চলে গেলেন অভিনেতা ইরফান খান, বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা ইরফান খান চলে গেলেন। গত মঙ্গলবারই তাকে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে কেতালনের সংক্রমণের জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। পরে রাখা হয়েছিল আইসিসিইউতে। কিন্ত সুস্থ হয়ে আর ফিরে আসা হয়ে ওঠেনি। বুধবার সকালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই প্রতিভাময় অভিনেতার মৃত্যুতে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ইরফানের জন্ম রাজস্থানের জয়পুরে। তাঁর পরিবার এখনও সেখানেই থাকে।সেখান থেকেই দিল্লিতে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় পড়তে এসেছিলেন। এরপর পাকাপাকি ভাবে যোগ দেন অভিনয়ের পেশায়। হিন্দি ও ইংরাজি বহু চলচ্চিত্রেই তিনি অভিনয় করেছেন। ‘পিকু’ ছবিতে তার অভিনয় দর্শকের প্রভূত প্রশংসা পেয়েছিল।

গত সপ্তাহেই প্রয়াত হয়েছেন ইরফানের মা সায়েদা বেগম। লকডাউনের কারণে পারেননি ইরফান। তিনি মুম্বইতেই ছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ তিনি। মাত্র চার দিন আগে তাঁর মা সায়েদা বেগম জয়পুরে মারা যান। লকডাউনের কারণে জয়পুরে মায়ের দাফনে যোগ দিতে পারেননি ইরফান। তবে বেশ কিছু  সংবাদমাধ্যমের দাবি, অসুস্থতার জন্যই মায়ের শেষকৃত্যে যেতে পারেননি অভিনেতা। তাই ভিডিও কলেই পরিবারের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রেখে যাবতীয় কাজ সেরেছিলেন।

২০১৮ তে তার নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার ধরা পরে তাঁর। বিরল রোগের চিকিৎসায় প্রায় একবছর লন্ডনে থেকে চিকিৎসা করেছিলেন। অসুস্থতা থেকে খানিকটা সুস্থ হয়ে আংরেজি মিডিয়াম চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করেছিলেন। মার্চ মাসে মুক্তি পেয়েছে ইরফানের শেষ চলচ্চিত্র আংরেজি মিডিয়াম। তখনও শরীর অসুস্থ ছিল বলে তাঁকে প্রচারে দেখা যায়নি। যদিও করোনার কবলে কয়েকদিন পরই বন্ধ হয়ে যায় এই ছবির প্রদর্শন। সুস্থ হয়ে ‘আংরেজি মিডিয়াম’ ছবির মধ্যে দিয়ে কামব্যাকও করেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার মুম্বইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে ভর্তি হন কোলন ইনফেকশন নিয়ে। আজ সকালে হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুই ছেলে আর আর স্ত্রীকে রেখে ইরফান পাড়ি দিলেন নতুন দুনিয়ায়।

অনুরাগীদের উদ্দেশে কিছুদিন আগে টুইটারে ইরফান লেখেন,

“জীবনে জয়ী হওয়ার সাধনায় মাঝে মধ্যে ভালবাসার গুরুত্ব ভুলে যাই আমরা। তবে  দুর্বল সময় আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়।  জীবনের পরবর্তী ধাপে পা রাখার আগে তাই খানিক ক্ষণ থমকে দাঁড়াতে চাই আমি। অফুরন্ত ভালবাসা দেওয়ার জন্য এবং পাশে থাকার জন্য আপনাদের সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। আপনাদের এই ভালবাসাই আমার যন্ত্রণায় প্রলেপ দিয়েছে। তাই ফের আপনাদের কাছেই ফিরছি। অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সকলকে।”

ফিরে এসেছিলেন ইরফান। তাঁর শেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘আংরেজি মিডিয়াম’ লকডাউনের জেরে থিয়েটার রিলিজ হয়নি। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কখনও মুহূর্তের জন্য দুর্বল হননি তিনি। ইরফান সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন , ‘‘নমস্কার ভাই-বোনেরা। আমি ইরফান। আপনাদের সাথে একপ্রকার রয়েছি আবার নেইও! ‘আংরেজি মিডিয়াম’ ছবিটি আমার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করুন, যেভাবে ভালবেসে ছবিটা তৈরি করেছি, ঠিক সেভাবেই এর প্রচার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার শরীরে কিছু অযাচিত অতিথি এসে বাসা বেঁধেছে, তাদের সঙ্গেই আপাতত কথাবার্তা চলছে। দেখি কী হয়! যাই হোক না কেন, আপনাদের জানাব।’’

এর পরেই সেই ভিডিওতে ইরফান খানকে বেশ মজা করে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘প্রবাদ রয়েছে যে, ‘জীবন যখন আপনার হাতে লেবু ধরিয়ে দেবে ওটা দিয়ে লেমোনেড (শরবত) বানিয়ে খাওয়া উচিত।’ এমন বলা কিন্তু খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবে যখন সত্যি আপনার হাতে জীবন একটা লেবু ধরিয়ে দেবে ওটা দিয়ে ‘শিকাঞ্জি’ বানানোটা বড়ই কঠিন। বাস্তবটা খুবই মুশকিল। যদিও পজিটিভ ভাবনাচিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকাই জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আশা করছি, এই ছবি থেকে আপনারা অনেক কিছু শিখতে পারবেন। আপনাদের যেমন হাসাবে, তেমন কাঁদাবেও। ট্রেলারের আনন্দ নিন এবং ছবিটা দেখুন। আর হ্যাঁ আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।’’

ইরফান খান (হিন্দি: इरफ़ान ख़ान) (৭ জানুয়ারি ১৯৬৭ – ২৯ এপ্রিল ২০২০) ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা। তিনি বলিউড, ব্রিটিশ ভারতীয়, হলিউড এবং তেলেগু ছবিতে কাজের জন্য পরিচিত। তিনি ২০১২ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র অ্যামেজিং স্পাইডার ম্যান অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন। এছাড়া তিনি হলিউডের সিনেমা জুরাসিক ওয়ার্ল্ড এ অভিনয় করেন।

ইরফান ১৯৬৭ সালের ৭ জানুয়ারি ভারতের জয়পুরে একটি মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইরফানের মা, বেগম তন্ক হাকিম পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং এবং তার মরহুম পিতা জাগিরদার তন্ম জেলার বাসিন্দা ছিলেন সেখানে পাগড়ির ব্যবসা করতেন। তিনি ১৯৮৪ সালে নয়া দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে স্কলারশিপের অর্জন করেন, যদিও তিনি তখন তার এমএ ডিগ্রীর জন্য অধ্যয়নরত ছিলেন।

ইরফান খান মুম্বইয়ে চলে আসেন এবং সেখানে একাধিক টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করেন, তন্মধ্যে রয়েছে চণক্যভারত এক খোঁজসারা জাহাঁ হামারাবনেগি আপনি বাতচন্দ্রকান্তশ্রীকান্তঅনুগুঞ্জ, ও স্পর্শ। এর পূর্বে তিনি দূরদর্শনের টেলিভিশন নাটক লাল ঘাস পর নীলে ঘোড়ে-তে ভ্লাদিমির লেনিন চরিত্রে অভিনয় করেন। এটি মিখাইল শাতরভের রুশ নাটকের উদয় প্রকাশের অনুবাদের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। তিনি স্টার প্লাসের দর টিভি ধারাবাহিকে প্রধান খলচরিত্রে অভিনয় করেন। কে কে মেননের বিপরীতে এই ধারাবাহিকে তিনি একজন ধারাবাহিক খুনী চরিত্রে অভিনয় করেন। এছাড়া তিনি কাহকাশাঁ নাটকে বিখ্যাত বিপ্লবী উর্দু কবি ও মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক কর্মী মখদুম মহিউদ্দিন চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি স্টার প্লাসে প্রচারিত স্টার বেস্টসেলার্স-এর কয়েকটি পর্বে অভিনয় করেন। একটি পর্বে তাকে একজন দোকানদার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়, যেখানে তার ধারণা হয় তার বাড়িওয়ালার স্ত্রী তাকে কামের ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছে, কিন্তু পরে দেখা যায় তার স্ত্রীই তাকে ফাঁকি দিচ্ছে। আরেকটি পর্বে তাকে একজন হিসাবরক্ষক চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়, যেখানে তিনি তার নারী বস কর্তৃক অপমানিত হওয়ার পর এর প্রতিশোধ নেন। এছাড়া তিনি সেট ইন্ডিয়ায় প্রচারিত ভানবর ধারাবাহিকের দুটি পর্বে অভিনয় করেন।

পুরস্কার

বেসামরিক সম্মান

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

  • ২০১২: সেরা অভিনেতা – পান সিং তমর

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার

  • ২০১২: সেরা অভিনেতা – পান সিং তমর
  • ২০০৭: সেরা অভিনেতা – লাইফ ইন এ মেট্রো
  • ২০০৩: সেরা খলনায়ক – হাসিল