নিত্য জীবন

‘ব্যাডারা আমার এইরাম সর্বনাশ করতে পারলো? এ কি কোন মাইনসের কাম হইতে পারে…!’
আফসোসে ভেঙে পড়েন কুতুব আলী। চোখের সামনে ফসলের জমি। তবে তা বোঝার উপায় নেই। জমিটাকে এই মুহূর্তে ছোটখাটো একটা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্থান মনে হচ্ছে।
‘কষ্টের কথা কি আর কবো চাচা। এত করে বললাম আপনেরা মাঠে নাইমেন না। শুনলোই না কোন কথা। এইহানে একটু ধান কাটলো, ওইহানে একটু ধান কাটলো। দশ বিশজন মিলে ছবি-টবি তুলে তারপর গেলোগা।’
নুরুর কথাগুলো কুতুব আলীর বুকে তীরের মতো বিঁধলো। কি বলবে ভাষা খুঁজে পায় না। গত দু-তিন ধরে মনে মনে চিন্তা করছিলেন মাঠের ধানগুলোর কথা। পুরোপুরি পাকেনি। আর সপ্তাহ খানেক পর হয়তো ধানগুলো একরকম কাটার উপযোগী হতো। অথচ হুট করে শহর থেকে একদল নেতা লোক এসে কাউকে কিছু না বলে ধানক্ষেতের সর্বনাশ করে গেলো।
চোখ ঝাপসা হয়ে আসে কুতুব আলীর। চোখের পানি মুছে আবার ধানক্ষেতের দিকে তাকান। ক্ষেতের করুণ অবস্থা সহ্য হয়না তার। রাগে গা জ্বলতে থাকে। এইভাবে কেউ ধান কাটে? ধান যদি নাই কাটতে জানে তাহলে কাটতে বলেছে কে তাদের? যার জমি, যার ধান, তাকে কি একটাবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো না? জবাব খুঁজে পায় না কুতুব আলী। মাটিতে যত্রতত্র পড়ে থাকা ধানের দিকে তাকালেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। জায়গায় জায়গায় এমনভাবে ধান কেটে ফেলে রাখা যেন গরু ছেড়ে দেয়া হয়েছিল মাঠের মধ্যে।
যারা এই আকামটা করেছে তাদের বেশ ভালো করেই চেনেন কুতুব আলী। এটাও জানেন তারা সবসময় লোক দেখানো কাজকারবার করে। দশ জনের সামনে মানুষের উপকার করার নাটক করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা ক্ষতিটাই করে বেশি। এমন মানুষের মুখোমুখি বহুবার হয়েছেন তিনি। প্রতিবারই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।
.

এইতো সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা। করোনা ভাইরাসের কারণে পুরো শহর-এলাকা লকডাউনে রাখা হয়েছে। বাড়ি থেকে বেরুনো নিষেধ। কাজকর্মও তাই বন্ধ হয়ে আছে। দিন মজুর পরিবারের জন্য কতটা কষ্টের এই সময়টা তা বেশ হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছেন কুতুব আলী।
এমন সময় শুনতে পেলেন এলাকার প্রাইমারী স্কুলের মাঠে ত্রাণের চাল বিতরণ হচ্ছে। লোকজনের দেখাদেখি তিনিও দ্রুত পা বাড়ালেন স্কুলের দিকে। পৌঁছে দেখেন চাল বিতরণ শেষ। হাতে গোনা অল্প কজন চাল পেয়েছে। তাও মাত্র দুই কেজি করে। লোকজন অবশ্য কমছে না, ক্রমাগত বাড়ছেই। চালের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে লোক আসছে। ঘটনাস্থলে থাকা মানুষের মুখে শুনতে পেলেন এলাকার চেয়ারম্যান জনা ছয়েক মানুষ নিয়ে এসে চার বস্তা চাল বিরতণ করেছে। পনেরো মিনিটের মধ্যে চার বস্তা চাল বিতরণ করে শ দুয়েক ছবি তুলে চলে গেছে।

ভীষণ হতাশ হন কুতুব আলী। কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে শেষে বাসার পথে রওনা হন। মাঝপথে একদল শহুরে লোকের সাথে তার সাক্ষাত হয়। শহরের কি যেন এক সংস্থা থেকে তারা এসেছে।
‘স্লামালেকুম চাচা। কই যান?’
‘গেছিলাম তো চাইল আনতে। পরে শুনলাম চাইল ফুরাইয়া গেছে।’
‘তাই, না? তাহলে আসেন আপনারে কিছুটা সাহায্য করি।’
এই বলে দশ-বারোজন মিলে কুতুব আলীর হাতে ছোট্ট একটি ব্যাগ তুলে দিয়ে কম করে হলেও বিশ-ত্রিশটা ছবি তুললো। আর ছবি তোলা শেষ হতেই চোখের পলকে তারা গায়েব হয়ে গেল। লোকজন চলে যাবার পর কুতুব আলী ব্যাগটি খুললেন ভেতরে কি আছে দেখার জন্য। দেখেন ব্যাগের ভেতরে এক কেজি চাল আর হাফ কেজির মতোন ডাল রাখা।
.

পরিবার ছোট হলেও অভাব কাটে না কুতুব আলীর। পাহাড় সমান অভাবের মাঝ দিয়েই জীবন কাটে তার। ছেলের সাথে দিন মজুরী কাজ করে সংসার চালায়। মেয়ে নিলুফা গার্মেন্টসে কাজ করতো। মহামারী করোনার কারণে মেয়েটা বাসায় চলে এসেছে। মাস তিনেকের বেতনও আটকে গেছে। আজ সকালে আবার স্ত্রীর মুখে শুনতে পেলেন গার্মেন্টস থেকে কল এসেছিল। মেয়ের চাকরিটা চলে গেছে। মালিকপক্ষ জানিয়েছে গার্মেন্টস লসে পড়ায় বকেয়া বেতন দিতে পারবে না।
খবর শুনে মেয়ের কাছে যান কুতুব আলী। পাশে গিয়ে বসেন। মেয়ের চেহারাটার দিকে তাকানো যায় না। একরাশ হতাশার মেঘ যেন ছেয়ে গেছে গোটা চেহারায়। তিনি মেয়ের চাকরি হারানোর বিষয়টা গোপন করে যান।
‘মা রে। এত কি ভাবতেছিস?’
‘ভাবনার কি আর শেষ আছে! চিন্তা করতেছি আবার কবে শহরে যাইতে পারবো।’
‘শহরে তো বহুত থাকলি। এইবার বাপের কাছে থাক। আমি বলি কি, চাকরিটা ছাইড়া দে। তোর মায়ের তো বয়স কম হয় নাই। তুই অহন বাসায় থাইকা তার কাজকর্মে হাত বাড়াইলে মহিলাটার একটু শান্তি হয়।’
‘চাকরি ছেড়ে দিলে খাবো কি?’
‘খাওনের চিন্তা তোর করতে হইবো না। এই বুড়া বাপ যতদিন বাঁইচা আছে, ততদিন তোর অন্তত খাওনের চিন্তা করতে হইবো না।’
বাবার কথা শুনে মেয়ের চোখে পানি চলে আসে। নিজেকে আটকাতে পারে না নিলুফা। জাপটে ধরে বাবার বুকে নিজের মুখটা লুকায়। ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কুতুব আলীরও কাঁদতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারেন না। বাবাদের নাকি কাঁদতে নেই। তাই কষ্ট হলেও নিজেকে সামলে নেন কুতুব আলী।
.

‘রান্না করুম। দুপুরে কি খাইবা?’
স্ত্রীর কথায় সম্বিৎ ফিরে পান কুতুব আলী। উঠানে চুপচাপ বসে ছিলেন এতক্ষণ।
‘ঘরে রান্না করনের মতোন কি আছে?’
প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না তার স্ত্রী। মন ভারী হয়ে যায় কুতুব আলীর।
‘তোমার মনে যেইডা চায় সেইডা রান্ধো। শুধু শুধু জিগানোর কি দরকার!’
এই বলে চুপ হয়ে যান। স্ত্রী রান্নার প্রস্তুতি নিতে থাকে। মেয়েটা সবার কাপড়-চোপড় নিয়ে বসেছে। ছেঁড়া কাপড় সেলাই করছে। এরপর সবগুলো একসাথে ধোবে।
ছেলেটা সকাল সকাল বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। বলে গেছে শহরের কোথায় জানি ত্রাণ বিতরণ হবে আজকে, সেখানে যাচ্ছে। গিয়ে যদি কিছু নাও পায়, খালি হাতে ফিরবে না। যেভাবেই হোক কাজ খুঁজে বের করবে। কাজ করে টাকা কামিয়ে তবেই ঘরে ফিরবে। কুতুব আলী ছেলের কথা শুনেই গেছেন শুধু, কিছু বলতে পারেননি।

যোহর ওয়াক্তের আযান ভেসে আসে। কুতুব আলী ওযু করে মসজিদের দিকে পা বাড়ান। মনের ভেতর বহু কথা জমে আছে। কারও সাথে সে কথা বিনিময় করতে পারেন না। এক সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ নেই যার সাথে কথাগুলো আদান-প্রদান করা যায়। তাই তিনি সরল মনে মসজিদের পথে হাঁটা ধরেন। নামাজ শেষে মোনাজাত তুলে সৃষ্টিকর্তাকে সেসব কথা শোনাবেন তিনি। চাইবেন সবকিছু যেন ঠিক হয়ে যায়। ঘরের মানুষগুলোর দিকে মুখ তুলে তাকানোর ক্ষমতাটা যেন সৃষ্টিকর্তা তাকে দেন।

জামসেদুর রহমান সজীব, চলচ্চিত্রকার-লেখক