শাঁখের করাত

জামসেদুর রহমান সজীব, জন্মশহর রাজবাড়ী জেলা। শৈশব কৈশোর কেটেছে গ্রামের আলো ছায়াতেই। বর্তমানে পড়ালেখার সুবাদে থাকছে ঢাকা শহরে। পড়ছেন ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগে, সম্মান ৩য় বর্ষে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির পাশাপাশি শিশুতোষ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং অন্যান্য সৃষ্টিশীল কাজের সাথে যুক্ত আছেন। প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন এবং চেষ্টা করেন আশপাশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।

১.

সিস্টেমপাড়া গ্রামের চেয়ারম্যান খসরু মিয়ার বাড়িতে জরুরি সালিশ ডাকা হয়েছে। সেই সালিশে গ্রামের লোকজন তো এসেছেই, আশপাশের দশ গ্রামের মানুষও চলে এসেছে। কেননা সালিশের বিষয়টা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের সীমা নেই। বিষয়টা একইসাথে খুব নাজুক আর স্পর্শকাতর। অন্তত এই দশ গ্রামের মানুষের কোনদিন কল্পনাতেও আসে নাই পাদ নিয়ে কোন সালিশ বসতে পারে।
সালিশের পেছনের ঘটনাটা জানা যাক। চাল চোর খ্যাত চেয়ারম্যান খসরু মিয়া দেখলেন দিনকে দিন তার ইমেজ মাটিতে মেশা শুরু করেছে। পিঠ পিছনে লোকে যা-তা বলে। তো তিনি ঘোষণা দিলেন চাল বিতরণ করবেন। চাল বিতরণের নির্দিষ্ট দিনে তার বাড়িতে অসহায়, গরিব মানুষদের ভিড় জমে গেল। লম্বা লাইন তৈরী হয়ে গেল মুহূর্তেই।
জনপ্রতি আধা সের চাল বিতরণ চলছে। গ্রামেরই এক বয়স্ক লোক আতাহার আলী গেলেন চাল নিতে। চেয়ারম্যানের হাত থেকে চাল নিচ্ছেন, সিস্টেম অনুযায়ী চাল নেবার সময় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দিচ্ছেন। এমন সময় ধুরুম ধারুম শব্দে পাদ দিয়ে বসলেন আতাহার আলী। পাদের শব্দে এবং গন্ধে আশপাশের লোক যে যেখানে পারলো ছিটকে গেল। শুধু নড়তে পারলো না চেয়ারম্যান খসরু মিয়া। তাকে দেখে মনে হলো এখনই বুঝি মূর্ছা যাবেন। কিন্তু পর মুহূর্তেই তেলেবেগুনে জ¦লে উঠলেন তিনি। চাল ছুড়ে ফেলে দিয়ে তার লোকজনদের আদেশ দিলেন আতাহার আলীকে দঁড়ি দিয়ে বাঁধতে।
কি সাহস! কি স্পর্ধা! চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে পাদে। ক্রোধে ফেটে যায় যায় অবস্থা খসরু মিয়ার। তিনি সালিশের ঘোষণা দিলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে গ্রামের সকল মোড়লদের এখানে থাকা চাই। এই পাদ মারার একটা বিহিত হওয়া জরুরি। এই অপরাধ মেনে নেবার নয়। চেয়ারম্যানের ডাকে সকলকেই সাড়া দিতে হলো। লোকজন জড়ো হলো সালিশে।
সেই সালিশে জরুরি এক আইন প্রণয়ন করলেন চেয়ারম্যান খসরু মিয়া। আইনটা হলো আজ থেকে এই গ্রামে সকলপ্রকার পাদাপাদি নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করলে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি দেওয়া হবে। কারও কানে পাদের শব্দ আসামাত্র চেয়ারম্যানকে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। আইন শুনে গ্রামের মানুষ একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। এ আবার কেমন আইন। পাদা যাবে না, তাই হয় নাকি! নতুন এই আইন নিয়ে জনসাধারণের মনে নানান প্রশ্ন, নানান দ্বিধা সংকোচ। কিন্তু ভয়ের চোটে কেউ কোন কথা বলতে পারলো না। জরুরি সালিশের এখানেই ইতি টানা হলো।

২.

সালিশের পরদিন থেকে শুরু হলো আসল খেলা। পাদ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে এলাকার মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করলো। যারা একটু ভীতু গোছের, চেয়ারম্যানকে কারণে অকারণে ডরায়, তারা চোখ-মুখ খিচকে বায়ু নিষ্কাশন অর্থাৎ পাদকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করলো। কেউ কেউ সফল হলো, কেউ কেউ হলো না। অনেকে পাদ আটকে রাখতে না পেরে অন্য এলাকায় দৌড়ানো শুরু করলো।
আর যে জন দিবসে মনের হরষে চেয়ারম্যানকে থোরাই পাত্তা না দিয়ে পাদতে থাকলো তাদের কপালো জুটলো দুর্দশা। আশপাশের লোকজন চেয়ারম্যানের সুনজরে থাকার জন্য তাকে গিয়ে পাদের অভিযোগ জানালো। খসরু চেয়ারম্যান সেই সকল লোকদের তুলে আনালো যারা পাদ স্যাক্রিফাইস করতে পারেনি। তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তিতে দন্ডিত করা হলো।
প্রাপ্ত বয়স্ক লোকদের একঘরে করা হলো। তাদের সাথে গ্রামের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। মুরুব্বিদের ধরে ধরে গ্রামের বাইরে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সকলপ্রকার খেলাধুলা ও টিভি দেখা বন্ধ করা হলো। গ্রামের বহির্ভূত যারা ছিলো তাদেরকে নাকে খত দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হলো। এ সমস্ত শাস্তি তাদেরকেই দেয়া হলো যারা চেয়ারম্যানের আইন অমান্য করেছে। মনের সুখে পেদে বেরিয়েছে এখানে সেখানে।

৩.

চেয়ারম্যানের এই অভিনব আইনের কথা আশপাশে ছড়াতে সময় নেয় না। স্যোসাল মিডিয়াতেও ভাইরাল হয়ে যায়। দেশ ও দেশের বাইরের মানুষ তীব্র সমালোচনা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। অথচ তবুও এর বিরুদ্ধে কেউ রাস্তায় নামে নাই।
ফেসবুকে এটা নিয়ে মিমস্ আর ফানি ট্রলের ঝড় ওঠে। ইউটিউবার’রা একের পর এক ভিডিও তৈরী করে লাখ লাখ ভিউ আর সাবস্ক্রাইব কামাই করে নেয়। অনলাইন নিউজ পোর্টাল গুলো রসিয়ে রসিয়ে নিউজ করতে থাকে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। টিভিতেও এক্সক্লুসিভ নিউজ করা হয়। এ নিয়ে বিশিষ্ট্য রাজনীতিবিদদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারা হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে জানান, এ খুবই হাইস্যকর।
এতকিছুর পড়েও চেয়ারম্যান খসরু মিয়ার কিছু যায় আসে না। লোকাল এক সাংবাদিককে দেয়া ইন্টারভিউতে তিনি ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন, ‘এই দেশে আইনের বিশেষ দরকার। সময়ের সাথে সাথে আইনকেও আপডেট হইতে হবে। কোন চিপাচুপা বাদ দেয়া যাবে না। আমি তো বলি পরিস্থিতি ও আইন যত স্পর্শকাতর হবে, ফলাফল ততই চমৎকার পাওয়া যাইবে।’
রাফ এন্ড টাফ চরিত্রের জন্য চেয়ারম্যান খসরু মিয়া খুব দ্রæতই জনপ্রিয়তা পেয়ে যান। দল থেকে কথাও আসতে থাকে সামনের নির্বাচনে এমপিতে দাঁড়ানোর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার ফ্যানক্লাবও তৈরী হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা তার খ্যাতিকে টার্গেট করে জামা, জুতা, লুঙ্গীসহ নানান নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বের করতে তাকে। সিস্টেমপাড়া গ্রামের প্রায় প্রতিটা যুবকেরই এখন এমন শার্ট রয়েছে যাতে খসরু চেয়ারম্যানের ছবিসহ লেখা ‘পাদ দিয়ে পালাবি কোথায়?’

৪.

কথায় আছে নগর পুড়লে দেবালয়ও এড়ায় না। খসরু মিয়ার নিজের বানানো আইনে তাকেও কড়া মাশুল গুনতে হয়েছে। নিজের একমাত্র ছেলেকে জেলে পাঠাতে হয়েছে।
এইতো সেদিনকার ঘটনা। সকালে সবাই খেতে বসেছে। খাওয়ার মাঝখানে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে পাদ দেয় খসরু মিয়ার ছেলে খায়রুল। ছেলে ভেবেছিল নিজের বাপ বলে হয়তো কিছু হবে না। কিন্তু খসরু মিয়া তো অন্য জিনিস। অন্য ধাতুতে গড়া। ছেলেকে শাস্তি দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করলেন না। তিনি ভাবলেন কি টাইপের শাস্তি দেয়া যায়। তখন তার মনে হলো, ঘরের বাইরের মানুষই যেখানে এই আকামের সাহস পায়না সেখানে ঘরের মানুষ এত স্পর্ধা দেখায় কি করে!
খসরু মিয়া শাস্তির চরম দৃষ্টান্ত দেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। পুলিশ ডেকে ছেলেকে ধরিয়ে দিলেন। এতে গ্রামবাসীসহ দেশবাসী এমনকি বিশ^বাসীরাও দেখতে পারবে আইনের বেলায় কতটা প্রখর খসরু মিয়া। কিন্তু ভেজাল বাঁধলো অন্য জায়গায়। পুলিশ সহজে যেতে চায় না। তারা বুঝে উঠতে পারে না অপরাধ হিসেবে কি লিখবে। পাদের কথা তো আর লেখা যায় না। সংবিধানে পাদ ক্রিমিনাল এক্টিভিটিসের মধ্যে পড়ে না। খসরু মিয়া নাছোড়বান্দা। তিনি পুলিশকে এটা-সেটা বোঝান। শেষতক জানান তিনি জীবন হুমকিতে পড়েছিলেন। ছেলের পাদের শব্দে অলমোস্ট হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো। এটাও বোঝালেন প্রকাশ্য দিবালোকে পাদ মেরে প্রকৃত অর্থে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল তার ছেলে। পুলিশ মাথা চুলকিয়ে মেনে নিলেন তার কথা। খসরু মিয়ার ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন।
তার কদিন বাদে আবার এই পাদ মারার কারণেই নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন খসরু মিয়া। শহরে গিয়েছিলেন স্ত্রীকে নিয়ে। শপিংমলে কেনাকাটা শেষ করে রাস্তায় এসে ফুচকা খাচ্ছিলেন। এমন সময় অতি মৃদু শব্দে পাদ দিয়ে বসেন তার স্ত্রী। দুনিয়ার আর সবার কান এড়ালেও রীতিমতো পাদ বিশেষজ্ঞ বনে যাওয়া খসরু মিয়ার কান এড়ায়। তখনই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বসেন।
স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও কাছের-দূরের বহু আপন মানুষকে তিনি ত্যাজ্য করেছেন কেবলমাত্র এই পাদের কারণে। কষ্ট হলেও নিয়তিকে মেনে নেন খসরু মিয়া। তিনি ভাবেন, আজ বহু মানুষ তাকে জীবন্ত কিংবদন্তী ভাবে। একজন কিংবদন্তীর কোনপ্রকার খুঁত থাকা চলে না। তাকে কঠোর হতে হয়। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হয়। এই ভেবে খুশি হন খুব। হাসি কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।

৫.

যার শুরু আছে তার শেষও আছে। কিন্তু খসরু মিয়ার বেলায় তা যেন হুট করেই। সুস্থ্য সবল মানুষটা হঠাৎ করেই অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। শরীর ভাঙতে শুরু হয়েছে তার, দেহের ভেতরে পঁচন ধরেছে। ডাক্তার’রা সঠিক কোন কারণ খুঁজে পেলেন না। এলাকার লোকজন অবশ্য বলাবলি করে, যেই লোকের ভাবনা চিন্তাতেই পঁচন ধরেছে সেই লোকের শরীর কতদিন ভালো থাকে! খসরু মিয়া বুঝতে পারেন জীবনের একদম শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। বড্ড অসহায় অবস্থা তার। এমন দুর্দিনে আশপাশে আপন বলতে কেউ নেই। যারা আছে তারা টাকার কুমির, ক্ষমতা ও অর্থলোভী। স্ত্রী-সন্তান পাশে নেই। আত্মীয়-স্বজনও পাশে নেই। যেই গ্রামের চেয়ারম্যান তিনি, সেই গ্রামের মানুষজনও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সারা দেশ-বিদেশে তার কত ভক্তক‚ল, তাদেরও কোন খোঁজখবর নাই। এ এক বিশাল শূণ্যতা।
দুনিয়া ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছে। শ্বাস প্রশ্বাস নিতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে খসরু মিয়াকে। দলের কিছু লোকজন ও সাংবাদিক এসেছে বাড়িতে। তারা তার বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে। একজন বয়স্ক লোক খসরু মিয়ার মুখের কাছে এগিয়ে যান। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা খসরু, তোমার শেষ কিছু বলার থাকলে বলতে পারো। কোন ইচ্ছা বা দাবী দাওয়া থাকলে বলো।’
খসরু মিয়া বড় বড় হা করে শ্বাস নেয়। কি জানি বলার জন্য বেশ চেষ্টা করেন। সবাই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে কি বলে তা শোনার জন্য। এমন সময় ধুরুম ধারুম শব্দে পাদ মেরে দুনিয়া ছাড়লেন খসরু মিয়া। রুমের মধ্যে পীনপতন নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে একজন অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, ‘মরার আগে নিজের বানানো আইন ভেঙেই মরলো। কিছু হইলো এইডা?’

জামসেদুর রহমান সজীব, চলচ্চিত্রকার-লেখক | ৮ মে ২০২০