসময়কার তুমুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা সোহেল রানা।

আড্ডায় সোহেল রানা তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তরুণদের সাথে আলাপ করেন যেখানে উঠে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিন ও দুর্দিনের নানা গল্প। চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে নানাবিধ সমস্যা ও সমাধানের দিক নির্দেশনা নিয়ে আড্ডায় আরো যোগ দেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র শিক্ষক হায়দার রিজভী, চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জুরি বোর্ড চেয়ারম্যান জ্যাঁ নেসার ওসমান, জুরি বোর্ড মেম্বার শাহজাহান শামীম এবং নাহিদ মাসুদ। প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রগ্রাহক ও চিটাগং শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উৎসব পরিচালক শারাফাত আলী শওকত এর সঞ্চালনায় এই আয়োজনে অংশ নেয় পঞ্চাশেরও অধিক তরুণ নির্মাতা ও কলাকুশলী। যাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আগামীর বাংলা চলচ্চিত্রের পট পরিবর্তনে তাদের জ্ঞানার্জন ও সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত রাখার। সিনে আড্ডায় আরো উপস্থিত ছিলেন চিটাগং শর্টের প্রেসিডেন্ট ইসমাইল চৌধুরী, কো ফাউন্ডার এ কে মিত্র যীশু ও মো: আলী হোসাইন। অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে যাবতীয় সহায়তা প্রদান করেন মো: শরীফ, ইহতিয়াজ ত্বকী, আশরাফুল সৌরভ এবং জিকু বড়ুয়া।

অভিনেত্রী প্রজ্ঞা পারমিতার উপস্থাপনায় উৎসবের উদ্বোধনী আয়োজন